সুন্দরপুরে সন্দেহ (তৃতীয় কিস্তির পর)

অতিথি লেখক's picture
Submitted by guest_writer on Sun, 10/02/2019 - 12:34am
Categories:

আট।।

পুঁথির অর্থ বাবার কাছে না লুকিয়ে কোন উপায় ছিলো না কিশোরীমাধবের। নারায়ণমাধব বৈষয়িক মানুষ হলেও বিষয় সম্পত্তি যে কী দুর্ভোগ বয়ে আনতে পারে তা তিনি ভালো করেই জানেন। ময়মনসিংহের সমতলে প্রায় অনন্তকাল কাটিয়ে দেওয়া মাধবদেরকে যে আসামের নির্বান্ধব উপত্যকায় চলে আসতে হয়েছে সে তো আর ধর্মের কারণে নয়। তিনি হিন্দু নাকি মুসলিম এই নিয়ে কেউ কোনোদিন মাথা ঘামায় নি। দেশ বিভাগের সময় ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার কোন প্রভাব পড়েনি সদর থেকে দশ মাইল দূরের ছোট্ট গ্রাম কাৎলাসেনে। যেমন ছিলো তেমনি থেকে গিয়েছে সালাম সরকারের পাটের কারবার। বদলায়নি ব্রহ্মপুত্রের তীর ঘেঁষে ঝাঁকি জাল কাঁধে হেঁটে চলা হারান মণ্ডলের জীবন। পাল পাড়ার বুড়ো কমলেশ এখনও সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে পরখ করে দেখে সারা রাত আগুনে পুড়ে কতোখানি খাঁটি হলো মাটির সরা, খেলনা পুতুল। আউলা কান্দির পুকুর ঘাটে গিয়ে কান পাতলে ঠিক ঠিক শোনা যায় কামাল শেখের তাঁতের আওয়াজ, খটর খট খটর খট খটর খট।

প্রাণের বন্ধু শমশের খাঁ বিয়ে করার পর পাল্টে গেলো সব কিছু। সারাদিন গানবাজনা আর যাত্রাপালা নিয়ে ব্যাস্ত থাকা মানুষটা আজকাল আর আগের মতো রাত দুপুরে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে হাঁক দিয়ে বলে উঠেনা, পালায় যাবানা মাধব?

বিয়ে তো কেবল একটা বৌ এনে দেয়না, সাথে করে নিয়ে আসে নানাবিধ বৈবাহিক সম্পর্ক। কৌরব কুলপতি রাজা ধৃতরাষ্ট্রেরও যেমন ছিলো একজন শকুনি শ্যালক।

কার বুদ্ধিতে কে জানে, শমশের খাঁর নজর পড়লো মাধবদের বাগানে। বসত ভিটার পশ্চিমে বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড জুড়ে সেই বাগান। কতো প্রজন্মের কতো মাধবের হাতের স্পর্শ পেয়ে বেড়ে ওঠা বিশাল বিশাল সব গাছ। মাঝে মাঝে একটি দুটি জবা কি কাঠ গোলাপের ঝাড়। ফলের ভারে নুয়ে নুয়ে থাকে আম-জাম-লিচুর সারি। গ্রাম সুদ্ধ মানুষ সারা বছর খেয়েও শেষ করতে পারে না সেই ফল। কারও মাথায় কখনো আসেনি এই ফল হিন্দু বাড়ির নাকি মুসলমানের।

দেবোত্তর সম্পত্তি এই বাগান বিক্রির নয়।

অতএব শমশের খাঁর মনে পড়লো নারায়ণ মাধব হিন্দু। এই দেশ তাঁর না, এই নদী, এই মাটি, এই হাওয়া, আর হাওয়ার সাথে জড়িয়ে থাকা সোঁদা মাটির ওই গন্ধে তাঁর কোন অধিকার নেই।

