লক্ষ্য করলাম, তর্ক সাধারণত হয় উন্মুক্ত বনাম বদ্ধ পদ্ধতির উত্তোলন নিয়ে, দেশি বনাম বিদেশি লুট নিয়ে, কম বাস্তুচ্যুত না বেশি সে নিয়ে, কম ক্ষতিপূরণ না বেশি তা নিয়ে। কিন্তু ব্যক্তি বনাম গণের তর্ক কোথাও দেখি না। ব্যক্তির জমি তার অমতে ‘জাতির বৃহত্তর স্বার্থে‘ জবরদখল করা ক্ষতিপূরণ-অপূরণ প্রসঙ্গ ব্যতিরেকে আদৌ যায় কিনা সেটা নিয়ে কারও প্রশ্ন নেই। ওটা নিয়ে ডান-বাম, কিউবা-বাংলাদেশ-ইউএস সবার অবস্থান এক। জবরদখলের তরিকা আর পরবর্তী কর্মকাণ্ড নিয়ে কেবল তাদের তর্ক।
১৪৩। (১) আইনসঙ্গতভাবে প্রজাতন্ত্রের উপর ন্যস্ত যে কোন ভূমি বা সস্পত্তি ব্যতীত নিম্নলিখিত প্রজাতন্ত্রের উপর ন্যস্ত হইবে:
(ক) বাংলাদেশের যে কোন ভূমির অন্তঃস্থ সকল খনিজ ও অন্যান্য মূল্যসম্পন্ন সামগ্রী;
(খ) বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জলসীমার অন্তর্বর্তী মহাসাগরের অন্তঃস্থ কিংবা বাংলাদেশের মহীসোপানের উপরিস্থ মহাসাগরের অন্তঃস্থ সকল ভূমি, খনিজ ও অন্যান্য মূল্যসম্পন্ন সামগ্রী; এবং
(গ) বাংলাদেশে অবস্থিত প্রকৃত মালিকবিহীন যে কোন সম্পত্তি।
(২) সংসদ সময়ে সময়ে আইনের দ্বারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জলসীমা ও মহীসোপানের সীমা-নির্ধারণের বিধান করিতে পারবেন।
সাংবিধানিকভাবে আমরা ভূমির উপরিভাগ (surface) ব্যবহার করতে পারি। এর অভ্যন্তরভাগের সম্পদ আমাদের অধিকারভুক্ত নয়। এই সম্পদ প্রজাতন্ত্রের মালিকানাধীন এবং প্রজাতন্ত্র কর্তৃক ব্যবহারযোগ্য। এই প্রজাতন্ত্রের সংজ্ঞা খুঁজলে কিন্তু দেখা যাবে আপনার উদ্দিষ্ট ‘ব্যক্তি’ ‘গণের’ ভেতর বিলীন হয়ে গেছে। এই পয়েন্টে নৈষাদের একটা পোস্টে বিস্তর আলোচনার সুযোগ হয়েছিল আপনার সাথে। মার্জিনে মন্তব্য তাই উহ্য রাখলাম।
এবার দেখা যাক ব্যক্তির জমি তার অমতে ‘জাতির বৃহত্তর স্বার্থে‘ জবরদখল (পরিভাষায় অধিগ্রহণ) করা ক্ষতিপূরণ-অপূরণ ব্যতিরেকে আদৌ যায় কিনা। ব্যক্তির জমি বলতে যদি ধরে নেই যে আপনি ব্যক্তির সম্পদের অধিকার (right to property) কে বুঝিয়েছেন, তবে এর দ্বারা কতগুলো ভিন্নভিন্ন অধিকার অনুমান করা যায়- যেমন
-সম্পদ ব্যবহার করা বা না করা
- সম্পদ অন্যর দ্বারা ব্যবহৃত হওয়া থেকে বিরত রাখা
- বিক্রয়, হস্তান্তর, ভাড়া দেয়া, বন্ধক দেয়া, দান করা
- কোন সময়ের পরিসীমা ব্যতিরেকে এই অধিকারগুলো ভোগ করতে থাকার অধিকার লাভ।
এখন এই অধিকারগুলো কি চূড়ান্ত? মোটেও নয়। আপনার জমিটা ড্যাপ-এর আওতায় পড়লে জোনিং ল, বিমানবন্দরের কাছে হলে এভিয়েশন ল, বাড়ি করতে গেলে বিল্ডিং কোড, কারখানা করতে গেলে পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ হাবিজাবি আইন বিধান খাড়া হবে। ফলতঃ আপনার আগের উপলব্ধিতে আসা সম্পদের অধিকারটি মোটেও নিরঙ্কুশ নয় দেখা যাচ্ছে। এখন একজন লিবার্টারিয়ান চোখমুখ শক্ত করে প্রশ্ন করতেই পারে, আমার জমিতে আমি পুকুর কাটব, অথবা পাহাড় বানাব, তাতে রাষ্ট্র খবরদারি করার কে?
