নৈরঞ্জনা(৯)

তুলিরেখা's picture
Submitted by tuli1 on Mon, 29/10/2018 - 4:58am
Categories:

৯। দু'দিন পর । ডক্টর আদিত্যদের হোটেলে আমাদের মিটিং । ডক্টর আদিত্যের ঘরেই। ঘরটা বেশ বড়ো, চমৎকার সাজানো । আমরা সবাই কেউ চেয়ারে, কেউ তেপায়ায়, কেউ টুলে, কেউ সোফাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছি ।

সবাই উপস্থিত, আমি আর কাশ্মীরা তো আছিই, জহীর আছে, রুদ্রদীপ আর ওর দুই সহকর্মী- অলক আর বিপাশাও আছে আর আছেন অসিতদেবলবাবু । অভিযানের জন্য আটজন অভিযাত্রী প্রস্তুত । টেবিলের পাশের চেয়ারে ডক্টর আদিত্য, ওঁর হাতে বেশ কয়েকটা ম্যাপ। এখন বিকেল, ডক্টর আদিত্য নিজেই এই সময়টা নির্বাচন করেছেন মিটিং এর জন্য।

ইতিমধ্যে ঐ আকস্মিক দেখে ফেলা ডক্টর পালচৌধুরী আর ডক্টর ক্ষেত্রীর কথা আমরা ওঁকে জানিয়েছি । উনি তেমন গুরুত্ব দেন নি, বলেছেন ব্যাপারটা কাকতালীয় হতে পারে। আরো বলেছেন, ওঁরা যদি আমাদের ফলো করে এইখানে এসে থাকেন, তবে করুন ফলো, আমরা তো আর কোনো বে-আইনী বা ক্ষতিকর নিষিদ্ধ কাজে যাচ্ছি না! স্রেফ একটা রহস্য সমাধানে যাচ্ছি মাত্র, তাও পুরোপুরি নিজেদের অর্থ-সামর্থ্যের উপরে নির্ভর করে। কারুর কাছে আমাদের কোনো জবাবদিহি করবার নেই ।

সবাই ঠিকঠাক শান্ত হয়ে বসে টসে গেলে ডক্টর আদিত্য বললেন, "এখানে অভিযানের সবাই হাজির এখন। আমার প্ল্যানটা বলি, সবাই শুনে তারপরে জানাও ঠিক আছে না কোনো অসুবিধে আছে। বলি তাহলে? "
আমরা জানাই, "হ্যাঁ, বলুন।"
"আগামীকাল সকালে,সকাল আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে, যার যার হোটেল থেকে চেক আউট করে সবাই গিয়ে মিলবো শহরের প্রান্তের এই দোকানে । দোকানের নাম মুসাফির ।"
উনি ম্যাপে দাগ দিয়ে একটা পয়েন্ট দেখান, তারপরে বলেন, "তাঁবু টাবু ইত্যাদি যা যা জরুরী মালপত্র সবই ভাগাভাগি করে অভিযাত্রীদের সঙ্গে নেওয়া হবে । তারপরে আমরা ওখান থেকেই জিপে করে একসঙ্গে যাবো প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার, ঐ অতটা রাস্তা আছে। তবে সে রাস্তার যা অবস্থা, সময় হয়তো অনেক লাগবে । সে যাই হোক, রাস্তা শেষ হয়েছে এই লেকে, ম্যাপের উপরে আরেক বিন্দুর উপরে পেন্সিল রাখেন উনি । ঐ লেকের ধারে আমরা রাতের মতন তাঁবু ফেলবো । জিপ ওখান থেকে ফিরে আসবে, ঐ পয়েন্ট থেকে আমাদের আসল অভিযান শুরু । "
আড়াইশো কিলোমিটার । মনে মনে ভাবছিলাম কতটা দূর আর কীরকম রাস্তা, জীপে হয়তো গোটা দিন লেগে যাবে।
ডক্টর আদিত্য থেমে গিয়ে ম্যাপের দিকে চেয়ে ভুরু কুঁচকে ছিলেন। সারা ঘরে সবাই ওঁর দিকে চেয়ে চুপ করে বসে তখন। নীরবতা ভেঙে জহীর জিজ্ঞেস করলো, "তারপর?"