এই ঘোর দুঃসময়ে নারায়ণ মাধবের পরিচয় হয় ইনছান আলীর সাথে। ইনছান আলী তখন সিলেটের হাওর অঞ্চল দাপিয়ে বেড়ানো উঠতি কারবারি। টাকা সে অনেক করেছে বটে, কিন্তু সেটা কিছু একটা করতে হয় বলেই। হাওরে মাছ ধরে বেড়ানো সামান্য একজন মাইমল হিসেবে শুরু করে যতদূর এসেছে তাতেই সে কৃতজ্ঞ। ভাগ্য তাকে দুহাত উজাড় করে দিয়ে গিয়েছে। আর সব মাইমলদের জালে যখন কিছুই ধরা পড়েনি, তখনো ইনছান আলীর জাল ফুলে ফেঁপে উঠেছে খলবল খলবল করা মাছে। আজকাল আর মাছ ধরতে যাওয়া হয়না, ইনছান আলীর হয়ে মজুর খাটে ডজন ডজন মাইমল। কিন্তু হাওরের অনন্ত জলরাশি তাকে ডেকে নেয় বারবার। মাঝে মাঝে নৌকা নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে ভাটির স্রোতে।

দেওয়ানগঞ্জের গুদারাঘাটের এক কোনায় নৌকার গলুইয়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে থাকা লোকটাকে প্রথমবার দেখেই থমকে দাঁড়িয়েছিলেন নারায়ণ মাধব। পানির দেশে যার নৌকা আছে সাত সকালে তার ঘুমিয়ে থাকার কথা নয়। নৌকায় ঘুমায় বেদেরা। তবে তারা আসে দল বেঁধে, ঘুমিয়ে থাকা লোকটার মতো একলা হয়ে নয়। তখন নৌকায় ছেয়ে যায় দেওয়ানগঞ্জের ঘাট। সেই সব নৌকা থেকে কোমর দুলিয়ে নেমে আসে উদ্ধত পায়রার মতো জোয়ান মেয়েদের ঝাঁক, যেমন তাদের রূপের বাহার, তেমনি তাদের চোখের ভাষা। মরদগুলো তখন পড়ে পড়ে ঘুমায়। তাদের কাজ সন্ধ্যার পর, যখন বর্ষার পানিতে তলিয়ে থাকা শস্যের ক্ষেতে গাল ফুলিয়ে ডেকে যায় ভাওয়া ব্যাঙ, কিলবিলিয়ে চলতে চলতে হিসিয়ে উঠে বিষধর সাপ, তখন বাঁশের চটায় বাঁধা লোহার আংটায় মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে মরদগুলো শিকারে নামে। আর নৌকায় নামে রূপের আসর, দশ গ্রামের লোলুপ পুরুষগুলোর কোমরের খুতি আলগা হয়ে ঝনঝন ঝনঝন ঝরে পড়ে কাঁচা টাকা।

নারায়ণ মাধব কিছুক্ষণ ভেবে মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে ডাক দেন,

“দাদার শইলডা বালা নি?”

ইনছান আলীর শরীর ভালোই ছিলো, যত কষ্ট সব তো তার মনে। বিদেশ বিভূঁইয়ে অচেনা মানুষের কণ্ঠে মমতার ছোঁয়া পেয়ে বড় ভালো লাগলো তার। সেই থেকে বন্ধুত্ব। সময়ের সাথে সাথে সে বন্ধুত্ব আরও নিবিড় হয়েছে, পাল্টে গিয়েছে সম্ভাষণের ধারা। বয়োজ্যেষ্ঠ নারায়ণ মাধবই এখন দাদা, ইনছান আলী দাদার কাছে প্রশ্রয় খোঁজা ছোটো ভাই।

কাৎলাসেনে যে মাধবদের আর থাকা সম্ভব নয় সেটা ততদিনে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। তাদের জমিতে হাল দেয়ার মজুর মেলে না, বাজারের দোকানিরা তাদের এড়িয়ে চলে। নারায়ণ মাধব বাগানের ঠিক মাঝখানে আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো তেঁতুল গাছের তলায় বসে ভাবেন আর ভাবেন। শমশের খাঁ এখনও তার সরাসরি কোন ক্ষতি করেনি। ধানের গোলায় আগুন দেয়নি, পুকুরের পানিতে বিষ মেশায়নি, বাড়ির লোকদের আড়ালে নিয়ে বসিয়ে দেয়নি দুচার ঘা। কিন্তু দিতে কতক্ষণ? দেশ জুড়ে যা ঘটছে প্রতিদিন!

