নটরডেম ও টুকরো স্মৃতি - ২ (অগা-বগা স্যার)

অতিথি লেখক's picture
Submitted by guest_writer on Wed, 26/03/2008 - 9:38am
Categories:

প্রথম পর্ব এখানে
আগেই বলেছি, নতুন শিক্ষক পেলে আমাদের আনন্দের সীমা থাকত না। আর নতুন শিক্ষক পাওয়ার অন্যতম খনি ছিল কম্পিউটার সায়েন্স। যেহেতু বিষয়টি তুলনামুলক ভাবে নতুন, তাই শিক্ষকরা ও মোটামুটি অনভিজ্ঞ। (ছাত্রদের কিভাবে কন্ট্রোল করতে হয় সে ব্যাপারে)। আর কম্পিউটার সায়েন্স যেহেতু ৪র্থ বিষয়, তাই আমাদেরও একটু গা ঢিলা দেওয়ার অবকাশ ছিল।
প্রথমেই ছিল লিটন স্যার। খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন, সন্দেহ নাই, কিন্তু শিক্ষক হিসাবে একেবারে যাচ্ছেতাই। তিনি কি বলতেন আমরা কেউ কিছুই বুঝতাম না। মানে কোর্স ম্যাটেরিয়াল না, তার বাংলাই ছিল অস্পষ্ট। আর তার ও কোন মাথাব্যাথা ছিল না, ছাত্ররা শুনছে কি শুনছে না। তবে তিনি পরীক্ষার আগে মোটামুটি সব প্রশ্ন বলে দিতেন, তাই আমরা ও তাকে খুব বেশি একটা ডিস্টার্ব দিতাম না। শুধু এটেন্ডেন্স নেয়ার পর লাইন ধরে সবাই টয়লেটে যাওয়ার নাম করে সটকে পরতো, আবার ক্লাস শেষ হওয়ার ঠিক আগে আগে ফেরত আসতো। বাং মারার ও রোটেশন ছিল, স্যার যাতে সন্দেহ করতে না পারে। তো এভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিন। এরপর তিনি জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটিতে চাকরী পেয়ে চলে গেলেন।
এরপর আসলো নতুন এক আবুল। নাম বোধহয় মশিউর রহমান, কিন্তু প্রথম ক্লাসেই তার নাম হয়ে গেল মশা। দেখতে ছোটখাট, প্রথম ক্লাসেই হুদা কামে হাউকাউ শুরু করে দিলেন। আর আমরা বলাবলি করছি, হ তোরে কইছে, তুই বেশি জানস।
লিটন স্যার এর ক্লাসে অন্তত হাউকাউ কেউ করতাম না, বাং মারতাম সবাই। কিন্তু নতুন স্যার এসে বেশি চিল্লা পাল্লা করায় আমরাও পালটা চিতকার শুরু করলাম। আর কম্পিউটার ক্লাস শেষ পিরিয়ডে হওয়ায় টেরেন্স স্যার ও বেশির ভাগ দিন অফিসে থাকতেন না, তাই আমাদের পায় কে!
সপ্তাহখানেক পার হতে না হতেই পোলাপান ক্লাসে এরাসল নিয়ে আসতে শুরু করল। স্যার যেখান দিয়ে হেটে যায়, আমরা সেখান দিয়ে একটু করে স্প্রে করে দেই। স্যার প্রথম প্রথম খেয়াল করত না, কিন্তু প্রতিদিন ঘটতে থাকায় এক সময় তার টনক নড়ল। তো স্যার এক ছাত্রকে পাকড়াও করলেন। এই ছেলে, এরাসল স্প্রে করছ কেন? ছেলেটির নির্বিকার উত্তর, স্যার অনেক মশা। স্যার আশে পাশে তাকাতে লাগলেন মশা আবিস্কার