ডক্টর আদিত্য মুখ তুলে বললেন, " হ্যাঁ, তারপর। রাত্রিটা আর তারপরের দিনটাও তাঁবুতে কাটিয়ে পরদিন সন্ধ্যেবেলা আমাদের হাঁটা শুরু হবে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, সূর্যাস্তের পর থেকে আমাদের হাঁটাগুলো, দিনের বেলায় প্রখর রৌদ্রে আর গরমে হাঁটাহাঁটি করার ঝুঁকি আমরা নিচ্ছি না। প্রত্যেকে অন্তত চার বোতল করে জল ক্যারি করতে হবে ব্যাকপ্যাকে। যতদিন হ্রদের পাশ ধরে চলবো, ততদিন জল সংগ্রহ করা অসুবিধে হবে না। পথের গ্রামগুলো থেকে খাদ্যদ্রব্যও কেনা যাবে।"
এই পর্যন্ত বলে আবার থেমে গিয়ে চিন্তায় ডুবে গেলেন উনি। আবার ঘর নিস্তব্ধ। অবার সবাই প্রশ্নময় চোখ মেলে নিঃশব্দে চেয়ে আছে ডক্টর আদিত্যর মুখের দিকে।
এবারে নীরবতা ভাঙলাম আমি, "তারপর আমরা কী করবো ডক্টর আদিত্য? "
উনি মুখ তুলে তাকালেন কিন্তু তখনো চিন্তামগ্ন। আস্তে আস্তে বললেন," লেকের দক্ষিণ তীরে যেখানে জীপ আমাদের নামিয়ে দেবে, সেখান থেকে পূর্বতীর ধরে সোজা উত্তরে এগোবো আমরা। পথটা হবে প্রয় অর্ধবৃত্তাকার, কারণ হ্রদটা তো গোল। হ্রদের উত্তরে এইখানে" বলে ম্যাপটা তুলে আমাদের দিকে ফিরিয়ে ম্যাপের উপরে একটা বিন্দুতে পেন্সিল ছুঁইয়ে বললেন, "এইখানে নদীটার পড়বার কথা, স্যাটেলাইট ইমেজেও দেখা যায় হারানো নদীটা এইখানেই লেকের সঙ্গে মিশেছিল।"
আমি অবশ্য আমার জায়্গা থেকে কতগুলো আঁকাবাঁকা রেখা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু আগে থেকে জানা থাকায় মনে মনে মিলিয়ে নিচ্ছিলাম।
ডক্টর আদিত্য একটু বিরতি দিয়ে আবার বলতে থাকেন, "এই জায়গাটা গুরুত্বপূর্ণ, এইখান থেকেই উত্তরের দিকে সোজা হাঁটতে হবে আমাদের। ঐ লেকের ঐ বিন্দু থেকে প্রায় তিনশো কিলোমিটার উত্তরে এক পাহাড়ে এই হারানো নদীর উৎস, সেইদিকেই আমরা যাবো। কোনোখানে যদি নদীর কোনো চিহ্ন মেলে।
ঐ জায়গাটা, মানে ঐ তিনশো কিমি পথটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক, আগের যে অভিযাত্রী দলগুলো উবে গিয়েছে, সব ঐ অঞ্চল থেকে। কোনো দল আসছিলো উৎস থেকে হ্রদমোহনার দিকে, কোনো দল যাচ্ছিল আমাদের মতন হ্রদের মোহনা থেকে উৎসের দিকে। যেসব দলগুলো ফিরে এসেছে, তারা জানিয়েছে কেবল শুকনো বালিময় মরুভূমি আর মরু অঞ্চলের গাছপালা আর রুক্ষ কিছু পাহাড় ছাড়া কিছুই দেখতে পায় নি। কিন্তু তাদের কথা শুনে মনে হয় তারা সবকিছু বলে নি। ওদের সঙ্গে যারা কথা বলেছেন তারা লিখেছেন যে ঐ ফিরে আসা অভিযাত্রীরা প্রত্যেকেই কেমন যেন ট্রমার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন বলে মনে হয়, তারা সবকিছু বলতে চান নি বা পারেন নি।"
ভাবতে চেষ্টা করি অবস্থাটা, অজানা এক রহস্যময় অঞ্চল, অদ্ভুত অভিজ্ঞতা অভিযাত্রীদলের, কী হতে পারে সেই অদ্ভুত অভিজ্ঞতা? ওরা নদীটা দেখতে পায় নি, সেটাই যথেষ্ট অবাক করা ব্যাপার। তার পরেও আরো কী থাকতে পারে? কীসের ট্রমা?
কাশ্মীরা এই প্রশ্নটাই জিজ্ঞেস করল, "কীসের ট্রমা, ডক্টর আদিত্য? "
ডক্টর আদিত্য মাথা নেড়ে বলেন, "নাহ, সেই ব্যাপারে কোনো ধারণা আমারও নেই। ইন ফ্যাক্ট, আমরা নিজেরা কী অবস্থায় গিয়ে পড়বো তাও জানি না। এখন তোমাদের আবার বলছি, সবটা জানার পরে এতটা ঝুঁকি নিয়ে তোমরা যদি না যেতে চাও, এই শহর থেকেই ফিরতি ট্রেন ধরো। আমার যা বয়স, যেরকম পিছুটানহীন অবস্থা, তাতে আমি অভিযান থেকে না ফিরলে বা ট্রমাটাইজড হয়ে ফিরলে সেরকম কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু তোমাদের তো পরিস্থিতি ভিন্ন। তাই বলছি, তোমরা ভেবে দ্যাখো। তোমাদের বয়স অল্প, সামনে জীবন পড়ে আছে। "
একে একে সবার মুখের উপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন ডক্টর আদিত্য। প্রথমে অসিতদেবলবাবুর মুখের দিকে চাইলেন, অসিতবাবু বললেন, "আমারও পিছুটান নেই,বয়সও কম হল না। এতদূর এসে অভিযানে না গিয়ে ফিরে যেতে আর চাই না।"
কাশ্মীরার মুখের দিকে এইবার ডক্টর আদিত্যের চোখ স্থির, কাশ্মীরা শান্ত দৃঢ় গলায় বললো, "ডক্টর আদিত্য, আমিই প্রথমে এই অভিযানের ব্যাপারে প্রস্তাব এনেছিলাম। তারপর আপনার কাছে সাহায্যের জন্য যাই আমি আর আবীর। তখন পুরো ব্যাপারটাই ছিল একটা প্রস্তাবের স্তরে। আজ যখন অভিযানের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, তখন আমার তো কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না ফিরে যাবার। এমনকি আর কেউ না গেলেও আমার যেতে হবেই।"
এবারে ডক্টর আদিত্য আমার দিকে চেয়েছেন, আস্তে আস্তে বললাম, "অবশ্যই যাবো, অভিযানে না গিয়ে এখান থেকে ফিরে যাবার প্রশ্নই নেই। আর, আমারও কোনো পিছুটান নেই।"
অতি মৃদু আর ম্লান একটু হাসি যেন দেখলাম ডক্টর আদিত্যের মুখে। আমার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে এবারে তিনি জহীরের দিকে চেয়েছেন। জহীর শান্ত গলায় বলছে, "আমিও যাবো। আমাকে এইখান থেকে, অভিযানের মুখ থেকে নিষ্ফল ফিরে যেতে বলবেন না।"
ডক্টর আদিত্য এইবারে রুদ্রদীপের দিকে চেয়েছেন। রুদ্র মিতভাষী, সে শুধু বলল,"আমি যাবো।"
বিপাশার দিকে এইবার ডক্টর আদিত্যের চোখ, বিপাশা বলছে, "আমাদের, মানে জিওলজিস্টদের কাজই তো এই, ঝুঁকি নিয়ে অজানায় ঝাঁপিয়ে পড়া। সারাজীবনই করতে হবে। আমি আপনাদের সঙ্গে যেতে চাই।"
এইবারে শেষজনের দিকে ডক্টর আদিত্যর চোখ, অলক । অলকও খুব মিতভাষী, রুদ্রদীপের চেয়েও, সে শুধু বললো, "যেতে চাই।"

