শব্দগল্পদ্রুম ০৩

হিমু's picture
Submitted by himu on Wed, 12/07/2017 - 5:43am
Categories:

১.
ব্যাকরণ শিক্ষাকে "বাংলা দ্বিতীয় পত্র" করে রাখার ব্যাপারটা একটু "কেমন" না? গল্প-কবিতাকে প্রথম শ্রেণীর কামরায় তুলে ব্যাকরণকে যেন চড়তে বলা হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেণীর খটখটে আসনে। যাঁরা বিদ্যালয়ে শিক্ষার খুঁটিনাটি সাজান, তাঁদের অবচেতনেও হয়তো এমনই ভাবনা কাজ করেছে: এসব যেন ঠিক পাঙক্তেয় নয়। প্রয়োগের ক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে চাঁছাছোলা ব্যাকরণকে প্রবাদ-প্রবচন, ভাব সম্প্রসারণ, সারমর্ম, টাকা চাহিয়া পিতার কাছে পত্র, চিকনগুনিয়া রোগে ছুটি চাহিয়া প্রধান শিক্ষকের নিকট ছুটির দরখাস্ত, শ্রমের মর্যাদা বা অধ্যবসায় বা গরু রচনার সঙ্গে ঘুঁটে "বাংলা দ্বিতীয় পত্রে" পেয়েছি আমরা। প্রায়শই, অত্যন্ত বদমেজাজি শিক্ষকের হাতে। এর ফল কী পেলাম?

মাতৃভাষায় নতুন শব্দ নির্মাণে নিদারুণ নিরাগ্রহ মানুষের সারি। কাতারে কাতারে।

শব্দ তৈরির কারখানায় টুকিটাকি যন্ত্রপাতি, সমাস-প্রকৃতি-প্রত্যয়-উপসর্গ-অনুসর্গ, ব্যবহারে যখন কাঁচা রয়ে যাই আমরা, তখন বিকল্প বাংলা শব্দ তৈরির দিকে আগ্রহ, বা নতুন শব্দ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধির শক্তি, হারিয়ে ফেলাই স্বাভাবিক। ব্যাকরণশিক্ষকের ওপর জমে থাকা রাগটা তখন পড়ে অচেনা শব্দ ব্যবহারকারীর ওপর। দ্বিতীয়-তৃতীয় ভাষার মতো মাতৃভাষাও যে খেটে শিখতে হয়, সে বিবেচনাটা তখন আর কাজ করে না।

হয়তো বাংলাকে "মাতৃভাষা" হিসেবে দেখার মধ্যেও একটা গলদ আছে। আমাদের মায়েদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা কতোটুকু, যাচাই করে দেখার সময় এসেছে বোধহয়। আমরা কি আশা করি, আমাদের মা তাঁর নিজ ভাষায় আমাদের কণাবিজ্ঞান শেখাবেন, শেখাবেন নক্ষত্রের জন্মবৃত্তান্ত, রসায়নের রহস্য, গণিতের খুঁটিনাটি, বলবেন অণুজীবের জগতের কথা, শারীরবিদ্যার চমকপ্রদ সব তথ্য, উদ্ভিদ-ছত্রাক-পতঙ্গের জীবনচক্র? আমরা মায়ের কাছে "ঘুম থেকে ওঠ", "ভাত বেড়েছি খেতে আয়", "দুধটুকু খেয়ে নে বাবা", "এক চড়ে দাঁতগুলো ফেলে দেবো" শুনেই কি সন্তুষ্ট নই? চলচ্চিত্রে হোঁৎকা নায়ক সমবয়স্কা অভিনেত্রীকে মা ডেকে "আমি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছি" বলতে বলতে বুড়ো হয়ে যায়, কিন্তু কখনও দেখিনি, কোনো সিনেমার মা শাস্ত্রব্যাখ্যা করছেন সন্তানের কাছে। গড় মানুষের কথা মাথায় রেখেই চলচ্চিত্র বানানো হয় যখন, গড়পড়তায় আমাদের কাছে মা একটি পুষ্টি যোগানো ঘণ্টার মতো, থেকে থেকে সঙ্কেতসূচক শব্দ করেন কেবল, সে শব্দের দৌড় সীমিত। মায়ের কাছে ব্রহ্মাণ্ডের কোনো শাস্ত্রসম্মত ব্যাখ্যা শোনার আকাঙ্খা যদি আমাদের মাঝে না থাকে, মাতৃভাষাও কি জাগরণী ডাক, অন্নগ্রহণের তাড়া, দুধপানের অনুরোধ আর দংষ্ট্রাপাতনের হুমকির গণ্ডি টপকাতে পারবে?

আমরা সতেরো কোটি মানুষের দেশে প্রাণপাত করে আধাখ্যাঁচড়া ইংরেজি শিখি, যেটা বর্তমান বিশ্বে জরুরি। কিন্তু সর্বকালে সর্বত্র সর্বজনের জন্যে আরো যে জরুরি ব্যাপার, আত্মশক্তির জাতিগত উপলব্ধি আর চর্চা, সেটায় খামতি রেখে ইংরেজি শেখার পেছনে বাংলাকে নিরামিষ ঘরে-চর্চার মাতৃভাষা হিসেবে দেখার প্রবণতাও কি বহুলাংশে দায়ী নয়? আমরা যদি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা, কার্যভাষা, শিক্ষাভাষা, জ্ঞানভাষা হিসেবে মন থেকে মেনে নিতে না পারি, শেষ পর্যন্ত বাংলার কাছে আমাদের চাওয়াও সীমিত হয়ে আসবে। বাংলাকে মাতৃভাষা বলে নাকে কাঁদার আগে আমাদেরই উদ্যোগ নিয়ে মায়ের হাতে মহাকাশের মীমাংসিত রহস্যের বিবরণ তুলে দিতে হবে ঝরঝরে বাংলায়, যন্ত্রশাস্ত্রের সূক্ষ্মতম দিকটিও প্রাঞ্জল করে লেখা থাকতে হবে বাংলায়, পরমাণু থেকে মহাদ্রুমের বৃত্তান্ত খোলাসা করে বলতে হবে মায়ের ভাষায়। যতোদিন আমরা সেটা করতে না পারবো, ততোদিন পর্যন্ত আমরা কেবল অপরের অভিজ্ঞতার খণ্ডিত অংশ হিসেবে নিজেদের চিনতে বাধ্য হবো। তাতে হয়তো সকলের মনে গ্লানি জাগবে না, কারণ নিরোধের অস্তিত্বের যাথার্থ্য অপরের শুক্র সংরক্ষণে, মুড়িয়ে গিয়ে ফুরিয়ে গেলে তাতেই তার আনন্দ। কিন্তু লেখক?