করার উদ্দেশে। কিন্তু মশা থাকলে তো! তো স্যার বলেন, মশা থাকলেই ক্লাসে স্প্রে নিয়া আসবে নাকি? ক্লাসে স্প্রে করা কোন ভদ্রতা? তো কাহিনী সেদিন কার মত সেখানেই শেষ। পরের দিন থেকে ক্লাসে কোন এরাসল নাই, স্যারও নিজের কতৃত্বে বেশ খুশি, যাহোক, বাদর গুলোকে সাইজ করা গেছে। কিন্তু ক্লাস কিছুক্ষ্ণ চলার পরই শুরু হল তালি দেওয়ার আওয়াজ। কিছুক্ষণ পর পর। খুব বেশি জোরে না, কিন্তু শোনা যায় এমন। স্যার রাগে গর গর করতে করতে এক ছাত্রকে ধরলেন। এই ছেলে, ক্লাসে তালি বাজাও কেন? উত্তর- স্যার মশা। স্যার বললেন, তাই বলে একটু পরপর তালি কেন? উত্তর- স্যার অনেক মশা। আরেক ছাত্র পিছন থেকে বলে উঠলো, স্যার আপনিই তো বলেছেন ক্লাসে আরাসল নিয়ে না আসতে, থাপ্পড় না দিয়ে মারলে কিভাবে মারব? স্যারের মুখে কথা নেই।
এরপর এই স্যার ও চলে গেলেন অন্য গ্রুপে ক্লাস নিতে, গ্রুপ ২ তে আগমন ঘটল তিন নাম্বার আবুলের। আর আমাদের ও মোটামুটি সাহস একটু বেড়ে গেল।
এই নতুন স্যারের নাম মনে নাই। চিকন স্বাস্থ্য। আগে কখনও কোথাও পড়াননি, সরাসরি এসে পরে গেছেন গ্রুপ ২ এর পাল্লায়। তাকে সম্ভবত বলে দেয়া হয়েছিল আগের শিক্ষকের কাহিনী। তো তিনি শুরুতে বেশ মিষ্টি ব্যাবহার করতে লাগলেন। কিন্তু আমরা একবার স্যার তাড়ানোতে সফল হয়ে গেছি, আমরা আর থামবো কেন?
যথারীতি শেষ পিরিয়ডে ক্লাস, ২য় ইয়ার। বিকালে ক্লাস, শীতকাল, আগে আগেই অন্ধকার হয়ে যায় বাইরে। আমাদের ও ক্লাসে বসে থাকতে ভাল লাগে না। তো চিকা করলো কি, বাথ রুমে যাওয়ার নাম করে বাইরে গিয়ে মেইন সুইচ অফ করে দিত। (শুধু আমাদের রুমের টা)। কারেন্ট নাই, বাইরে অন্ধকার, ক্লাস আর কিভাবে হবে? আমরা ও স্যার কে শুনিয়ে শুনিয়ে ডেসা কে গালমন্দ করি আমাদের মুল্যবান ক্লাস এভাবে নষ্ট করার জন্য। এভাবে বেশ কিছুদিন চলতে লাগলো। কিন্তু প্রায় প্রতিদিন একই সময়ে কারেন্ট চলে যাওয়াটা স্যারকে একটু সন্দিহান করে তুললো। একদিন এরকম মিথামিথ্যি কারেন্ট চলে যাওয়ার পর স্যার বাইরে গেলেন ঘটনা কি দেখার জন্য। গিয়ে দেখেন অন্যান্য ক্লাসে ঠিকি কারেন্ট আছে। তো স্যারকে বাইরে যেতে দেখে আমাদের একজন ও স্যার যাওয়ার পরপর বাইরে গিয়ে মেইন সুইচ চুপে চুপে আবার অন করে দিয়ে এলো। স্যার ক্লাসে ফিরে দেখেন কারেন্ট চলে এসেছে, আমারা ও সব ভাল মানুষের মত মুখ করে বসে আছি। স্যার না পারছে এখন আমাদের ধমকাতে, না পারছে চুপ থাকতে।
এর কিছুদিন পর এই স্যার ও চলে গেল।
(চলবে )