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডক্টর আদিত্য হাতের ম্যাপ টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, " তাহলে সবাইকার সম্মতি পাওয়া গেল। তার পরেও বলছি কারুর যদি কোনোরকম দ্বিধা থাকে মনে, তার এই পয়েন্ট থেকেই ফিরে যাওয়া ভালো। আগামীকাল সকালে শহরপ্রান্ত থেকে জীপে যাত্রা শুরুর আগেও যদি কেউ ফিরে যেতে চায়, কোনো অসুবিধা নেই। তবে একবার ঐ লেকে পৌঁছে গেলে তখন যেতেই হবে অভিযানে। ঠিক আছে, আজকে রাতটা সবাই তাহলে ভালো করে বিশ্রাম করে নাও, কাল আমাদের অভিযান শুরু ।"
মীটিং শেষ, ডক্টর আদিত্য ভালো ভালো কিছু মিষ্টি আর নোনতা খাবারের আয়োজনও করেছিলেন, সবাইকে কাগজের প্লেটে প্লেটে দিলেন সব। সঙ্গে চা ও ছিল প্রত্যেকের এক কাপ করে। চমৎকার চা। ফ্লাস্ক থেকে ঢেলে ঢেলে সবাইকার কাপে দিচ্ছিলেন ডক্টর আদিত্য।