২.
নামটা ছিলো শৃঙ্গবের, অর্থাৎ শেকড়ে শিং যার, বহুব্রীহি সমাস। পালিতে সেটা রূপ নিলো সিংগবের-এ। গ্রিকদের কাছে সেটা হয়ে গেলো জিঙ্গিবেরিস, ল্যাটিনে তা হলো জিঞ্জিবের, আদি ফরাসিতে জ্যাঁজম্ভ, আদি ইংরেজিতে জিঞ্জিফার, আধুনিক ইংরেজিতে জিঞ্জার, অর্থাৎ আদা। পারস্য-আরব-তুর্ক-রুশসহ ইয়োরোপের প্রায় সকল ভাষায় আদার নাম এসেছে শৃঙ্গবেরের কোনো এক তদ্ভবরূপ থেকে। জার্মানরা বলে ইংভার, পারসিরা বলে জানজাবিল।

কিংবা খরগোশ। ফারসিতে বহুব্রীহি সমাসের আরেকটা উদাহরণ। খর (গাধা)-এর মতো গোশ (কান) যার, বহুব্রীহি সমাসে খরগোশ। ইংরেজিতেও আছে বহুব্রীহি সমাসের নানা উদাহরণ, পেইলফেইস বা রেডনেক বা ব্ল্যাকশার্ট।

বহুব্রীহি সমাস বিষয়ে বেত্রহস্ত রক্তচক্ষু শিক্ষকের বাজখাঁই প্রশ্নের উত্তাপে এর সরস অংশটুকু বাষ্পীভূত হয়ে যায় অকালেই। অথচ নতুন শব্দ নির্মাণে এর ভূমিকা প্রবল, বাংলা ছাড়া অপর ভাষাতেও। পাঠদানের সময় এক একটা সমস্ত পদ দিয়ে সেটাকে সমস্যমান পদসমূহে ভেঙে সমাস চিহ্নিত করতে বলা হতো আমাদের, ঠাঠা মুখস্থ করে কাজ চালানো যেতো শতভাগ। কিন্তু যদি উল্টো দিক দিয়ে শেখানোর চেষ্টা করা হতো? যদি প্রত্যেক ছাত্রকে দায়িত্ব দেওয়া হতো, বহুব্রীহির আওতায় একটা/দুটো/পাঁচটা/দশটা করে নতুন শব্দ বানিয়ে আনতে? লেখাপড়ায় নিতান্ত অমনোযোগী ছাত্রটিও কিন্তু ব্যাকরণের চৌকাঠ না মাড়িয়েই চশমাপরা সহপাঠীটিকে "চারব্যাটারি" ডেকে ক্ষ্যাপাতে জানে। চারব্যাটারির মতো চমৎকার বহুব্রীহি সমস্ত পদের উদাহরণ ছাত্রমহলে কমই থাকে। কিন্তু শেখানোর ভঙ্গি আর উদ্দেশ্যের পাকে পড়ে চারব্যাটারি শব্দটির প্রণেতা ভাষায় অবদান রাখার স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হয়, একঘেয়ে "বহুব্রীহি আছে যাহার = বহুব্রীহি, বহুব্রীহি সমাস" মুখস্থ করে প্রথমে সমাসকে, তারপর ব্যাকরণকে অপ্রয়োজনীয় জ্ঞান করে।

অথচ নতুন শব্দ নির্মাণের তাগিদ কিন্তু জীবনে রয়ে যায়। আমরা একে আলোহাওয়া দিতে শিখি না।

গ্রামের মানুষ গ্রেটার র‍্যাকেট-টেইল্ড ড্রঙ্গো (Dicrurus paradiseus) বা ভীমরাজের কথ্য নাম রেখেছে হোগায়নিশান। খুব শ্রুতিমধুর বা রুচিসম্মত, সে দাবি করবো না। কিন্তু বহুব্রীহি সমাসের একেবারে কড়কড়ে উদাহরণই শুধু নয়, বাংলায় যেসব পাখির নাম সুলভ নয়, তাদের নামকরণের একটা কৌশলও এই গ্রাম্য নামটায় নিহিত আছে। পাশাপাশি কারণে-অকারণে গাড়ির পেছনের কাঁচে যারা "সাংবাদিক" "মানবাধিকার" "উচ্চ ভাসুর" ইত্যাদি প্ল্যাকার্ড সেঁটে উল্টোপথে গাড়ি হাঁকান, তাদেরও আদর করে বাল্যকালের চারব্যাটারির প্রাপ্তবয়স্ক সংস্করণ হিসেবে হোগায়নিশান ডাকার একটা প্রেরণা মেলে।

এখন একটা পরিস্থিতি কল্পনা করুন। লেখক হিসেবে যদি একটা ফ্যান্টাসি গল্পে কোনো চরিত্রকে গভীর সাগরে পাঠাই, আর সে যদি জীবনে প্রথমবারের মতো অ্যালবাট্রসের দেখা পায়, আর আমি যদি এই অতুলনীয় পাখিটিকে বাংলায় কোনো নামে ডাকতে চাই, নামের সন্ধানে কার কাছে যাবো আমি? কোন পণ্ডিতের দরবারে, কোন গ্রন্থের পাঁজরার ভেতরে, কোথায় কোন ধুলোপড়া অভিলেখাগারের ছাতাপড়া দলিলে টোকা আছে অ্যালবাট্রসের বাংলা নাম? কোথাও নেই। কেউ রাখেননি। আমার সম্বল তখন ঠেকে, ঠোক্কর খেয়ে আধশেখা বাংলা ব্যাকরণ, যাকে আমি গিলেছি, কিন্তু হজম করিনি। আমার সম্বল তখন বহুব্রীহি সমাস, শৈশবের চারব্যাটারি, আধবুড়ো বয়সের হোগায়নিশান, আর পৃথিবীর যা কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, বাংলা গল্পের সাধারণ একজন চর্চাকারী হিসেবে তার সবকিছু বাংলায় চেনার আর চেনানোর সংকল্প। আমার গল্পের চরিত্রের ওপর দিয়ে তাই বিশাল অলস ডানা মেলে একটা "চাঁদোয়াডানা" উড়ে যায়। বাংলা ভাষার দীঘিতে শিশির হিসেবে এটা আমার এক ফোঁটা অবদান। আপনার পছন্দ না হলে আপনি অন্য কিছু রাখুন।

বরং পণ করুন, কিছুতেই যেন এ শব্দটা আপনার পছন্দ না হয়। দীঘিটা তাহলে বাড়বে।


Comments

স্পর্শ's picture

আমিভাবতাম অ্যালবাট্রসের নাম বাংলায় 'আরিয়ানা'। চাঁদোয়াডানা পছন্দ হয়েছে।

সব নতুন শব্দই কি বহুব্রিহী সমাস প্রয়োগে হয়? মানে একেবারে নতুন শব্দও কয়েন করা যায় না?


ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি...

হিমু's picture

তা যায়। বহুব্রীহির বাড়তি শক্তি হচ্ছে, এটা উপাদানের যোগফলের চেয়ে বেশি কিছু। বাকি সমাসগুলোয় সেটা ঘটে না। আনকোরা শব্দের বদলে বহুব্রীহি ব্যবহার করলে একটা বৈশিষ্ট্য অন্তত নামের মধ্যে ফুটিয়ে তোলা যায়, যেটা ফ্যান্টাসি গল্পে কাজে আসে। বাস্তবেও, কাদাখোঁচা বা কাঠঠোকরা নামগুলো শুনে পাখিদুটোর চেহারা আন্দাজ করা না গেলেও তাদের স্বভাব সম্পর্কে যেমন একটা ধারণা পাওয়া যায়। এখানেও বহুব্রীহি।

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

আচ্ছা জার্মান ভাষায় যে ইয়া লম্বা লম্বা শব্দগুলো দেখা যায় সেগুলো কি বহুব্রীহি সমাসের ফল?