ইনছান আলীই উপায় বাৎলে দিলো। শমশের খাঁ যত বড় তালেবরই হোক, ইনছান আলীর রয়েছে কাঁচা টাকা।

পড়ে রইলো নরম বেলে দোআঁশ মাটি, পড়ে রইলো ভিটা। বৈশাখের এক সপ্ন মাখা ভোরে উঁচু সড়কটার বাকে এসে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো আকাশ ছোঁয়া সেই তেঁতুল গাছ, কাজল কালো দীঘি, দীঘির চারপাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তাল-সুপারির সারি। মাধবরা পাড়ি জমালো গৌহাটিতে। ইনছান আলী ব্যাবস্থা করেছে। সুযোগ পেয়েও দাদাকে ঠকায়নি সে।

কিশোরী মাধবের তখন পাঁচ বছর বয়স। গুদারাঘাটে এসে পৌঁছুতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো শিশুপ্রান, সংক্রান্তির মেলায় কেনা কাঠের ঘোড়াটি যে রয়ে গিয়েছে আগলা ঘরের ধন্নার সাথে ঝুলিয়ে রাখা পাটের শিকেয়!

নারায়ণ মাধব ছেলেদের প্রতিপালন করেছেন শক্ত হাতে। কিশোরীমাধব আর হরিমাধব এই জেনেই বড় হয়েছে যে মাধব বাড়িতে বাহুল্যের কোন স্থান নেই। মায়া আর লোভ একই মুদ্রারই এপিঠ ওপিঠ। মায়া থেকে জন্ম নেয় লোভ। লোভে পড়ে একটা কিছু খুঁজে নিলে তার উপর জন্মায় মায়া। মায়া বড় খারাপ জিনিস। সে কষ্ট দেয়, কাঁদায়, দগ্ধ করে চলে নিরন্তর। মায়া যেন কাৎলাসেনে ফেলে আসা সেই শিকেয় ঝোলানো কাঠের ঘোড়া, হারিয়ে যাওয়া তেঁতুল গাছ- এক ফালি শৈশব।

দেবীর ওই স্বর্ণমণ্ডিত বালার প্রতি লোভ নেই কিশোরীমাধবের। কিন্তু দুর্দমনীয় একটা কৌতূহল তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সারাক্ষণ। কে জানে কেমন দেখতে সেই বালা জোড়া! না জানি কী রহস্যময় শক্তি লুকিয়ে রয়েছে সেখানে! মন্দিরের পুঁথিগুলোর কোন একটিতে নিশ্চয়ই লেখা রয়েছে সেই গুঢ় রহস্যের কথা। সমস্যা হচ্ছে অন্য পুঁথিগুলো সব বাবার ঘরে। নারায়ণ মাধব সেখানেই রাত্রিযাপন করেন।

উত্তেজনায় কপাল বেয়ে টপ টপ করে ঘাম ঝরছে কিশোরীমাধবের। ইচ্ছে করছে পা টিপে টিপে বাবার ঘরে ঢুকে দেরাজ থেকে পুঁথিগুলো বের করে আনতে। আবার ভাবছে, যাক না কয়েকটা দিন। প্রধান পুরোহিতের কাছে গিয়ে একবার চাইলে তিনি কি দেখতে দেবেন না?

নারায়ণ মাধব ছেলেদের শিখিয়েছেন মায়া এড়িয়ে লোভ পরিহার করে বাঁচতে। কিন্তু কৌতূহল যে কী করে নিবৃত করতে হয় সেটা তো তিনি শেখাননি! কিশরিমাধবের মাথা বন বন করে, পেটের ভেতর যেন ঘুরপাক খেয়ে যায় ইচ্ছের ঘুড়ি। শেষটায় থাকতে না পেরে, অনেকটা ঘোরের মধ্যেই, সে চলে গেলো কাচারিতে।

নারায়ণ মাধব ঘুমিয়ে রয়েছেন। অতি সন্তর্পণে, যেন রামায়ণের মেঘনাদের মতো বাতাসের সাথে প্রায় মিশে থেকে, কিশোরীমাধব দেরাজ খুললো।

তাড়া তাড়া পুঁথিগুলো হাতে নিয়ে দেরাজ বন্ধ করতেই একটা হাত, লোহার মতো শক্ত সে হাত, পেছন থেকে খপ করে চেপে ধরলো তার কাঁধ।

“দেরাজ খুলেছিলে কেন কিশোর?”