(রেনেট)


Comments

আনোয়ার সাদাত শিমুল's picture

হাসি মজা পাইলাম ।

উদ্দেশ্যহীন's picture

হে হে...মজা পেলাম ।

রায়হান আবীর's picture

হা হা হা...চরম। মজা পাইলাম...
---------------------------------
এভাবেই কেটে যাক কিছু সময়, যাক না!

অতিথি লেখক's picture

হি হি হি...।অনেক মজার তো!

-নিরিবিলি

অতিথি লেখক's picture

শুধু কি মজার? লিখতে গিয়ে টের পাচ্ছি কি সোনালী সময় পার করেছি...অনেকেই স্কুল জীবনে ফিরে যেতে চায়, আমি চাই নটরডেমে ফিরে যেতে...
লেখা শেষ করে দেখি, অনেক কথাই বলা হল না...এটুকু টাইপ করতে গিয়েই অবস্থা খারাপ...এত টাইপ করা যায় নাকি?
~রেনেট

নিঝুম's picture

রেনেট যত যাই কস স্কুল লাইফ নিয়া কিছু লিখা ফেল।এই ধর আমি তোরে কেম্নে জালাইতাম।তুই কেম্নে সারাদিন পড়ালেখা করতি আর বছরের পর বছর ফাস্ট-সেকেন্ড এর মত ভয়াবহ পজিশন ধরে রাখতি।মাহ্‌মুদ কাজীর কথা।যে কিনা ভালোবেসে এখন পাগলা গারদে।রকিবের কথা,সঞ্জয়ের কথা,হাসিবের কথা...দেখবি লিখতে লিখতে দারুন একটা লেখা হয়ে যাবে।তাড়া-তাড়ি শুরু কর।
--------------------------------------------------------
শেষ কথা যা হোলো না...বুঝে নিও নিছক কল্পনা...

---------------------------------------------------------------------------
কারও শেষ হয় নির্বাসনের জীবন । কারও হয় না । আমি কিন্তু পুষে রাখি দুঃসহ দেশহীনতা । মাঝে মাঝে শুধু কষ্টের কথা গুলো জড়ো করে কাউকে শোনাই, ভূমিকা ছাড়াই -- তসলিমা নাসরিন

অতিথি লেখক's picture

স্কুলের গল্প লেখার জন্য তোর মত যোগ্য পাবলিক আর নাই। আমি তো স্কুলে পড়াশোনা ছাড়া কিছুই করি নাই, বরং তুই অনেক না জানা ইতিহাস লিখতে পারবি...

সবজান্তা's picture

ভাই বিশ্বাস করেন কিচ্ছু বদলায় না। বদলায় শুধু পাত্র পাত্রীগুলা। বাকি সব ঘটনা হুবহু এক।

Quote:
তো চিকা করলো কি, বাথ রুমে যাওয়ার নাম করে বাইরে গিয়ে মেইন সুইচ অফ করে দিত। (শুধু আমাদের রুমের টা)।

হুবহু এই কাজটাই করতাম আমরা স্ট্যাট ক্লাসে। আমাদের ক্লাস হত, গ্রুপ ওয়ানের পাশের রুমটাতে। তো একদিন আমরা রুটইন মাফিক মেইন সুইচ অফ করতে গিয়েছি, সবেই অফ করেছি দেখি সিড়ি দিয়ে উঠে আসছেন , অংকের শিক্ষক বিদ্যুত কুমার ভদ্র স্যার। আমাদের দিকেই বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছেন !!

আমরা তো ভো দৌড় !!
-----------------------------------------------------
অলমিতি বিস্তারেণ

অতিথি লেখক's picture

হাজার হলেও সব একই জঙ্গলের বাঁদর!
~রেনেট

অমিত আহমেদ's picture
অতিথি's picture

বস চালায়া যান । (আমি গ্রুপ-৭ এ ছিলাম)

কম্পিউটার এর কথায় স্কুল এর একটা ঘটনা মনে পড়ল । ক্লাস নাইনের ঘটনা । আমি ছিলাম বায়োলজি তে । কম্পিউটার এর পোলাপানদের দেখি একদিন ক্লাস করে এসে ব্যাপক উত্তেজিত ! ঘটনা কী?

- আরে জানোস না ! আমাদের ল্যাব এর পিসিগুলা "আপগ্রেড" করা হইসে .... !
- তাই নাকি?
- আরে হ ব্যাটা ! (খুশিতে চোখ-মুখ জ্বলজ্বল করতেছে)
- কিরকম?
- আরে পিসিগুলার RAM ২মেগাবাইট থেকে ৮মেগাবাইট করা হইছে !
- ওয়াও !

অতিথি লেখক's picture

আহ! স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম!

ফেরারী ফেরদৌস

Post new comment

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.