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু's picture

ওগুলোতে তৎপুরুষের পরিমাণ বেশি সম্ভবত। যেমন ধরুন আপনি বললেন "বহুব্রীহি সমাসের ফল", এটা জার্মান কম্পোজিটায় গিয়ে দাঁড়াতো "বহুব্রীহিসমাসফল"। এভাবে চাইলে বহুদূর টানা যায়।

তাহসিন রেজা's picture

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন‌্যাস "পদসঞ্চার"এ "সিন্ধুশকুন" নামের পাখির কথা প​ড়েছিলাম। অবশ্য আমি নিশ্চিত নই এটা আলবাট্রস পাখির বাংলা কি না।

------------------------------------------------------------------------------------------------------------
“We sit in the mud, my friend, and reach for the stars.”

অলীক জানালা _________

হিমু's picture

বিভূতিভূষণের একটা লেখায় সিন্ধুশকুনের কথা খানিক পেলাম। অন্য পাখির বাসায় হামলা করে ডিম ভেঙে খায়। চাঁদোয়াডানার এ বদভ্যাসটি নেই বলেই জানি।

সত্যপীর's picture

Quote:
যেমন ধরুন আপনি বললেন "বহুব্রীহি সমাসের ফল", এটা জার্মান কম্পোজিটায় গিয়ে দাঁড়াতো "বহুব্রীহিসমাসফল"

সূত্র

..................................................................
#Banshibir.

সাক্ষী সত্যানন্দ's picture

গড়াগড়ি দিয়া হাসি

____________________________________
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?

হিমু's picture

সে কী, আলী সাহেবের আমলে গ্রুন্ডষ্টুয়ক্সফেরকেয়ার্সগেনেমিগুংসৎসুষ্টেন্ডিগকাইটসউয়বারত্রাগুংসফেরঅর্ডনুং ছিলো না নাকি?

(এটার অর্থ হচ্ছে জমি কেনাবেচার অনুমতি দেওয়ার আইনী এখতিয়ার আদালতান্তর বিষয়ক অধ্যাদেশ)

এটা না থাক, ঐ আমলে তো অন্তত রিন্ডফ্লাইশএটিকেটিয়েরুংসউয়বারভাখুংসআউফগাবেনউয়বারত্রাগুংসগেজেৎস (গরুর মাংসে লেবেল সাঁটানোর কাজ তদারকির কর্তব্য হস্তান্তর বিষয়ক আইন) থাকার কথা। যাকগা, কী আর করা।

তাহসিন রেজা's picture

Quote:
গ্রুন্ডষ্টুয়ক্সফেরকেয়ার্সগেনেমিগুংসৎসুষ্টেন্ডিগকাইটসউয়বারত্রাগুংসফেরঅর্ডনুং

মাথা ঘুরছে ওঁয়া ওঁয়া

------------------------------------------------------------------------------------------------------------
“We sit in the mud, my friend, and reach for the stars.”

অলীক জানালা _________

শিশিরকণা's picture

ইদানিং টেরি প্র্যাচেট অনুবাদ করতে গিয়ে শব্দ উদ্ভাবনের ব্যকরণ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। কিন্তু এ শাস্ত্র নেড়ে চেড়ে দেখতেও বেশ লাগছে। প্র্যাচেট হরদম নতুন শব্দ উদ্ভাবন করেন, অভিধানে যার অর্থ পাওয়া যায় না। তখন ঘেটে দেখতে হয় ইংরেজি সেই শব্দের শানে নুযুল কি, ব্যকরণ কি? তারপর তার ভাব অনুবাদ করে নতুন করে শব্দ বানাতে হয়।

ইংরেজি শব্দের অধিক ব্যবহারে অনেক প্রচলিত বাংলা প্রতিশব্দও ভুলে গেছি। সময় পেলে পড়ে কিছু বুদ্ধি দেবেন শব্দচয়নের ব্যাপারে।

~!~ আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল ~!~

হিমু's picture

শব্দগুলো নিয়ে নিজে নিজে চিন্তা করাটাই আনন্দের, বুদ্ধি দিয়ে সেটা নষ্ট করতে চাই না। হঠাৎ দেখবেন একটা লাগসই শব্দ পেয়ে গেছেন, পুরো খাটনি তখন উসুল হয়ে যাবে।

কিছু কিছু শব্দ আবার অভিধানে না থাকলেও সমগোষ্ঠীয় বাংলা গল্পে পাবেন। ডাইনিদের সভাকে ইংরেজিতে বলে COVEN, এটার বাংলা কী হতে পারে, সেটা নিয়ে বেশ কিছুদিন আগে ভাবছিলাম। তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা গল্পে দেখলাম তিনি এটাকে বলেছেন "চাতর"। চাতরের দুটো আক্ষরিক অর্থ আছে, ষড়যন্ত্র (চাতুরির তদ্ভব) আর উঠান (চত্বরের তদ্ভব)। আমার কাছে এটাকে কাভেনের খুবই লাগসই বাংলা মনে হয়েছে। প্র্যাচেটের উদ্ভাবিত শব্দগুলোর জন্যে তৈরি শব্দ হয়তো বাংলা গল্পে পাবেন না, কিন্তু তক্কে তক্কে থাকতে হবে আর কি।

শিশিরকণা's picture

সেই। আমার পড়ার গন্ডি অত বড় নয় তো। এইজন্য শব্দ পাই না অত সহজে। এইজন্য জ্ঞানী মানুষের ঘাড়ে দাঁড়িয়ে আকাশ হাতড়াবার চেষ্টা করতে চাই।
প্র্যাচেটের একদম বিশেষ্য শব্দ যেমন কোন চরিত্রের নামের মধ্যেও গল্প লুকিয়ে থাকে। তাই প্রতিটা শব্দ নিয়ে গবেষণা করতে হয়। গতকাল অনুবাদ করতে গিয়ে তিনটা চরিত্রের নাম নিয়ে খেললাম।
ইংরেজি নাম Weasel বাংলা করলে হয় বেজি, বা ধুরন্ধর, তার সমার্থক শব্দ খুঁজতে খুঁজতে পেলাম "নকুল"।
ইংরেজি নাম Bravd, গবেষণায় বললো, এটা brave সমার্থক, বাংলা খুঁজতে গিয়ে 'নির্ভীক' লিখে ফেলেছিলাম, পরে জনৈক স্বখ্যাত 'নির্ভীক' নামধারী 'ব্লগার' লেখিকার কথা মনে পড়ায়, বদলে করলাম " অভীক", যেটা নামের মতনও শোনায়, অর্থও বহন করে।
সবচেয়ে শ্রমসাধ্য হলো, Rincewind. এতে আরবান ডিকশনারি থেকে rince মানে ফাঁকা, ফক্কিকার, এমন অর্থ মিললো, সাথে বাতাস জুড়ে চরিত্রের রূপায়ন করতে নাম দিলাম "ফুরফুরা"
এখন ধাঁধায় আছি Twoflower কে কিভাবে বাংলায় আনবো।

~!~ আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল ~!~

সোহেল ইমাম's picture

Quote:
বাংলা গল্পের সাধারণ একজন চর্চাকারী হিসেবে তার সবকিছু বাংলায় চেনার আর চেনানোর সংকল্প। আমার গল্পের চরিত্রের ওপর দিয়ে তাই বিশাল অলস ডানা মেলে একটা "চাঁদোয়াডানা" উড়ে যায়।

