তোমার এই ঝর্নাতলায়

অতিথি লেখক's picture
Submitted by guest_writer on Sat, 31/03/2018 - 3:51pm
Categories:

ঠিক কোন ক্লাসে মনে নেই, কিন্তু স্কুলে থাকতে বাংলা বইয়ে পড়েছিলাম -" আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, চুনি উঠল রাঙা হয়ে"। রবীন্দ্রনাথের লেখা, সে বয়সে এসব মারফতি কথা বার্তা তেমন বুঝতাম না। এখনো যে খুব বুঝি,তা নয় কিন্তু হালকা পাতলা বুঝতে শিখেছি। বয়স পঁয়ত্রিশ পেরিয়ে গেছে, জুলফিতে পাকা চুল উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে (কবির ভাষায় জুলফি উঠল সাদা হয়ে)- কিছুটা মারফতি এখন ধাতে সয়, মাঝেসাঝে করতেও ইচ্ছে করে।

যাহোক আবার সেই চুণি পান্নায় ফিরে আসি। আমি চুনির রঙ লাল দেখি বলে সেটার রঙ লাল আর পান্নাকে সবুজ দেখি বলে সেটার রঙ সবুজ- এই বাক্যটা কেমন যেন বোকা বোকা শোনায়। আরে সেটাই তো হবার কথা, সেটা এমন কাব্য করে বলার কি আছে? কিন্তু একটু ভাবলে বোঝা যায় যে ব্যাপারটা অত সোজা না। আমরা যেভাবে দেখি, সব প্রাণি কিন্তু সেভাবে দেখেনা। ফিলিপাইনের ম্যানিলাতে দা মাইন্ড মিউজিয়াম নামে একটা থিম পার্কে গিয়েছিলাম যেটার পাশে বাচ্চাদের খেলার পার্ক আছে। সেখানে ছোট ছোট বুথের মত আছে লেন্স লাগানো এমনভাবে যেভাবে অন্য প্রাণিদের চোখ কাজ করে। তাই সেখানে চোখ লাগালে আপনি বুঝবেন মাছি কিংবা ঈগল পৃথিবীটাকে কিভাবে দেখে! কোথায় যেন পড়েছিলাম যে কুকুর কোন রঙ দেখেনা, তার কাছে পৃথিবীটা সাদা কালো। পরে অবশ্য গুগল করে দেখলাম যে সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী কুকুর তিন রকমের রঙ দেখে- হলুদ, নীল আর ধুসর। চুনির রঙ সে দেখে হলুদ, আর পান্না তার চোখে হল ধুসর, কি অদ্ভুত! অন্য প্রাণীর কথা বাদই দেই, এমন অনেক মানুষ আছেন যারা বর্ণান্ধ। তাদের অনেকেও নিশ্চয়ই চুণি পান্নার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলবেন? সুতরাং আমি লাল দেখি বলেই কোন কিছু লাল,এমনটা তো সত্যি নয়।

হঠাত করে সেদিন মনে হল- শুধু রঙ কেন, পুরো জীবনটার ক্ষেত্রেই কি সেটা সত্যি নয়? আমার জন্ম ১৯৮২ তে, সুতরাং ১৯৮১ কিংবা তার আগের পৃথিবী আমার কাছে অন্ধকার। আবার যে দিনটায় চলে যাব, তার পরের পৃথিবীটাও অন্ধকার। অথচ তার আগেও পৃথিবী ছিল, পরেও থাকবে কিন্তু এই মাঝখানের সময়টুকুই শুধু আমার জন্যে সত্যি। চার বিলিয়ন বছরের পুরনো  পৃথিবীটাকে আমি শুধু সে সময়টুকুই দেখব। আর এই দেখা থেকেই আমি ভেবে নেব এটাই বুঝি জীবন। ঠিক যেভাবে ভেবেছিলেন জুলিয়াস সিজার, আলেকজান্ডার দা গ্রেট,মোঘল সম্রাট আকবর কিংবা যেভাবে ভাবেন আজকের ডোনাল্ড ট্রাম্প। হয়ত সেভাবেই ভাবত ৯৪ মিলিয়ন বছর আগে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া স্পাইনোসরাস, কিংবা আজ আমাজনের স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে বুকে হেটে চলা এনাকোন্ডা কিংবা খাবার টেবিলে চিনির টুকরো মুখে নিয়ে থাকা কালো পিঁপড়াটা।

সবাই আসলে বেচে থাকে তার নিজের পৃথিবীতে।তুতানখামেন বেচে ছিলেন পিরামিডের পৃথিবীতে, আমি বেচে আছি এরোপ্লেনের পৃথিবীতে। এক হিসেবে পাঁচশ বছর বেচে থাকা নীল তিমিদের হিংসে হয়। এই মাত্র যে নীলতিমিটা মারা গেল,সে হয়ত সম্রাট আকবরের সাথে একই দিনে জন্মেছিল! সাগরতলে বসে সে আকবর কিংবা ট্রাম্প, কাউকেই নিশ্চয়ই দেখেনি কিন্তু সে অন্তত সেই দুটো সময়ের কিংবা দুটো পৃথিবীর তো অংশ!