উত্তম প্রস্তাব!
ধরা যাক, দবির এবং সাবেত ঢাকা শহরে ধানমণ্ডি লেকের ধারে পাশাপাশি দুই খণ্ড জমির মালিক এবং তারা অতি পুরাতন বন্ধু। দবির কিঞ্চিত অর্থ বিত্তের মালিক হবার সুবাদে তার জমিতে একখানা বহুতল ভবন তুলে ফেলল। সাবেতের জমিটা পেরিয়ে দবিরের বাড়ি হতে সামনের রাস্তায় উঠতে হয় এবং রাস্তায় উঠবার জন্য এর বিকল্প উপায় রাখবার কোন প্রয়োজন সে অনুভব করে নাই। বাড়ি করবার সময় সাবেতের জমিটা ফাঁকাই ছিল। কোন এক মনোরম মনোটোনাস বিকেলে কোন এক পানশালায় তাদের উভয়ের মধ্যে কোন এক অতীব জনগুরুত্বপুর্ণ বিষয়ে অতিশয় মনোমালিন্য ঘটে গেলো। পরদিন সাবেত তার জমিতে একখানা অতিশয় গভীর পুকুর খনন কার্য হাতে নিয়ে অতি দ্রুত তা বাস্তবায়ন করে ফেলল, কেননা নিজের জমিতে দবিরের রুচিমত বহুতল অট্টালিকা করার অধিকার থাকলে পরে সাবেতেরও নিজ জমিতে অতি গভীর পুকুর খননের অধিকার পয়দা হয়। এইবার দবিরের বহুতল অট্টালিকা স্পেকট্রাম গার্মেন্টসের মতন ভেঙ্গে পড়বার উপক্রম ঠেকায় কে?
উপরের উদাহরণটি কেবল একটা ধারণামাত্র। যুক্তি খাড়া করে এর অনেক সমাধান দেয়া সম্ভব হয়ত। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এর থেকেও জটিল ও কুটিল পরিস্থিতিতে পড়তে হয় অনেককে। এই কারণে রাষ্ট্র তথা সরকারকে বিল্ডিং কোড বানাতে হয়। শহরে যান চলাচলের জন্য জমি ছাড়তে, ক্ষেত্রমত আপনার ভাষায়, জবরদখল করতেও হয়। কয়লাখনির বিষয়টিও ব্যতিক্রম নয়। সেখানে ৬.৬৮ বর্গ কিমি এলাকায় অসংখ্য ভূমির মালিক রয়েছেন। এমন একটা অবস্থা কল্পনা করা যায় কি যে ঐ এলাকার প্রত্যেকটা পৃথক ভূমিখন্ডের মালিক একটা করে কূপ খনন করলেন এবং নিজে নিজেই কয়লা উত্তোলন শুরু করলেন (চরম ব্যক্তিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে)? নাকি তারা সবাই মিলে একটা বহুজাতিক কোম্পানির সাথে একটা পি এস সি করবেন? কেবল কয়লা না, সম্পদের ভেতর গ্যাস, তেল ইত্যাদিও আসবে কিন্তু। সেগুলো কিন্তু কম্প্যাক্ট থাকে না। একটা ছোট কূপ খুঁড়ে কয়েক বর্গ কি মি এলাকার ভুগর্ভস্থ সম্পদ তুলে ফেলা সম্ভব। তখন আমার জমিতে কূপ করে আপনার জমির নীচের গ্যাস, তেল শুষে নিয়ে নিলে কি উপায়ে আমাকে ঠেকাবেন তার তরিকাও জানা থাকা দরকার।
পাশের জমির মালিক আইল ভেঙ্গে আমার জমি দখল করতে এলে রাষ্ট্রের কথা আমার মনে পড়ে। উজানের ক্ষেতের মালিক আইল বেধে পানি আটকে দিলেও আমরা রাষ্ট্রের (মূলত গণের) স্মরনাপন্ন হই। আমার ধান কেটে নিয়ে গেলেও তাকে মনে পড়ে। এমনকি বৃষ্টি অথবা বৃষ্টিহীনতায় আর বজ্রপাত হয়ে ফসল নষ্ট হলেও একটা গাল দেই রাষ্ট্রকে। সারের দাম বাড়লে মনে পড়ে। ধানের দাম কমলেও বলি রাষ্ট্র করেটা কি।
কেবল যখন রাষ্ট্র জনস্বার্থর কথা বলে জমি নিতে আসে, তখন আমি বিদ্রোহী হয়ে উঠি। ভালই তো।