চলুক

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

হয়তো এই পোস্টের সাথে ঠিক যায় না, তবু ভাষা-শব্দ-ভাব নিয়ে কথা যখন, তখন নিজের একটা ভাবনার কথা এখানে বলে যাই।

বাড়ীতে বা বিদ্যালয়ে যখন ভাষা শিক্ষা শুরু হয় তখন যথাক্রমে শুনে বোঝা, বলতে পারা, পড়তে পারা, লিখতে পারার পদ্ধতিটি ঠিকঠাক অনুসরণ করা হয় না। মা-বাবা শিশুকে যখন শব্দ শেখান তখন কিছু বাংলা, কিছু ইংরেজী শব্দ শেখান। কিছু কিছু ক্ষেত্রে একই জিনিসের বাংলা ও ইংরেজী উভয় নামই শেখানো হয়। ফলে শিশু গোড়াতেই বিভ্রান্ত হয় এটা কি 'বিড়াল', নাকি 'ক্যাট'! ওদিকে সে চারপাশে লোকজনকে 'বেড়াল', 'বিলাই', 'মেখুর' ইত্যাদিও বলতে শোনে। সে আরও বিভ্রান্ত হয়। শেখার শুরুতে ঠিক মা-বাবার মুখের ভাষাটাতে শিখলে ক্ষতিটা কোথায়! আরেকটু পরে না হয় 'বইয়ের ভাষা'টা শিখলো। বাড়ীতে যাকে নাম জিজ্ঞেস করলে বলে 'মনা' বাইরে গেলেই সে নিজের নাম বলে 'মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন'। এই হেরফেরটুকু একটু বড় হলে শেখানো যায়, তাতে বিভ্রান্তি তৈরি হয় না।

বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গেলে আজকাল শ্রেণী নির্বিশেষে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে হয়। শিশু শ্রেণীতে ভর্তির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মৌখিক পরীক্ষা যথেষ্ট হবার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেটা হয় না। তাছাড়া মৌখিক পরীক্ষাতে প্রায়ই স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, ইংরেজী বর্ণমালা ইত্যাদি জিজ্ঞেস করা হয় বলে নিরুপায় মা-বাবা মুখে বোল ফুটতে না ফুটতে স্বরে-অ স্বরে-আ এ বি সি ডি শেখাতে শুরু করে দেন। বিদ্যালয়েও গোড়া থেকে পড়তে পারার যোগ্যতা দাবী করা হয়। ফলাফল শিশুটি আর ঠিক ভাবে কোন ভাষা শিখে উঠতে পারে না। এই কারণে সে দ্বাদশ শ্রেণী বা ঊচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করার পরেও বাংলায় ঠিকঠাকভাবে কথা বলতে বা মুক্তগদ্য লিখতে সমর্থ হয় না।

এই পর্যায়ে কেউ কেউ হয়তো বলতে পারেন সে ঠিকঠাকভাবে লিখতে সমর্থ না হলেও ঠিকঠাকভাবে বলতে পারে। এ’খানে আমার কিঞ্চিত আপত্তি আছে। আপনি যদি রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বক্তৃতা, টকশো’তে বক্তাদের কথাবার্তা, এমনকি সাধারণ আড্ডাতে লোকজনের আলাপ লক্ষ করেন তাহলে দেখতে পাবেন তাদের বলা বাক্যসমূহে প্রায়ই ভুল ক্রিয়াপদ, ভুল প্রতিশব্দ, ভুল কাল থেকে যাচ্ছে। বাক্যের আবশ্যিক বৈশিষ্ট্যসমূহ – আকাঙ্খা, আসত্তি ও যোগ্যতা’র কোন না কোনটার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই খামতিটা ব্যাকরণ জানা-না জানার জন্য নয়, এটা ভাষা শুদ্ধরূপে বলতে না শেখার জন্য হয়েছে।

বলতে শেখানোর পর্যায়ে শব্দটার উৎপত্তি নিয়ে যদি একটু আলাপ করা হতো তাহলে শেখার ব্যাপারটা গল্প শোনার মতো উপভোগ্য হতো। এটা হয়তো মা-বাবা সব সময়ে করে উঠতে পারবেন না, তবে শিক্ষক-শিক্ষিকা চাইলে পারেন। কিন্তু সেটা হয় না।

গতকাল যে শিশু ছিল, আজ সে মা-বাবা-শিক্ষক-শিক্ষিকা হয়েছে। নিজের জানায় খামতি থাকায় এখন নিজের বাচ্চাকাচ্চাকে শেখানোতে সে ভুল করে যাচ্ছে — তৈরী হচ্ছে ভুলের পরম্পরা। বানান ভুল নিয়ে মাঝেমধ্যে কিছু কথা হয়, কিন্তু উচ্চারণ ভুল নিয়ে কোন কথাই হয় না। আমরা শিক্ষিত (দাবীদার) লোকজন ইংরেজী বানান বা উচ্চারণ ভুল করলে মরমে মরে যাই, যদিও আমাদের খুব কম জনই ইংরেজী ঠিক উচ্চারণে বলপ্তে সক্ষম, অথচ বাংলা বানান বা উচ্চারণ ভুল করা নিয়ে আমাদের কোন লজ্জাবোধ নেই। এবং এই ভুলগুলোও আরেক পরম্পরা তৈরী করছে।

এই ভুলের পরম্পরাগুলো ভাঙার জন্য উদ্যোগ লাগবে। খুব ছোটখাটো উদ্যোগে এই ভুলের রক্তবীজের ঝাড়কে উৎখাত করা যাবে না।

বাংলা ভাষার যারা হর্তাকর্তামালিকমহাজন তারা বর্ণাশ্রমে বিশ্বাসী। তাদের হিসেবে বাংলা শব্দ চার বর্ণের — তৎসম (ব্রাহ্মণ), তদ্ভব (ক্ষত্রিয়), দেশী/খাঁটি বাংলা (বৈশ্য) ও বিদেশী (শুদ্র)। ব্রাকেটে বর্ণগুলোর নাম লেখার কারণ বাংলা ভাষার হর্তাকর্তামালিকমহাজনরা শব্দদের সাথে সংশ্লিষ্ট বর্ণারূপ আচরণ করে থাকেন। এতে ব্যাকরণ, বানান রীতি ইত্যাদিতে এতোটা ভজঘট তৈরি হয় যে তার জন্য দুদিন পর পর নতুন অধ্যাদেশ জারী করতে হয়। তাছাড়া তারা নিজেদের চারপাশে এমন লৌহ যবনিকা তুলে রাখেন যে সেখানে নতুন শব্দ ঢোকার পথ পায় না। ফলে লোকের কথায়, দৈনন্দিন জীবনে নতুন নতুন শব্দ ঢুকলেও তাদের অভিধানগুলো মোটামুটি ‘ধর্ম্মপুস্তকের’ পর্যায়ে নিজেদের ‘সতীত্ব’ বজায় রাখে।

একটা বিষয় খুব স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেয়া দরকার যে, ভাষার হর্তাকর্তামালিকমহাজন কেউ নয়। এর মানে এই না যে, ভাষা নিয়ে স্বেচ্ছাচার চলবে। তবে যৌক্তিক, লোকমান্য, বহুলচর্চ্চিত জিনিসগুলোকে সাবেকী আইনের দোহাই দিয়ে ঠেকালে নতুন শব্দের অভাবে, নতুন কাঠামোর অভাবে, নতুন উপস্থাপনার অভাবে ভাষা ছটফট করে মরবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু's picture