সময় জিনিসটা হচ্ছে ঝর্ণা থেকে অবিশ্রাম গড়িয়ে পড়া পানির মত। আমরা সবাই সেই ঝর্ণার নীচে কলসি পেতে বসে থাকি কলসি ভরার অপেক্ষায়। নীল তিমির কলসি খানিকটা বড় আমাদেরটার চেয়ে, এই যা পার্থক্য। তলাবিহীন কলসি যা কখনো ভরেনা, তেমন একটা কলসি পেলে মনে হয় ভাল হত। কিন্তু তেমন কলস তো আর নেই, তাই একটা সময় কলসি ভরে, আমাদের ফেরার সময় হয়। আর ফেরার বেলায় অবাক হয়ে ভাবি,

"তোমারই ঝর্ণাতলার নির্জনে
মাটির এই কলস আমার ছাপিয়ে গেল কোনক্ষনে?"

-গগন শিরীষ


Comments

গগন শিরীষ's picture

এখন পড়তে গিয়ে দেখি বেশ কয়েকটা বানান ভুল রয়ে গেছে। যারা পড়বেন, মাফ করে দিয়েন দয়া করে।

অতিথি লেখক's picture

তারপরও রাতের সমস্ত তারাই থেকে যাবে দিনের আলোর গভীরে।

ভালো লিখেছেন গগন শিরীষ।

---মোখলেস হোসেন

গগন শিরীষ's picture

ধন্যবাদ মোখলেস ভাই!

মেঘলা মানুষ's picture

একটা সময় ছিল যখন 'দীর্ঘ জীবন' ছিল একটা কাম্য বিষয়। সত্যি বললে এককালে আমারও সখ ছিল শত বছর বাঁচবার, পৃথিবী দেখবার।

আপনার মত আমারও চুল পেকেছে, মন বুড়িয়েছে। এখন মনে হয় কী হবে আরও সময় বেঁচে? একসময় যেই আমি মনে করতাম, মানুষের গড় আয়ু (৮০ বছর?) অনেক কম, এখন সেটাই অনেক দীর্ঘ সময় মনে হয় (আমি এখনও ৪০ ছুঁই নি)। এখন মনে হয় ১৫০ বছর বেঁচে থাকার মত ধৈর্য‌্য আসলেই আমাদের নেই।

আপনার লেখা ভালো লাগে, বিশেষ করে আপনার ডান-বাম ড্রিবলিংয়ের মত বাক্যগুলো। (ডাইনোসর - অ্যানাকোন্ডা - পিঁপড়া)

ভালো থাকুন, শুভেচ্ছা হাসি

গগন শিরীষ's picture

ধন্যবাদ মেঘলা মানুষ! আপনার মন্তব্যগুলোও আমার ভাল লাগে। সময় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে মন্তব্য করেন।আপনারা মন্তব্য করেন বলেই কালেভদ্রে হলেও লেখার মানে খুঁজে পাই!

সোহেল ইমাম's picture

Quote:
তলাবিহীন কলসি যা কখনো ভরেনা, তেমন একটা কলসি পেলে মনে হয় ভাল হত। কিন্তু তেমন কলস তো আর নেই, তাই একটা সময় কলসি ভরে, আমাদের ফেরার সময় হয়।

মন খারাপ

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

গগন শিরীষ's picture

পড়ার জন্য ধন্যবাদ ভাই!

এক লহমা's picture

পড়েছিলাম, খুব ভাল লেগেছিল। সময়ের ঝর্ণাধারায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ভাবনা-গুলো কি সুন্দর গড়িয়ে চলেছে, এগিয়ে চলেছে!

নববর্ষের শুভেচ্ছা।

সময়মত মন্তব্য করা হয়নি। ক্রমাগত স্থবির হয়ে চলেছি। মন খারাপ

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

গগন শিরীষ's picture

পড়ার জন্য ধন্যবাদ, এক লহমা!

Post new comment

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.