খাওয়াদাওয়া শেষ হলে যে যার হোটেলের দিকে ফিরতে থাকলাম। আমরা তিনজন আসছিলাম একসঙ্গে, কাশ্মীরা, জহীর আর আমি। বেশ অনেকটা রাস্তা, হাঁটতে হাঁটতে এটা ওটা নিয়ে কথা হচ্ছিল, সাধারণ কথাবার্তাই সব, এই দৈনন্দিন আলাপচারিতায় মানুষ যেমন বলে টলে। হঠাৎ কাশ্মীরা খাপছাড়াভাবে একটা অদ্ভুত কথা বললো, "আচ্ছা, তোমাদের কি মনে হয় ঐ পালচৌধুরী আর ক্ষেত্রী--এরা আমাদের উপরে নজর রাখছেন কোনোভাবে? আমাদের ফলো করে ওঁরাও রওনা হবেন?"
অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম আমি আর জহীর। তা দেখে কাশ্মীরাও দাঁড়িয়ে পড়লো।
আমি বললাম, " এরকম অদ্ভুত কথা তোমার মনে হল কেন? সেদিন একঝলক ওদের দেখেছি বলে মনে হয়েছে মাত্র, শিওর ও না। হয়তো ওঁরা অন্য লোক। কিংবা যদি পালচৌধুরী আর ক্ষেত্রী হনও, তাহলেই বা কি এসে যায়? হয়তো ওঁরা বেড়াতে এসেছেন এখানে। আমি ডক্টর আদিত্যকেও ব্যাপারটা জানিয়েছি, উনিও তাই বললেন। আরো বললেন, আমরা নিজেরা তো কোনো বে আইনী কাজে যাচ্ছি না, ওঁরা যদি আমাদের ফলো করেনও, কীই বা এসে যায়? "
কাশ্মীরা মাথা দুলিয়ে মেনে নেয়, আস্তে আস্তে বলে, "হুঁ, তাই বটে। বেড়াতেই আসুন, আর ফলো করেই আসুন, কী এসে যায়? আমাদের নিজেদের কাজ নিজেরা করে যাবো। এমনিতেই অনেক সব ঝুঁকি সামনে, অনর্থক জটিলতার কথা না ভাবাই ভালো। চলো, তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া খেয়ে হোটেলে ফিরি ।"
আমরা আবার চলতে থাকি, কিন্তু একটা খটকা আমার মনের মধ্যে থেকেই যায়, ছোট্টো একটা কাঁটার মতন। ঠিক কী জন্য যে খটকা, তাও বুঝি না, কিন্তু চোরা অস্বস্তিটুকু থেকে যায়।
ঘরে ফিরে খানিকক্ষণ ব্যালকনিতে বসে বাঁশি শুনলাম অজানা বংশীবাদকের। কেজানে কে বাজায়! কী করুণ মধুর আকুল সেই বাঁশির সুর! আকাশভরা তারার নিচে অন্ধকার ব্যাকনিতে বসে শুনতে শুনতে মনে হয় ও বাঁশি যেন অপার্থিব উপহার।
তারপরে ঠান্ডা ঝপ করে বেড়ে গেল, ঘরে এসে ফোনে ভোর -ভোর অ্যালার্ম সেট করে শুয়ে পড়লাম। সেই চোরা অস্বস্তিটুকু রয়েই গিয়েছিল ভেতরে ভেতরে। অস্বস্তিটুকু নিয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম।
অদ্ভুত এক কান্ড তারপর। দেখলাম রাত্রিবেলা এক নির্জন ন্যাড়া ছাদে দাঁড়িয়ে আছি। চারিদিকে আতশবাজির আলো ঝলকে ঝলকে উঠছে, দুড়ুমদাড়াম করে শব্দবাজিও ফাটছে দেদার। যেন দেওয়ালির রাত।
ছাদে আমি একা না, আরেকজন আছে। তার মুখ দেখতে পাই না, মুখ অন্যদিকে ফেরানো। আমি শুধু দেখি তার পিঠ ছাপানো খোলা চুলের রাশি উড়ছে হাওয়ায়। তার পরণে নীল রেশমী শাড়ী, সেই শাড়ির নীল জমিনের উপরে অসংখ্য সোনালি চিকচিকে বলয়ের মতন নকশা। বিশাল আঁচল উড়ছে, বাজির আলোতে সোনালি বলয় চিকমিকিয়ে উঠে উঠে আশ্চর্য বিভ্রম তৈরী করছে। রহস্যময়ী এক নারী। কে ও? মনাই কি ছদ্মবেশে এলো আমাকে সাবধান করতে?
দূরে আকাশ লাল হয়ে উঠলো, যেন কোথাও আগুন লেগেছে। অনেক মানুষের সম্মিলিত আর্তনাদে কেঁপে উঠলাম। সেই মুহূর্তে সেই রহস্যময়ী আমার দিকে মুখ ফেরালো। আতশবাজি ঝলকে উঠলো, সেই আলোতে দেখলাম সেই মুখ অনেকটা যেন কাশ্মীরার মতন। কিন্তু গোটা মুখ রক্তাক্ত, বিকৃত। আর সেই মুখে ভয়ংকর হাসি।
চিৎকার করে উঠে পিছনে সরে যেতে থাকি, খটখট করে হাসতে হাসতে সেই মেয়ে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, সেই হাতে প্রতিটা আঙুলের প্রান্ত থেকে রক্ত ঝরছে, প্রতিটা নখ উৎপাটিত। সে এগিয়ে আসতে থাকে এক পা এক পা, আমি পিছিয়ে যেতে থাকি এক পা এক পা। কিন্তু ছাদের প্রান্তে চলে এসেছি, আর এক পা পিছাতে গেলেই পড়ে যেতে হবে। সেই মুহূর্তে আরেকটা প্রচন্ড শব্দ, মেয়েটি বিস্ফোরিত হচ্ছে, ওর গায়ে বোমা বাঁধা ছিল।