নির্দিষ্ট নীতি মেনে অধিগ্রহণ করা ছাড়া খুব একটা রাস্তা এই অবস্থায় খোলা নেই। মার্কেট রুল দিয়ে এই স্পেকুলেটিভ বাবল থেকে কোনোভাবেই হয়ত সাম্যাবস্থায় যাওয়া সম্ভব হবে না - তবে সেই পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে দেখতেও অসুবিধা নেই। আমার ধারণা আপনি যে ভাবেই অধিগ্রহণ করেন (মার্কেট রুল দিয়ে বা সরকারী উদ্যোগে), সর্বশেষ ওপিনয়ন পোলে সব জমির মালিকেরাই বলবেন তারা বঞ্চিত হয়েছেন। যেহেতু জমির দাম বিষয়টা স্পেকুলেটিভ - অধিগ্রহণের পলিসিও বানানো সম্ভব না, যাতে সবাই খুশী হবেন।
বাবল যেমন ভয়, অধিগ্রহণ আরেকরকম ভয়। একটা হলো মার্কেটের সমস্যা। আরেকটা হলো সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক ভায়োলেন্স। আমি আপাতত সমাধানটা এভাবে দেখছি, যদি পারেন এটার সমস্যাগুলো উল্লেখ করুন, আমার কাজে দিবে। পাঁচজন মালিকের সবাইকে একই দাম না দিয়ে প্রত্যেকের নিজস্ব দাবি অনুযায়ী শিল্প মালিক দাম দিবে। কারণ মূল্য সাব্জেক্টিভ। অর্থাৎ এখানে কোনো প্রকার অধিগ্রহণের প্রশ্নই নেই। নরমাল জমি কেনাবেচার সিনারিও। জমির মালিক জমি রেখে দেয়ার চেয়ে যে দামে ছেড়ে দেয়াকে ন্যায্য মনে করবে, শিল্প মালিকের পোষালে সেই দামে কিনবে। সেটা হলে জমির মালিক কোনো পোলেই বলতে যাবে না যে সে বঞ্চিত হয়েছে।
আর যদি বেচতেই রাজি না হয়? এটা হয়তো আমরা একটা সমস্যা ভাবছি। কিন্তু সমস্যা হবে তখনই যখন শিল্পায়ন বা খনিজ উত্তোলনকে অবধারিত ভাববো। কিন্তু জগতের সকল কিছুই কন্টিন্জেন্ট, শিল্পায়ন আর খনিজ উত্তোলন কেনো ইনেভিটেবল ধরা হবে? ধরা হয় দেখে যেকোনো উপায়ে শেষ পর্যন্ত সেটা ঘটানোর চেষ্টা চলে। রাষ্ট্রের জমি অধিগ্রহণের পলিসি ইত্যাদির ঐতিহাসিক কারণ এটাই। কোনো জনস্বার্থ নয়। এখানে মূলত বিত্তবান ও ক্ষমতাগোষ্ঠির স্বার্থ জড়িত, একারণে রাষ্ট্র এটা অবধারিত ভাবানোর ফ্রেইমওয়ার্ক আইনে করে রেখেছে।
শিল্পায়ন খনিজ উত্তোলন ইত্যাদি বিশেষ কী কারণে কিছু মানুষের উপর অন্যায় করে বা বঞ্চিত করে এগুনোর ক্ষমতা রাখে? বাকি জনগোষ্ঠির সেটার লাভ উসুলের খুব তাড়া? এখানে একটা চাক্ষুস অন্যায় ও অসঙ্গতি আছে। অন্যদিকে শিল্পায়ন ও খনিজ উত্তেলনকে যদি অবধারিতের মর্যাদা দেয়া হয় (অধিগ্রহণ ইত্যাদি যেকোনো মূল্যে ঘটাতেই হবে) তাহলে সেটার সমস্যাটা কতো বিশাল কল্পনা করুন। এই ফ্রেইমওয়ার্ককে ব্যবহার করে অন্যায় সাধনের কতো বিস্তর সুযোগ। এবং সেখানে জনস্বার্থের নামে বিত্তবান ও ক্ষমতাগোষ্ঠির স্বার্থ দেখার সুযোগ ও প্রণোদনাই কিন্তু সবচেয়ে বেশি। সেই অর্থে অধিগ্রহণ একটা বিপজ্জনক টুল।
আপনার আলোচনা থেকে অনেকগুলো ইস্যু নিয়ে বিস্তর আলোচনার সুযোগ আছে। আমি আমার মত করে সংক্ষেপে একটা কাঠামো দাড় করাবার চেষ্টা করি। যেহেতু অধিগ্রহণ এবং ব্যক্তির মত- এই দুইটা শব্দকে আপনার আলোচনায় গুরুত্বপুর্ণ মনে হয়েছে সবথেকে বেশি, কাজেকাজেই এই দুইটা শব্দকে জেনারেলাইজ করেই আমি অগ্রসর হব।