হাতের বাঁধন একটু যেন আলগা হলো।

কিশোরী মাধব গা ঝাড়া দিয়ে ছিটকে পেরিয়ে গেলো কাচারির চৌকাঠ। পেছন থেকে গমগমে গলায় হেঁকে চলেছেন নারায়ণ মাধব-

“দাঁড়াও বলছি, দাঁড়াও কিশোর! এতো বড় সাহস তোমার? আমার দেরাজ থেকে চুরি? এই শিখিয়েছি এতদিন! আজ তোমাকে খুন করে ফেলবো।”

কিশোরীমাধব দাঁড়ায়নি। সেই শৈশবের মতো, যেমন মিলিয়ে গিয়েছিলো বুড়ো তেঁতুলের চুড়ো, ঠিক তেমনি পেছনে পড়ে রইলো কাচারি ঘর, তার পেছনে সবুজ রঙের টানা বারান্দা দেওয়া দোতলা বাড়ি।

রেল স্টেশনে থেমে থাকা মালগাড়িটা যখন ঝিকঝকি ঝিকঝিক করে চলতে শুরু করলো, সতেরো বছরের নবীন বামুনের মাথার ভেতর তখন খেলা করছে স্বপ্নে দেখা, পুঁথিতে পড়া সেই অর্থহীন ছড়া-

উকুলি মুকুলি দুকুলি কাঁহি
নাক দৌ দৌ দোমৰ দাঁহি
কি কি চৰাই কি কি নাও
সোনৰ চৰাইৰ কথা কও
সুন্তি পান্তি ৰজা ঘৰৰ ধোমতি।

গৌহাটিতে কিশোরীমাধবের আর ফেরা হয়নি কোন দিন।

নয়।।

ইনছান আলীর বিয়ের দিন কাৎলাসেনের আকাশ ভেঙে বৃষ্টি হয়েছিলো খুব। দুইমাসব্যাপী তীব্র খরার পর সেই প্রথম বৃষ্টি। লোকে বলে আয়নাবিবি ভাগ্য নিয়ে এসেছিলেন। শমশের খাঁ যদিও তাকে দুর্ভাগ্য হিসেবেই দেখে গিয়েছেন সারা জীবন।

মাধবরা যে এভাবে হুট করে চলে যাবে তা শমশের আলীর ধারণারও বাইরে ছিলো। তার চেয়েও অবিশ্বাস্য ইনছান আলীর কীর্তি। হাওর এলাকার এই লোকটিই নাকি কিনে নিয়েছে মাধবদের সম্পত্তি। তা কিনেছে কিনুক, ভোগ করা আর কেনা তো এক জিনিস নয়! শমশের খাঁ নানান রকম গল্প গুজব ছড়িয়ে গ্রামের মানুষদের খেপিয়ে রেখেছেন। ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে ইনছান আলীর বজরা আসছে খবর পেয়েই টাংগি, রামদা, কোঁচ, লাঠি নিয়ে শতশত মানুষ ঘাটের পাশে গিয়ে হাজির। বাইরের মানুষকে কিছুতেই পা রাখতে দেওয়া যাবেনা কাৎলাসেনের মাটিতে। কিছুক্ষণ পরেই বোঝা গেলো বজরা একটি নয়, দুটি। পেছন পেছন রয়েছে ডজন খানেক গয়না নৌকা। ইনছান আলী বুদ্ধিমান মানুষ। লোক লস্কর তো বটেই, ফুলবাড়িয়া থানার দারোগাকেও নিয়ে এসেছে সংগে করে।

মাধবদের বাড়িতে পাকাপাকি ভাবে উঠে গেলেও ইনছান আলীকে লোকে বিদেশি বলেই গণ্য করে গিয়েছে দীর্ঘদিন। টাকার জোরে আর যাই হোক, রাতারাতি সম্পর্ক তৈরি করা যায় না। ইনছান আলি বলতে গেলে একরকম নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করছে। ঠিক আক্ষরিক অর্থে নয়, তাকে ঘিরে থাকে সাথে আসা হাওর অঞ্চলের মানুষগুলো। কাৎলাসেনের মানুষদের সাথে তাদের বনিবনা নেই। তাদের ভাষা ভিন্ন, তাদের দৃষ্টিতে সন্দেহ, চলনে সতর্কতা। কিন্তু এভাবে আর কতো দিন। কিছু একটা করা দরকার।