জনসমক্ষে (এ শব্দটাকে কিছু জাতীয় দৈনিক এবং গয়রহ অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিকেরা "জনসম্মুখে" লেখেন ইদানীং) বক্তৃতার জন্যে আলাদা চর্চা, অভ্যাস, প্রশিক্ষণ দরকার হয়; এমনিতে যারা গুছিয়ে কথা বলেন, তারাও ওরকম পরিস্থিতিতে হোঁচট খেতে পারেন। সমস্যাটা সম্ভবত গুছিয়ে কথা বলার তাগিদ না থাকায়, কিংবা যারা ওভাবে বলেন তাদের বলার সুযোগ প্রশস্ত রাখায়। টিভির বকবকানি অনুষ্ঠানগুলোয় প্রায়ই দেখি সকল বক্তা সাধারণ সৌজন্য বিসর্জন দিয়ে একসঙ্গে উত্তেজিত হয়ে কথা বলছেন, তখন বাক্যগুণ যাচাইয়ের ফুরসৎই বা কোথায়? যদি গোছানো বক্তব্যের চর্চা বা উদাহরণ সামনে না থাকে, মানুষ নিজেকে "শোধরাবে" কী করে?

আমার চিন্তাটা কথ্য ভাষা নিয়ে নয়, বরং লিখতে গিয়ে (আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, প্রাগতাপগতিশাস্ত্র যুগের ফ্যান্টাসি গল্প লিখতে গিয়ে) সাধারণ এবং ক্ষেত্রবিশেষে খুবই আটপৌরে সব বিশেষ্যের ক্ষেত্রে (উদাহরণ: টেবিল, ক্রেইন, সসেজ) ইংরেজির বিকল্প বাংলা খুঁজে না পেয়ে সেগুলো "বানিয়ে নেওয়া" নিয়ে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

ভাষা শিক্ষাটা যদি যথাযথ প্রক্রিয়ায় হতো তাহলে অনেক উদাহরণ আপনাআপনি তৈরী হতে পারতো। শিক্ষার এই ত্রুটিটা সারানো না গেলে ভাষা নিয়ে অনন্তকাল ভুগতে হবে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে এটা নিয়ে হর্তাকর্তামালিকমহাজনেরা তো ভাবেই না, উলটো ভুলগুলোকে মহিমান্বিত করার প্রয়াস দেখা যায়।

আপনার ভাবনার বিষয়টি বুঝতে পারছি। বস্তুত যেসব রচনাতে কাল্পনিক কাল/জগত নির্মাণ করতে হয় সেখানে নতুন শব্দ, বাগধারা, পরিভাষা, রীতি, আইন, পদ, ভূমিকা - এমন অনেক কিছুই নির্মাণ করতে হবে। সেখান থেকে কিছু নতুন শব্দ বা বাগধারা পাঠক গ্রহন করবে। কালক্রমে সেগুলোকে অভিধানভুক্ত করতে হবে। একইভাবে দৈনন্দিন জীবনেও অনেক নতুন শব্দ, বাগধারা তৈরী হয়। সেগুলোর কোনটা অঞ্চল পর্যায়ে আবদ্ধ থাকে, কোনটা দেশ-জাতির সীমা পেরিয়ে সারা দুনিয়াতেও গ্রহনযোগ্যতা পেয়ে যায়। ঐ নতুন শব্দগুলোকেও অভিধানভুক্ত করতে হবে। সমস্যা হচ্ছে বাংলা অভিধানের হর্তাকর্তামালিকমহাজনদের নিয়ে। তারা নতুন শব্দগুলোকে অভিধানে ঠাঁই দিতে বিশেষভাবে অনিচ্ছুক। ফলে লেখার ভাষা আর গতি পায় না, অথবা লেখায় নতুন শব্দের ব্যবহার নিয়ে অহেতুক বিতর্ক তৈরী হয়।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু's picture

বেশ কিছুদিন আগে ফ্যান্টাসি লেখক ক্রিস্টোফার প্রিস্টের The Islanders পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। একটা বাক্য তুলে দিচ্ছি:

Quote:
“...an incomplete listing of anything reveals that a selection has been made, and any act of selection is of course political.”

অভিধান বা বিশেষায়িত ক্ষেত্রের শব্দকোষগুলো শেষ পর্যন্ত লেখকের কাছে সহায়ক গ্রন্থ, সংবিধান নয়। "আগে অভিধানে ভুক্তি যোগ হোক, তারপর ব্যবহার করবো" ভেবে লেখক হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তিনি অভিধানপ্রণেতার চয়ননীতির কাছে বন্দী থাকবেন।

লেখায় নতুন শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক হওয়াই প্রয়োজন। "পুরোনো" শব্দের ব্যবহার নিয়েও হওয়া উচিত। বাংলা একাডেমির বিজ্ঞানবিষয়ক শব্দকোষে নাকি Speciation এর বাংলা করা হয়েছে "প্রজাত্যায়ন", বিবর্তন বিষয়ে যারা বাংলায় লেখেন, তাদের কেউ কেউ এ শব্দটাকে ব্যবহার করছেন। "-আয়ন"-এর মাঝে একটা কর্তার ভূমিকা নিহিত আছে। পরাগায়ন, বনায়ন, হিমায়ন সবকিছুর পেছনেই কর্তা আছে। একটা প্রজাতি একাধিক প্রজাতিতে ভাগ হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটির পেছনে কিন্তু কোনো কর্তা নেই। ওটা "ঘটে", তাই স্পিশিয়েশনের বাংলা হওয়া উচিত প্রজাতিভবন।

তর্ক প্রায়শই জিরো সাম গেম বা শূন্যলব্ধিদ্বন্দ্বে রূপ নেয়, তখন ব্যাপারটা টকে যায়। যদি বাহুযুদ্ধের বদলে এটাকে পটলাক (পটলাকের বাংলা কী হতে পারে? "মাধুকরীভোজ"? "সবাইরাঁধি"?) হিসেবে নেওয়া যায়, তখন নতুন শব্দ নিয়ে তর্ক অনেক উপভোগ্য হতে পারে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

প্রিস্টের যে উক্তিটা দিলেন সেটা দেখে মাও দে জঙ-এর একটা উক্তি মনে পড়লো, "পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পর্যন্ত এমন কোন যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি যার রাজনৈতিক চরিত্র নেই"। আমার ধারণা আমাদের প্রতিটি উদ্যোগ/প্রচেষ্টা/কর্মধারাও এই রাজনৈতিক ভাবনার বাইরে নয়।

লেখার সময় লেখক যদি নিজের স্বাধীন চিন্তা, পছন্দ, আয়াস অনুযায়ী লিখতে না পারেন তাহলে সেটা গাইড বই নোট বই হবে, সৃজনশীল কিছু নয়। লেখা সম্পাদকের হাতে যখন পড়ে তখন অভিধান শব্দকোষ তার অস্তিত্ত্ব জানান দেয়। সম্পাদক সৃজনশীল যৌক্তিক কিছুকে গ্রহন করার মানসিকতাসম্পন্ন না হলে লেখা আবার ঐ হর্তাকর্তামালিকমহাজনদের খপ্পরে পড়ে যাবে।