১। রাষ্ট্র চিন্তা করল একটা উন্নয়ন কাজ হাতে নেয়া দরকার। (উন্নয়ন কাজের সংজ্ঞা পরিধি নিয়া আলোচনা উহ্য থাকল এখানে)। এই উন্নয়ন একটা মাইনিং হতে পারে। একটা বড় মহাসড়ক বানানো হতে পারে। একটা শিল্প কারখানা স্থাপন হতে পারে।
২। এই উন্নয়ন কাজের জন্য কিছু জমির দরকার।
ক) এই জমি সরকারের নিজস্ব থাকতে পারে। যেমন খাস জমি। সেক্ষেত্রেও অবৈধ দখলকার উচ্ছেদের প্রয়োজন ঘটতে পারে। সেদিকে যাব না। ধরে নেই সরকারী জমি হলে সরাসরি উন্নয়ন কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া সম্ভব। আমরা দ্বিতীয় পয়েন্টে যাব, যেখানে অন্য কোন পার্টি বা ব্যক্তি জমির মালিক।
খ) এই জমি সরকারী দখলে না থাকলে সরকারকে এই জমি ব্যবহারের অধিকার অর্জন করতে হবে। ধরে নেই এই জমি অনেক ব্যক্তি ভোগ দখল করে থাকেন।
৩। প্রয়োজনীয় জমি সরকার অন্য ব্যক্তির কাছ থেকে ন্যায্য দামে কিনে নেবার প্রস্তাব দিতে পারে। সেক্ষেত্রে দুইটা বিষয় ঘটতে পারে।
ক) সব ব্যক্তি ন্যায্য দামে জমি সরকারকে ছেড়ে দিতে রাজী হতে পারে। সেক্ষেত্রে সমস্যা দেখি না।
খ) কিছু ব্যক্তি, অন্তত একজন ব্যক্তি ন্যায্য দামে (ন্যায্য দাম একটা অসাধু শব্দ। আপনি যাকে ন্যায্য দাম বলবেন, আমার কাছে তা অন্যায্য হতে পারে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এমন অনেক মানুষ এদেশে আছেন যারা নিজের ভিটামাটি কোন কিছুর বিনিময়ে হস্তান্তরে রাজী হবেন না। তাদের ক্ষতিটাকে অর্থমূল্যে পুষিয়ে দেবার ধারনাটি ভ্রান্ত, আমার বিচারে।) জমিটা ছেড়ে দিতে রাজী নন। ঐ জমিটুকু এমন যে চাইলে ঐ জমিটুকু বাদ দিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন অসম্ভব। যেমন কয়লা খনির কথা চিন্তা করেন। প্রকল্পের মাঝখানে একজন লোকের জমি এবং তিনি কোন মূল্যেই তার জমিটা হাতছাড়া করতে রাজী নন। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্র দুইটা কাজ করতে পারে।
- এক। প্রকল্পটি বাদ দেয়া।
- দুই। ঐ লোকটিকে তাঁর অপূরণীয় ক্ষতি (irreparable loss শব্দটা নিয়ে এলাম) সত্ত্বেও বৃহত্তর স্বার্থে জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য করা।
এখন প্রথম ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসবে- কেবল একজন বা গুটিকয়েক লোকের স্বার্থে (আমার বিচারে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বিপরীতে ক্ষুদ্র স্বার্থ) প্রকল্পটি বাতিল হবে কিনা? এইখানে একটা ডাল ফেলে গেলাম আলোচনার জন্য। অধিগ্রহণ কেবল মাইনিং এর ক্ষেত্রে নয়। বরং অন্য আরও অনেক ক্ষেত্রে অবধারিত হয়ে পড়ে, আলোচনার পরিধি সেই পর্যন্ত বিস্তৃত রাখলে সুবিধা হয়।