ঘামে ভিজে জেগে গেলাম, উঠে থ মেরে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। প্রথমে মনে হল মাথার ভিতরে একাধিক পিন ফুটছে যেন, সে যন্ত্রণা অবর্ণনীয়। তারপরে খানিকটা ধাতস্থ হলাম। বেডের পাশের টেবিলের উপরে একটা ভাঁজ করা খবরের কাগজ ছিল, সেটা তুলে নিয়ে নেড়ে নেড়ে নিজেকে কোনোরকমে হাওয়া করলাম, অস্বাভাবিক গরম লাগছিল। আস্তে আস্তে গরমলাগার ভাবটা কমলো, ঘাম শুকালো। তারপরে উঠে বোতল থেকে জল খেলাম আধবোতল।
কেন অমন ভয়ংকর স্বপ্ন দেখলাম? মনের ঐ সামান্য খটকা থেকে এতখানি মারাত্মক একটা স্বপ্ন তৈরী হল? নাকি সমস্যা আরো গভীরে? কোনো কারণে অভিযানে যেতে কি তাহলে আমি ভয় পাচ্ছি?
প্রায় ঘন্টাখানেক জেগে জেগে শুয়ে নিজের মনের ভিতরে অনুসন্ধান করলাম। ভয় কি সত্যি পাচ্ছি? এইখান থেকেই ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে পরিচিত জগতে? ভয়টা ঠিক কীসের? যদি আর ফিরতে না পারি? সেই ভয়? নাকি ট্রমাটাইজড হয়ে ফেরার ভয়?
নিজের কাছে স্বীকার করলাম যে ভয় একটা আছে, তবে সেটা অনিশ্চিতের ভয়, অজানার ভয়। ফিরতে না পারার ভয় না। যে জীবন পিছনে ফেলে এসেছি সেখানে আমার এমন কেউ নেই যার কাছে আমার ফেরা একটা দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, আমার না ফেরা যার কাছে প্রাণান্তকর দুঃখের।
না, তেমন আপন কেউ নেই আজ । একদিন ছিল । মনাই ।