'পটলাক'কে 'মাধুকরীভোজ' বলা মনে হয় ঠিক হয় না। কারণ, মাধুকর নিজের ভোগের উদ্দেশ্যে সবার কাছ থেকে ভিক্ষা করে। পক্ষান্তরে পটলাকে ভিক্ষার কোন ব্যাপার নেই, এবং সেটা সবাই ভোগ করে। এটাকে 'সবাইরাঁধি' বললেও পুরোপুরি ঠিক হয় না। কারণ, তাহলে বনভোজনও 'সবাইরাঁধি' হতে পারে। ষোড়শ শতকে থমাস ন্যাশ এই শব্দটা যখন উদ্ভাবন করেন তখন যে অর্থে ব্যবহৃত হতো এখন তার অর্থ অনেকই পালটে গেছে। ন্যাশের অর্থটা দ্রৌপদীর অক্ষয় তাম্রপাত্র থেকে দুর্বাসা মুনির ভোজের মতো ব্যাপার। এখন এটার মানে বলতে আমজনতা যা বোঝে সেটার জুতসই অর্থ দাঁড় করাতে পারছি না। এটা নিয়ে আরও ভাবতে হবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি's picture

দারুন!
একটু অন্য লাইনে যাই।
একটা সময় অনুবাদ ইত্যাদির ক্ষেত্রে বলা হতো বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া না গেলে বা যেটা পাওয়া যায় সেটা কঠিন, দুর্বোধ্য বা অপ্রচলিত হলে এবং ইংরেজিটা মোটামুটি পরিচিত হলে (কিম্বা না হলেও?) ইংরেজিটাই রেখে দিতে। বিশেষ করে পাঠকের কথা মাথায় রেখে। নতুন শব্দ নির্মান তখন চিন্তারও বাইরে ছিল। এখনও এই বিষয়টা আছে তবে বোঝার উপর শাকের আঁটির মতো জুটেছে ভারতীয় মিডিয়ার ট্রেন্ড। ভারতীয় মিডিয়ায় বাংলার সাথে প্রচুর পরিমানে হিন্দী-ইংরেজি দুটোই পাঞ্চ করা হয়। এর বেশ প্রভাব আমাদের এখানকার মিডিয়া জগতেও পড়ছে। আগে যেখানে শুধু প্রয়োজনের খাতিরে প্যাসিভলি ইংরেজি রাখা না-রাখাটাই মাথা ব্যাথা ছিল, এখন তার সাথে যোগ হয়েছে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনেই প্রোএ্যাক্টিভলি হিন্দী-ইংরেজি ঢুকিয়ে দেয়া! যখন ভাষাগত ভাবে এর কোন প্রয়োজন নেই - তখনও। এটা বিশেষ করে বিজ্ঞাপনে করা হয়, সেইসাথে হয়তো টেলিনাটক-সিনেমাতেও। কেন এগুলি করা হয় জানি না। ভারতীয়দের নাহয় একটা যুক্তি আছে - তাদের দেশ বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক - কিন্তু আমাদের যুক্তিটা কি? এসবের প্রভাব বাস্তব মৌখিক ভাষা ও মনন দুজায়গাতেই পড়ছে, এবং এরকম ভাষার চাহিদাও বোধহয় তৈরি হচ্ছে। আপনি অবশ্য সৃজনশীল সাহিত্যের প্রসঙ্গে লেখাটা লিখেছেন, অন্তত সেইরকম উদাহরণ ব্যবহার করেছেন - এবং সেখানে হয়তো এসবের প্রভাব ততটা এখনও পড়েনি। কিন্তু পড়তে কতদিন? এখন এই নতুন ট্রেন্ডের প্রভাব পড়বে এবং বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে হয়তো বিজ্ঞাপণী কপিরাইটার বা ট্রান্সক্রিয়েটারদের উপর, টেলিনাটক নির্মাতাদের উপর, তারপর সাধারণ মানুষের উপর। আম পাঠক-দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে এরকম জগাখিচুড়ি অপরিপক্ক আধাখেঁচড়া পিজিন ভাষার প্রভাব পড়বে যেখানে চিন্তাভাবনা-সৃজনশীলতা-গভীর অনুভূতি-বোধ-রুচিসংস্কৃতি-আত্নসম্মান-আত্নশক্তি-জাতিগত উপলব্ধি-টব্ধির ইত্যাদির কোনই স্থান নেই (বরং এসবকে ফালতু ও ফসিলযুগের বিষয় মনে করা হবে, কিম্বা সম্পূর্ণ এক্সটিক ও এলিয়েন কিছু), তাদের মধ্যে এর জন্য চাহিদা সৃষ্টি হবে (সৃষ্টি করানো হচ্ছে) এবং তাদের মন ও মনন বদলে যাবে অনেকখানি। এই বদলে যাওয়া মন ও মননের বিস্তার ঘটলে (যা ঘটছে) আপনি যে প্রস্তাব করছেন এই লেখায় এবং তার পথে যে অসুবিধাগুলি উল্লেখ করেছেন তার বাইরেও চক্রাগতিতে নানারকম বাধা সৃষ্টি হবে।
=====================
ডিস্ক্লেইমারঃ আমি আমার পর্যবেক্ষণগুলির বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত নই। এনিয়ে খুব বেশি মাথাও ঘামাইনি। টুকটাক কিছু অভিজ্ঞতার কারনে হঠাৎ মনে হলো তাই লিখলাম। ভুলও হতে পারে! হাসি

****************************************

হিমু's picture

কিছুদিন আগে দিলদার সোনারুর ছেলে যখন ধর্ষণ মামলায় ধরা পড়লো, তখন ধর্ষিতাদের একজন একটি জাতীয় দৈনিকে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ধর্ষক ধর্ষণের দৃশ্যধারণ করে শিকার দুই তরুণীকে "রাখেল" বানিয়ে রাখতে চেয়েছিলো। পত্রিকায় প্রথম বন্ধনীতে রাখেল শব্দটির বাংলা হিসেবে "রক্ষিতা" যোগ করা হয়েছে [সূত্র]।

রক্ষিতার ধারণাটির সাথে তিনি সম্ভবত হিন্দি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচিত হয়েছেন। রক্ষিতা শব্দটা একটু পোশাকি, প্রতিদিনের আলাপে, এমনকি সংবাদপত্রেও ঠিক সহজপ্রাপ্য নয়, কিন্তু "রাখেল" দিয়ে প্রতিস্থাপিত হওয়ার মতো বিরলও নয়। এমনটা ঘটে যখন ছাপার অক্ষরের সাথে মানুষের যোগ ক্ষীণ হয়ে আসে, হিন্দি সিনেমা বেশি দেখা হয়।