উত্তরবঙ্গের একটি জেলায় উপজেলার সাথে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে একটা বড় সেতু তৈরির প্রয়োজন পড়ল। সেতুর আগে এবং পড়ে বেশ কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি। তার কিছু অংশ একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির অধিকারে ছিল। কোন এক বিচিত্র কারণে সেতুটি যাতে তৈরি না হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি তৎপর ছিলেন। অধিগ্রহণের ইস্তেহারের বিরুদ্ধে তিনি প্রথমে দেওয়ানী আদালতে গেলেন। আদালতের রায় তার বিপক্ষে গেলো। অধিগ্রহণের কাজ পুনরায় শুরু হবে- এমন সময় একরাতে সড়কের প্রায় উপরে একটা কবর তৈরি করলেন তিনি, যাতে ঐ জমিটা অধিগ্রহণ করা না যায়। যেকোন বিষয়ে আমাদের (আসলে তাবৎ মানবকুলের) মানসিকতা সবসময় ধনাত্মক থাকে না বোধ হয়।
অধিগ্রহণের ফলে ব্যক্তির যে ক্ষতি হয়, আমি তা গণনায় বাদ দিতে উৎসাহী নই মোটেও। রাষ্ট্রের যথেচ্ছাচারের অকুণ্ঠ সমর্থন করারও কারণ নেই কোন। আমাদের অধিগ্রহণ আইনে যেভাবে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবেই না ধীরে ধীরে আইন অধিক জনবান্ধব হয়ে উচ্ছেদকৃত মানুষের ক্ষতিটা সহনীয় হয়ে উঠতে পারে। আমি বরং আপনার শেষ প্রশ্নটায় থাকি।
আমি মনে করি জনস্বার্থে ব্যক্তির কিছু অধিকার লঙ্ঘন অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। আগেই দেখিয়েছি ক্ষেত্র বিশেষে রাষ্ট্রকে আইনি বল প্রয়োগে বাধ্য হতে হয়। অধিগৃহীত জমির সাথে অনেকগুলো ফ্যাক্টর যুক্ত হবে। এর মধ্যে আর্থিক, সামাজিক, মানসিক, ধর্মীয়,গোষ্ঠীগত, রাজনৈতিকসহ অনেক বিষয় লতায়পাতায় জড়ানো। এর সবগুলো অধিকার কেউ অক্ষুন্ন রেখে আমার সম্পদ হস্তগত করতে পারবে বলে মনে হয়না।
ধরা যাক ফুলবাড়ির কয়লা খনির মাঝখানে আমার একটা বাড়ি আছে। এই জমির একটা মূল্য আছে। অধিগ্রহণ আইনে বলা হয়েছে অধিগ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঐ একই এলাকার বিদ্যমান সমশ্রেণীর (আমাদের দেশের ভূমির শ্রেণী ভূমি রেকর্ডে উল্লেখ থাকে- যেমন দলা, ডাঙ্গা, পুকুর, ভিটা ইত্যাদি। সংশ্লিষ্ট এলাকার সাব রেজি। অফিস থেকে সমশ্রেণীর জমির কেনাবেচার মূল্য সংগ্রহ করা হয়) জমির মুল্যর দেড়গুণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। ঐ জমির উপর থাকা গাছপালা, ফসল, বাড়িঘর স্থাপনা, পুকুর থাকলে মাছের মুল্য নির্ধারণ করে তা পরিশোধ করতে হবে। এখন আমার হয়ত ঐ জমি বিক্রি করার আদৌ কোন প্রয়োজন নেই। তবুও অধিগ্রহণের পাল্লায় পড়ে জমি হাতছাড়া হবে। আমাকে দশগুণ মূল্য দিলেও হয়ত আমি ঐ জমির কিছু সুবিধা অন্য কোথাও পাব না। এছাড়া নগদ অর্থ হাতে পেলে এই অর্থ ব্যয়িত হয়ে যাবার সম্ভাবনা তো আছেই। পরে আমি বাস্তুহীন যাযাবর হয়ে ঘুরে বেড়াব। বাড়ির পাশের যে পরিবেশ আমার ছিল, কোন অর্থ দিয়ে কি তা পুনরুদ্ধার বা ক্ষতিপূরণ করা কি আদৌ সম্ভব? আরও আছে সামাজিকভাবে হেয় হবার সম্ভাবনা- অমুকের বাড়ি সরকার ভেঙ্গে দিয়েছে ইত্যাদি। আমার একটা পরিচিত সমাজ বা গোষ্ঠী আছে এখানে যা হারাতে হবে।