নিস্তারিণী পুকুরের জলে ডুবে মরেছিল সে। আমি তখন অনেক দূরে, মাসী-মেসো তখন আমায় পরিত্যাগ করেছেন। মনাইয়ের খবরটা আমি পাই অনেক অনেক পরে, এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়ের মুখে।
সেই থেকে আমার প্রায়শ্চিত্ত চলছে, কেজানে কবে সেই প্রায়শ্চিত্ত শেষ হবে? হয়তো এই অভিযানেই আমার কঠিন প্রায়শ্চিত্তের সমাপ্তি হবে, হয়তো এই অভিযান আমার নিয়তি।
এই ভাবনা আসতেই শান্ত হয়ে গেলাম, বুকের মধ্যে যেন বৃষ্টি, দীর্ঘ খরার পরের বৃষ্টি। নিঃস্বপ্ন শান্তির ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

(চলমান)


Comments

তুলিরেখা's picture

লেখাটা কি বোরিং হয়ে যাচ্ছে? তাহলে আর পরের পর্ব দেবো না। এই পর্যন্তই থাকবে তাহলে।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

অতিথি লেখক's picture

সচলায়তনের এটিকেটের সাথে খুব একটা পরিচয় নেই আমার। এখানে ঠিক কতখানি খোলা মন নিয়ে কথা বলা যায় আমি জানিনা। আপনার লেখাটি আমি পড়েছি। পড়েছেন হয়তো আরও অনেকেই। মন্তব্য না করার একটাই কারণ- লেখাটা আমাকে আর টানছে না। আমি খুব দুঃখিত কথাটা এভাবে বলে ফেলার জন্য। তাই বলে আপনি আবার বন্ধ করে দিয়েন না যেন। আপনার কাজ লিখ যাওয়া। লিখে শেষ করুন। প্রকাশ করুন। সে ধাপে ধাপেই হোক অথবা পুরোটা এক সাথে। লিখে শেষ করতে পারা খুব আনন্দের।

---মোখলেস হোসেন

তুলিরেখা's picture

এই যে আপনি মন খুলে মনের কথাটা বলে দিলেন, তাতে খুশি হলাম। এইটাই জানতে চাইছিলাম। ধন্যবাদ। আসলে লেখাটা গোটাটাই হয়ে গিয়েছে বহুদিন আগেই, এখানে ধারাবাহিক দিয়ে বুঝতে চাইছিলাম লেখাটার দুর্বলতা বা শক্তি কোথায়।
আপনাকে আবারও ধন্যবাদ।

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

অতিথি লেখক's picture

পারলে পুরো লেখাটাই দিয়ে দেন তুলিরেখা।

---মোখলেস হোসেন

সোহেল ইমাম's picture

লেখাটা কোনক্রমেই বন্ধ করবেননা। সব গুলো কিস্তি দেন। যদি আপনি একান্তই মনে করেন কোন দুর্বলতা আছে তবে সেটা এভাবে প্রকাশ করতে করতেইআরো স্বচ্ছ ভাবে আপনিই বুঝতে পারবেন। আর পাঠক হিসেবে দাবী করছি গল্পটা পুরো শুনতে চাই, আশা করি নিরাশ করবেননা।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

তুলিরেখা's picture

আহা, সেকথা আরো অন্যান্য পাঠকেরা বলুন তাহলে । তখন নাহয় দেওয়া যাবে । গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের দাবীই গ্রাহ্য হয় । হাসি

-----------------------------------------------
কোন্‌ দূর নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ-চোখে ছবি দেখে
একা জেগে রয় -

মন মাঝি's picture

এইত্তো - আমিও বলছি যে! শুনতে চাই, শুনতে চাই, শুনতে চাই!!!

****************************************

সোহেল ইমাম's picture

গণতন্ত্রকে অনুসরন করতে গিয়ে লেখা বন্ধ করবার যোগাড় করবেন নাকি। আমি হলে একটা পাঠকের জন্যই লিখতাম। লিখতে লিখতেই কিন্তু শুধরে নেওয়া চলে, ব্লগে প্রকাশ এবং মন্তব্যের অবকাশটা কাজে লাগাতে পারেন। লেখা হয়ে গেছে এরকম একটা রচনা পুরোটাই হাওয়া হয়ে যাবে এটা মানতে পারছিনা।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

অতিথি লেখক's picture

বন্ধ হবে কেন! আপনি পুরোটা প্রকাশ করে দিন। বড় লেখা পড়তে আমার ভালো লাগে। আমি নিশ্চিত আরও অনেকেরই ভালো লাগে।

---মোখলেস হোসেন

Post new comment

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.