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

বহুজাতিক ভারত যখন কোন ইউনিয়ন বা ফেডারেশন না হয়ে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হলো তখন জাতীয় ঐক্য তৈরীর নামে ধীরেসুস্থে কায়দা করে সর্বস্তরে একটু একটু করে হিন্দীকে ঢোকানো হয়। এটা যতোটা না আইন করে চাপানো হয় তারচেয়ে ঢেড় বেশি গান-চলচ্চিত্র-মিডিয়ার ভাষা-বক্তৃতার ভাষা-দাবীর ভাষা-শ্লোগান ইত্যাদির মাধ্যমে অন্য ভাষাভাষীদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। গুজরাতী ভি বি প্যাটেল আর মালইয়ালমী ভি পি মেনন কারও মাতৃভাষা হিন্দী না হলেও জাতীয় ঐক্যের নামে তারা যে হিন্দুস্তানী সংস্কৃতির সামরিক গোড়াপত্তন করেছিলেন সেটাকে অন্যরা অন্য সেক্টরগুলোতে পত্রপুষ্পে পল্লবিত করেছেন। পরবর্তীতে সুপার পাওয়ার হতে আগ্রহী আধুনিক ভারত নিজের বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই হোক আর আধিপত্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই হোক হিন্দী বলয়কে তার প্রতিবেশী দেশগুলো, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ায় উপমহাদেশীয় ডায়াস্‌পোরাতে কিছুটা কৌশলে, কিছুটা জোরজার করে চাপিয়ে দিচ্ছে। ভাষা বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে গেলে নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চ্চাটাকে জোরদার করতে হয়। স্বদেশী ঠাকুর ফেলে বিদেশী কুকুর পূজা বন্ধ করতে হয়। সাহিত্য-সংস্কৃতির দুনিয়ায় মগজহীন ছ্যাবলাদের রাজত্বের অবসান ঘটাতে হয়। একটু দেশপ্রেম, একটু আত্মমর্যাদাবোধ, একটু ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ইতিহাস জ্ঞান এই কাজগুলো করার জন্য যথেষ্ট। তাছাড়া অভিমান করে কলম-কীবোর্ড-ক্যামেরা-মঞ্চ বন্ধ করে রাখলে ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি'র মাঠে আগাছারা বাড়তে থাকবে, বাইরের বর্গীরা এসে মাঠ দখল করবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি's picture

Quote:
সাহিত্য-সংস্কৃতির দুনিয়ায় মগজহীন ছ্যাবলাদের রাজত্বের

হা হা হা, দারুন শব্দ কয়েন করেছেন তো! কিছুদিনের জন্য এরকম এক স্বঘোষিত-লিডার ছ্যাবলা ফিল্ম-মেকারের পাল্লায় পড়েছিলাম এবছরের শুরুর দিকে। তখন ব্যক্তিগতভাবেই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি এটা কি চিজ। তবে শুধু মূর্খতা যদিও বা সহ্য করা যায় একটা পর্যায় পর্যন্ত, কিন্তু জ্ঞান-শিক্ষাদীক্ষা-চিন্তাশীলতা ও আত্নমর্যাদা-বিদ্বেষ আর সেইসাথে মূর্খতা এবং মূর্খ থাকাটাই যদি হয়ে যায় চরম ফুটানি আর "কুলনেস"-এর পরাকাষ্ঠা, তখন? অন্যভাবে বললে, অতলান্তিক মুর্খতা আর সেই মূর্খতাই যদি হয় আকাশচুম্বী ফুটানির বিষয় আর অন্য সবকিছু তাচ্ছিল্য ও ঘৃণার, এবং মেরুদণ্ডহীণতা ও আলগা ও ভুয়া ভাব মারার বদলে আত্নমর্যাদা, দেশপ্রেম ও সারবস্তুর চর্চা বোকামো, সেনাইল বাতিলত্ব ও ফসিলত্ব-অর্জনের লক্ষণ - তখন একে কি নাম দিবেন? এমনটা দেখেছেন কখনো? আমার কিন্তু সেই দূর্ভাগ্য হয়েছে কয়েকবার, এবং এটা যে কি অকল্পনীয় অসহনীয় অত্যাচার - যার এই অভিজ্ঞতা হয়নি তাকে বোঝানো অসম্ভব! মন খারাপ

****************************************

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

হায় মন মাঝি! যদি এই মূর্খতার অহঙ্কার, ভিত্তিহীন ফুটানীর ছ্যাবলা দানবের অসহনীয় অত্যাচারে প্রতিনিয়ত দগ্ধ হবার কথা যদি বলতে পারতাম!

দোষ আমাদেরই। সাহসভরে এগিয়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব কাঁধে তুলে না নিলে সব সেক্টরে অধমদের দিয়ে ক্রমাগত শাসিত হতে হবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি's picture

আগের কমেন্টের পর আরেকটা কথা মনে পড়লো। এটাও একটু অন্য লাইনে বা সেমি-অফটপিক হয়তো।
হিন্দী-ইংরেজির অপ্রয়োজনীয় নেগেটিভ প্রভাব বা প্রয়োগের সাথে সাথে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও ঢাকার আর্বান বা স্লাম ডায়ালেক্ট ফারুকী সটাইলে যথেচ্ছ মিশ্রণ ঘটিয়ে যে বিশ্রী কিম্ভূত ককটেলটা তৈরি হচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে তা আমার কেন যেন মনে হয়, শুধু ভাষার শক্তি ও সৌন্দর্য্যই নয় - মন ও মননের মান বা উৎকর্ষেরও অবনতি ঘটাচ্ছে। এটা যদি ঘটতেই থাকে, তাহলে আপনি যে লেভেলে চিন্তা করছেন সেই লেভেলে চিন্তা করার এবং তাকে আগ্রহ ও আবেগ দিয়ে অনুভব করার খুব বেশি লোক কি অবশিষ্ট থাকবে?

****************************************

হিমু's picture

থাকবে। এখনও আছে, কিন্তু তাঁরা সরব না। ফারুকীর মতো তৃতীয় শ্রেণীর চলচ্চিত্রনির্মাতা তাঁদের নীরবতার জোরেই দুটো করে খাচ্ছে। ...যাহ, হোগায়নিশান পাখিটার কথা আবার মনে পড়ে গেলো।

মাহবুব লীলেন's picture

বহুতদিন পরে শতভাগ মুগ্ধ হইবার মতো একখান লেখা পড়লাম

অতিথি লেখক's picture

দুর্দান্ত লেখা। চাঁদোয়াডানা চলে, তবে রোদরঞ্জনের ধারে কাছে নেই।

---মোখলেস হোসেন

অতিথি লেখক's picture

আপনার এই লেখা পড়তে পড়তে একজন ভারতীয় “ফেসবুক লেখক” অমিতাভ প্রামানিক এর একখান লেখার কথা মনে পড়লো। পুরা লেখা এখানে দিয়া দিলাম।

বৃষ্টি-ব্যাকরণ / অমিতাভ প্রামাণিক

বৃষ্টির দিনে আর যাই ইচ্ছে করুক, ব্যাকরণ পড়া নৈব নৈব চ। পাঁপড়, অমলেট, ইলিশমাছ ভাজা দিয়ে একথালা খিচুড়ি সাঁটিয়ে বিছানায় চাদর জড়িয়ে কচুর পাতায় বৃষ্টির বাজনা শুনতে শুনতে দিবানিদ্রা – আহ্‌।

কিন্তু যদি মাথায় আসে, আচ্ছা, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির এ রকম নাম এল কোত্থেকে? তখন খোঁজ নিয়ে জানবে এই রকম গুঁড়ি গুঁড়ি (অর্থাৎ গুঁড়ো ঝরে পড়ার মত) বৃষ্টিতেই ইলিশমাছ জালে ধরা পড়ে বেশি, তাই বাংলার মাল্লারা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির এই নাম দিয়েছিল।