মাধব দীঘির তীর ঘেঁষে তৈরি হলো এক গম্বুজের একটি মসজিদ। কাৎলাসেন তো বটেই, আশেপাশের পাঁচ গ্রামে এটাই প্রথম। নোয়াখালীর এক মুন্সিকে ধরে এনেছেন ইমামতি করতে। মসজিদের সাথে লাগোয়া একচালা ঘরটিতে থাকেন তিনি। ইনছান আলীর মসজিদে কাৎলাসেনের কেউ না এলেও, অসুখ বিসুখে সেই মুন্সির কাছে ঠিক ঠিক ছুটে যায় তারা। সন্ধেবেলায় হয়তো চান মিয়া খালি একটা তেলের শিশি হাতে হন হন করে ছুটছে, পথে দেখা হয়ে গেলো জবেদ আলীর সাথে।

“কইনে যাও গো চান মিয়া?”

“কই আর যাইবাম! ছুডু মাইয়ার গাও গরম, মুন্সি বাড়িত যাইতাছি পানি পড়ার লাইগ্যা।”

মাধব বাড়ি নামটা মানুষের মন থেকে মুছে যাচ্ছে।

নোয়াখালীর সেই মুন্সিই একদিন পরামর্শ দিলেন,

“এইবার একটা বিবাহ করেন ভাই সাহেব। বিবাহ পরকে আপন করে। শত্রুকে বানায় মিত্র। আমাদের নবিজি বলে গিয়েছেন সকল মুসলমানের জন্য বিবাহ ফরজ।”

কথাটা যে ইনছান আলী ভাবেনি তা নয়। কিন্তু বিদেশির কাছে মেয়ে দেবে কে? বিশ্বনাথে তার কেউ নেই, কাৎলাসেনে তো নয়ই।

“আমার কনিষ্ঠা ভগ্নি বড়ই গুণবতী। আপনাকে সে সুখে রাখবে। অনুমতি দিলে সম্বন্ধের ব্যাবস্থা করি।”

ইনছান আলীর আপত্তি নেই।

শ্রাবণ মাসের বাইশ তারিখ, শুক্রবার। জুম্মার নামাজের পর বিয়ে। আসে পাশের পাঁচ গ্রামের মানুষকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। বাড়ির উঠান খুঁড়ে তৈরি করা মাটির চুলায় বসেছে বিশাল বিশাল সব হাঁড়ি। কিশোরগঞ্জের নামজাদা বাবুর্চি খুরশেদ শেখের লোকজন রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে ছোটাছুটি করছে দারুণ ব্যাস্ততায়। গোয়াল ঘরের খুঁটিতে বাঁধা তিনটি তাগড়া ষাঁড় জাবনা চিবিয়ে চলেছে আপন মনে, পাশেই দাঁড়িয়ে গোটা দশেক খাসি।

শমশের খাঁ কাৎলাসেনের মানুষদের সাবধান করে বলে দিয়েছেন বিয়েতে যেন না যায় তারা। বিয়েতে না গেলেও দেওয়ানগঞ্জের ঘাটে যেতে তো আর বাঁধা নেই! পুরো গ্রামটাই যেন ভেঙে পড়েছে ঘাটে। শমশের খাঁ দেখেও না দেখার ভান করেন। মনে মনে ভাবেন, যাচ্ছে যাক। মানুষকে বেশি টাইট দিতে নেই।

সূর্য তখন মাথার উপর। রোদের তেজে দাঁড়িয়ে থাকাই মুশকিল। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো একটি ছেলে, ঐযে ঐযে!