শুধু অর্থ দিয়ে আমার অমতের অ কর্তন করে কখনো কখনো মতে পরিণত করা হয়ত সম্ভব। সেক্ষেত্রেও কিন্তু মত আর অমতের ফাইন লাইনটি খুব সূক্ষ্ম।
ব্যাপারটা বৃহত্তর জনগোষ্ঠির স্বার্থ বনাম ক্ষুদ্র স্বার্থ হিসেবে দেখার চেষ্টা করা যায়। কিন্তু স্বার্থ দুটো একই ক্যাটাগরির নয়। বৃহত্তর জনগোষ্ঠির স্বার্থটা পূর্বে অনুপস্থিত ছিলো। অর্থাৎ সেটা তাদের বিদ্যমান অধিকার ছিলো না। বরং ইন্ভেন্ট করা হয়েছে (রাস্তা বা বাঁধ নির্মাণ পরিকল্পনা) বা ডিস্কভার করা হয়েছে (খনি)। আর ক্ষুদ্র স্বার্থটা বিদ্যমান। ক্ষুদ্র স্বার্থটা ডিনাই করার জন্যে আপনাকে ভায়োলেন্স করতে হচ্ছে, কারণ সেটা একটা বিদ্যমান অধিকারকে পরিবর্তন করে। কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠির স্বার্থটা ডিনাই করার মাঝে ভায়োলেন্স অনুপস্থিত, কারণ বৃহত্তর স্বার্থটা ইন দ্য ফার্স্ট প্লেইস একটা ইনোভেশন। এটাকে ভায়োলেন্স ধরলে সরকার যে কোনো সময় যেকোনো জায়গায় রাস্তা বা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করে ক্ষুদ্র স্বার্থটাকে ভায়োলেন্স হিসেবে দেখাতে পারে। সেটা একটা অসঙ্গতি ও অ্যাবসার্ডিটি তৈরি করে। ফলে লঙ্ঘনের প্রশ্নে দুটো দুই ক্যাটাগরির।
এখন আপনি ভাবতে পারেন যে যেসব লঙ্ঘনের প্রশ্নে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ-এ সিমেট্রি আছে সেখানে আমি বৃহৎ স্বার্থের পক্ষে যাবো। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থের ব্যাপারে আমার ইদানিংকার চিন্তা হচ্ছে যে এর পুরোটাই ব্যক্তি লেভেলে এক্সপ্লেইন করা যায়। সেক্ষেত্রে বৃহত্তর স্বার্থ একটা অতিরিক্ত অভিধা। যেমন ধরুন দশ হাজার মানুষের একটা সমাজে একজন ব্যক্তি যদি তার জমিতে এমন কারখানা স্থাপন করে যার জন্যে বাতাসে বিষাক্ত গ্যাস ছড়ায় ও সমাজের বাকি সবাই এর দ্বারা আক্রান্ত হয়, কেউ হয়তো ভাববে এটা ক্ষুদ্র স্বার্থ বনাম বৃহত্তর স্বার্থ কেইস এবং কারখানা মালিককে নিরস্ত করা উচিত কেবল একারণে যে এখানে ক্ষুদ্র স্বার্থ দ্বারা বৃহত্তর স্বার্থ আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু ওই কারখানা দ্বারা যদি সমাজের বাকি সবাই নয় কেবল কারখানার পাশের জমিটা আক্রান্ত হতো, তাহলে কি বিচার ভিন্ন হতো? কমনসেন্স বলে যে না। অর্থাৎ বৃহত্তর স্বার্থ জিনিসটা আমি explain away করে ফেলছি ব্যক্তি লেভেলে লঙ্ঘন দিয়ে। অর্থাৎ বৃহত্তর স্বার্থ বলে আলাদা কিছু থাকছে না। যদিও তার মানে এই নয় যে বৃহত্তর স্বার্থ ডিনাই করা হচ্ছে। বরং প্রতিটি ব্যক্তির অধিকার অটুট রাখার মাধ্যমেই বৃহত্তর স্বার্থটা ইমার্জ করছে।