বৃষ্টি হচ্ছে বৃষ্‌ ধাতু-নিষ্পন্ন শব্দ। এই ধাতুর উত্তর ক্তিন্‌ প্রত্যয় যুক্ত হলে বৃষ্টি, অন্‌ প্রত্যয় হলে হয় বর্ষণ। আকাশ থেকে মেঘ-উৎপন্ন জল ঝরে পড়াকেই আমরা বৃষ্টি বলি বটে, সাধারণভাবে ঝরে পড়াই বৃষ্টি। আকাশ থেকে দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করতেন নাকি। কবিরা পূর্ণিমারাতে জোছ্‌নাবৃষ্টি দেখেন। ছা-পোষা গেরস্ত আমরা স্বপ্ন দেখি কবে কালাধন ফিরে আসবে আর আমাদের ওপর টাকার বৃষ্টি হবে।

বৃষ্‌ ধাতু দেখলেই জানতে ইচ্ছে করে তাহলে ষাঁড় অর্থে যে বৃষ, তার সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক কী? আমি আগে একদিন এক পোস্টে জানিয়েছিলাম যে আমাদের সংস্কৃত ও তদ্ভূত সমস্ত ভাষার শব্দে গো- (বা গবাদি) শব্দযুক্ত বহু শব্দ আছে, যার অর্থ অনেক বদলে গেছে। বৃষ হচ্ছে সেই বীর্যবান প্রাণী যে শুক্র বর্ষণে অতিশয় পারঙ্গম। বৃষণ শব্দের অর্থ শুক্রাশয়। কাম-বর্ষণ অর্থে বৃষ্‌-ধাতু নিষ্পন্ন অনেকগুলো শব্দ আছে, যথা কামুকী অর্থে বৃষস্যন্তী, কামুক জাতি অর্থে বৃষ্ণি, শুক্রবর্ধক ওষধি অর্থে বৃষ্য যথা আমলকী, শতাবরী প্রমুখ।

বৃষ্‌ ধাতু-র উত্তর অ প্রত্যয় হলে হয় পুংলিঙ্গে বর্ষ, আ প্রত্যয়যোগে স্ত্রীলিঙ্গে বর্ষা। বছর বা বৎসর বোঝাতে যে বর্ষ, সে আর বৃষ্টিস্নাতা বর্ষা সমার্থক, কেননা যে সময় পরে পুনরায় পূর্বের ন্যায় বর্ষণ শুরু হয়, তাই এক বর্ষ। নববর্ষ শুধু নতুন বছরের সূচনাই নয়, নতুন বর্ষণের আমন্ত্রণও। এই শব্দ যে সময় তৈরি হয়েছিল, তখন এর অর্থ তাই ছিল, এবং সেই নববর্ষ সম্ভবত ছিল আষাঢ়স্য প্রথমদিবস। পরে খাজনা আদায়ের সুবিধার কারণে নববর্ষের সময় বদলে যায়।

আষাঢ় বস্তুটা কী? আকাশে সূর্যের গতিপথে সূর্য যখন এক একটা নতুন নক্ষত্রচক্রে প্রবেশ করে, তখন এক এক নতুন মাস শুরু হয়। এই রকম এক নক্ষত্র হচ্ছে উত্তরাষাঢ়া, যেখানে সূর্যের প্রবেশ মানেই আষাঢ়স্য প্রথম দিবস এসে গেল। সিদ্ধান্তবাগীশরা আকাশে সাতাশটা প্রধান তারা চিহ্নিত করেছিলেন, তাদের কুড়ি-নম্বরটার নাম পূর্বাষাঢ়া আর একবিংশতিতম হচ্ছে এই উত্তরাষাঢ়া। আষাঢ় শব্দের ব্যুৎপত্তি যদিও আষাঢ়া+অ, এর মধ্যেও বৃষ্‌-এর ছাপ আছে নিশ্চয়।

আছে, তার কারণ প্র-উপসর্গযোগে বৃষ্‌-ধাতুর উত্তর ক্বিপ্‌ প্রত্যয়ান্ত শব্দ হচ্ছে প্রাবৃট্‌ (বা প্রাবৃষ্‌) যার অর্থ বর্ষাকাল মানে আষাঢ় আর শ্রাবণ মাস। বাদল দিনের প্রথম কদম ফুলের আর এক নাম প্রাবৃষেণ্য।

বৃষ্টি যেহেতু আকাশের বা মেঘ-উৎপন্ন জল, তাই আকাশ বা মেঘ আর জলের সমার্থক শব্দগুলো সমাসবদ্ধ করে দিলেই বৃষ্টির সমার্থক শব্দ তৈরি হয়। যেমন – মেঘরস, আকাশসলিল, খবারি, দিব্যোদক, গগনাম্বু, নীরদজল।

বৃষ্টি গুঁড়ি গুঁড়ি পড়ে। ইলশেগুঁড়ি পড়ে। টিপটিপ করে পড়ে। ঝিরঝির করে পড়ে। তারপরে শুরু হয় আয় বৃষ্টি ঝেঁপে, ধান দেব মেপে। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি আসে। কবি লেখেন – উতলধারা বাদল ঝরে। তারপরে শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। মুষল কী, জানো? মুষল হচ্ছে চাল গুঁড়ো করার জন্যে ব্যবহৃত হামানদিস্তার ডান্ডা, মর্টার-পেস্‌লের পেস্‌ল্‌। ঐ রকম মোটা ধারার বৃষ্টি হচ্ছে মুষলধারা।

পড়ুক, যেভাবে ইচ্ছা বৃষ্টি পড়ুক। শ্রাবণের ধারার মত পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে ...

হিমু's picture

ধন্যবাদ। কারো "পুরা লেখা কোথাও দিয়া দেওয়ার" আগে তার অনুমতিটা যদি নিয়ে রাখেন, তাহলে ভালো হয়। অমিতাভ প্রামাণিকের সাথে পরিচয় থাকলে অনুগ্রহ করে তাঁকে সচলায়তনে লিখতে বলবেন।

আয়নামতি's picture

গুরু গুরু

যেমন চমৎকার পোস্ট, তেমন প্রাণবন্ত মন্তব্য(গুলো) পড়ে ব্যাপক আপ্লুত হলাম রে ভাই!

আব্দুল্লাহ এ.এম.'s picture

অনেক বিলম্বে এসে এই লেখা এবং তৎসংশ্লিষ্ট মন্তব্য প্রতিমন্তব্য গুলো পড়ে আমি তো হালায় তবদা খায়্যা গ্যালাম। শুধু কি তাই? আজ অনেকদিন পর সচলের নীড়পাতায় যেন চাঁদের হাট বসেছে দেখছি,সাধু! সাধু!! এ উপলক্ষে কিঞ্চিৎ গুরুচণ্ডালী বাৎচিত সকলেই ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি।

শৃঙ্গবেরের ইউরোপ তথা বিশ্ব অভিযানের ইঙ্গিত দেখে চমৎকৃত হলাম। সংস্কৃতে এই চীজটির আরও কিছু নাম আছে, যেমন- আর্দ্রক, কটুভদ্র, মহীজ, অনুপজ, চান্দ্রাখ্য, রাহুচ্ছত্র ইত্যাদি। এতসবের মধ্যে আমরা নিলাম আর্দ্রক, আর অন্যদের দিলাম শৃঙ্গবের, বাহ।

নীলকমলিনী's picture

লেখা এবং মন্তব্য দুটোই দারুণ। অনেক আনন্দ পেলাম।

Post new comment

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.