পশ্চিম দিক থেকে ভেসে আসছে একটি বজরা। বজরার ঠিক পেছনে একখণ্ড কালো মেঘ। ধীরে ধীরে বাড়ছে কলেবরে। আয়নাবিবির বজরা ঘাটে এসে ভিড়তে না ভিড়তেই আকাশ যেন ভেঙে পড়লো। এমন বৃষ্টি কে কবে দেখেছে আগে! বৃষ্টির তোড়ে হারিয়ে গিয়েছে সূর্যের ছটা, দিনের আলো। সেই অন্ধকারের বুক চিরে কাঠের সিঁড়িতে আলতারাঙা পা রেখে নামলেন আয়না বিবি। বৃষ্টির ছাঁট এড়িয়ে যারা তাকে দেখতে পেয়েছিলো তারা সেই গল্প করে গিয়েছে বহু দিন। এমন রূপবতী কন্যা মানুষ জীবনে বোধহয় একবারই দেখে।

কোথায় গেলো শমসের খাঁর সাবধান বাণী, কোথায় পড়ে রইলো তাঁর হাঁকডাক! খুরশেদ শেখ রেঁধেছিলও বটে। কাৎলাসেনের মানুষ পেট ভরে খেয়ে যখন বিদায় নিলো তখন রীতিমতো রাত। পরদিন মাঠে কাজ করতে না হলে তারা হয়তো থেকেই যেতো মুন্সি বাড়ির উঠোনে। বৃষ্টির পানিতে ভিজে নরম হয়ে এসেছে বন্দের মাটি। এই তো সময় সে মাটির বুক চিরে সোনা ফলিয়ে আনার। তবে থেকে গেলো বউ ঝিরা, বালক বালিকা আর বৃদ্ধ-বৃদ্ধার দল। হাওর এলাকা থেকে আসা ঘেঁটু দলের আসর বসেছে, চলবে সারা রাত।

বাড়ির ভেতরে মাটির প্রদীপের কাঁপা কাঁপা আলোয় একা বসে রয়েছেন আয়নাবিবি। হঠাৎ পায়ের শব্দে চোখ তুলে দেখলেন একটি শিশু অবাক বিস্ময়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে। অচেনা জায়গায় বড় ভাইয়ের হাত ধরে সারা জীবনের জন্য চলে আসা আয়নাবিবির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো শিশুটিকে দেখে। হাত দিয়ে ইশারা করে কাছে ডেকে জিগ্যেস করলেন,

“আফনের নাম কি গো বাজান?”

শিশু লজ্জা পেয়ে ঘাড় গোঁজ করে মিনমিনে গলায় বললো,

“আসলাম। আসলাম খাঁ।”

---চলবে

তৃতীয় কিস্তির লিংক
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/57331

দ্বিতীয় কিস্তির লিংক
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/57308#new

প্রথম কিস্তির লিংক
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/57288


Comments

অতিথি লেখক's picture

বুঝতে পারছিনা কী হলো। এতোগুলো পোস্ট গেলো কেমন করে! আমার এখানে দেখাচ্ছিলো টাইম আউট এরর। দয়া করে এইটি রেখে অন্যগুলো মুছে দেবেন।

ধন্যবাদ,
মোখলেস হোসেন

এক লহমা's picture

পড়লাম। চলুক হাসি

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

অতিথি লেখক's picture

ধন্যবাদ এক লহমা। ইচ্ছে মতো লিখছি, লিখছি যা মনে আসছে। শেষ হলে অনেক এদিক ওদিক করে নিতে হবে।

---মোখলেস হোসেন

অতিথি লেখক's picture

খুব ভাল লাগছে ভাই। আপনার লেখা সবসময়ই আগ্রহ নিয়ে পড়ি। গল্পের মাঝে ডুব দিই যেন। এই লেখাগুলো কবে যে আরও একটু গুছিয়ে বই আকারে আসবে সেই অপেক্ষায় আছি। এবার জাগৃতি থেকে আপনার বই এসেছে? বইমেলার আগে আগে তেমন কিছু দেখেছিলাম মনে হয় দীপনপুরে।

-সীমান্ত

অতিথি লেখক's picture

ধন্যবাদ সীমান্ত রায়। বই একটা বের হবার সম্ভাবনা ছিলো। জলির চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিলো না । কিন্তু আমার আলস্যের কারণে আর হয়ে উঠেনি। ভাগ্য ভালো দেশের বাইরে থাকি। ঢাকায় হাতের কাছে পেলে হয়তো পেটাতো।

---মোখলেস হোসেন

Post new comment

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.