১৯৭০-এর নির্বাচন পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পাকিস্তানী মিথ্যাচার

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture
Submitted by Shashtha Pandava on Sat, 05/01/2019 - 4:08pm
Categories:

ডিসেম্বর মাস আসলে পাকিস্তানের মিডিয়াগুলোতে ‘১৬ই ডিসেম্বর’ প্রসঙ্গে মৃদু নড়াচড়া শুরু হয়। এই সময়ে ‘Dhaka Fall’ নামে ‘ভারতের কাছে যুদ্ধে পরাজয়’ অথবা ‘দেশ ভাঙা’ অথবা ‘পূর্ব পাকিস্তান হারানো’ প্রসঙ্গে কিছু পাকিস্তানী বক্তা টকশো বা সাক্ষাতকারে গরম গরম কথা বলার বা পাকিস্তানী লেখক পত্রিকার কলামে বা ব্লগে গরম গরম লেখার চেষ্টা করেন। বিষয়টা তাদের কাছে গৌরবের না বলে এইসব গরম বক্তা-লেখকগণ চেষ্টা করেন কোন না কোন ব্যক্তি বা দল বা প্রতিষ্ঠানকে দোষী সাব্যস্ত করে এই পরাজয়ের দায় তার/তাদের ওপর চাপাতে। বলাবাহুল্য, পাকিস্তানে এইপ্রকার আলোচনার আগুন ১৭ই ডিসেম্বরেই নিভে যায়। পাকিস্তানী মিডিয়াও তাই চায়, নয়তো তারা এই বিষয়ে বছরের অন্য সময়েও আলোচনা করতো অথবা অন্য সময়ে ডিসেম্বরের আলোচনার ফলোআপ করতো। পাকিস্তানী মিডিয়ার দরকার ১৯৭১ নিয়ে এমন একটা ইস্যু যেটা নিয়ে পাকিস্তানের দর্শক-শ্রোতা-পাঠকেরা এক-আধদিন উত্তপ্ত আলোচনা করবেন তারপর ভুলে যাবেন। এতে তাদের মিডিয়ার সার্কুলেশন-টিআরপি বাড়ে, বিজ্ঞাপনের আয় বাড়ে।

গত দুই দশকে স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও ইন্টারনেটভিত্তিক মিডিয়ার ব্যাপক প্রসার ঘটায় পাকিস্তানী মিডিয়ার এইসব মৌসুমী নড়াচড়া, ব্লেইম গেম আমাদের কাছ পর্যন্ত চলে আসছে। এইসমস্ত কথাবার্তাতে কয়েকটা জিনিস খুব স্পষ্ট, পরিচয় নির্বিশেষে প্রায় কোন পাকিস্তানী লেখক-বক্তা এবং মন্তব্যকারী পাকিস্তানী পাঠক-শ্রোতা —

১. ১৯৭১-এর যুদ্ধটিকে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ বলেন না।

২. পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা, কমপক্ষে ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা, কয়েক লক্ষ নারীকে ধর্ষণ, অগণিত মানুষকে নির্যাতন, ধ্বংসযজ্ঞ, লুটপাট ইত্যাদির কথা বলেন না। তাদের কেউ কেউ অল্পস্বল্প হত্যার কথা স্বীকার করলেও ব্যাপক গণহত্যা এবং ধর্ষণসহ অন্যান্য অপরাধগুলোর ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলেন না।

৩. বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা সংঘটিত পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের মেধাবী ও কৃতী সন্তানদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করার কথা বলেন না।

৪. ২৫শে মার্চ, ১৯৭১-এর রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক ব্যাপক মাত্রায় গণহত্যা, ইপিআর ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারের মতো সরকারী সংস্থাগুলোতে আক্রমণ করে সেখানে অবস্থানরত ইপিআর ও পুলিশ সদস্যদের হত্যা, এবং সেনানিবাসগুলোতে অবস্থানরত সামরিকবাহিনীর বাঙালী সদস্যদের হত্যার কথা বলেন না।

৫. বিবিসি, ভয়েস অভ আমেরিকা’র ন্যায় বিদেশী রেডিও চ্যানেল যেগুলো পাকিস্তানে শোনা যেতো সেগুলোতে পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা বাংলাদেশে সংঘটিত নৃশংসতার কথা প্রচারিত হলেও পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ কর্তৃক সেগুলো না মেনে পাকিস্তান সরকারের বলা মিথ্যাচারসমূহ মেনে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সমর্থনের কথা বলেন না। যেখানে সামরিক শাসক আইউব আমল থেকে সবার জানা ছিল যে, সরকারী মিডিয়াতে বলা কথাবার্তার অধিকাংশই মিথ্যাচারে পূর্ণ প্রপাগান্ডা মাত্র। তাছাড়া বিদেশে অবস্থানরত বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানী সেখানকার মিডিয়া থেকে সত্যটি জানলেও সেসব স্বীকার না করে সরকারী ভাষ্যকে সমর্থনের কথা বলেন না।

৬. ভুয়া ‘জ্বিহাদ’-এর নাম করে বাংলাদেশে নৃশংসতা চালানোর জন্য পাকিস্তান সরকারকে সাধারণ পাকিস্তানীদের প্রদত্ত অর্থ সাহায্য ও স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে যুদ্ধে যোগদানের কথা বলেন না। ইসলামের নামে বাংলাদেশে হত্যাযজ্ঞ চালানো, আটককৃত নারীদের ‘গনিমতের মাল’ আখ্যা দিয়ে ধর্ষণ করাকে ইসলামের নামে জাস্টিফাই করার কথাও বলেন না।

৭. পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালীদের সাথে সাধারণ পাকিস্তানীদের করা নৃশংস ও অমানবিক আচরণের কথা স্বীকার করেন না।

৮. বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসাবে স্বীকার করেন না এবং মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর চূড়ান্ত বিজয়ের কথা স্বীকার করেন না।

৯. পাকিস্তান ভাঙার জন্য আওয়ামী লীগ, মুজিব উর রেহমান (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান), পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু জনগোষ্ঠী, পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু শিক্ষকগণ, ভারত সরকার, ইন্দিরা গান্ধী, জুলফিকার আলী ভুট্টো ইত্যাদি এক হাজারটা কারণকে দায়ী করলেও পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী, যারা আসল নৃশংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, তাদের অপকর্মের ব্যাপারে টুঁ শব্দটি করেন না।

১০. এখনো পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তকসমূহে ১৯৭১ সালের ঘটনাবলী সম্পর্কে মিথ্যাচার, পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা, ধর্ষণসহ অন্যান্য অপরাধের ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকা, বাংলাদেশের জনগণের প্রতি বৈষম্য ও অন্যায় আচরণের কথা না বলে ভারতকে জড়িয়ে মিথ্যা কল্পকাহিনী বলা, হিন্দু ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীকে বিশ্বাসঘাতক ও ভারতের দালাল আখ্যা দেয়ার ব্যাপারে কোন কথা বলেন না।

১১. বাংলাদেশের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করার ও বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনা ফিরিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে পাকিস্তান সরকারের কাছে দাবী উত্থাপনের কথা বলেন না।

১২. ত্রিদেশীয় চুক্তি অনুসারে যে সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পাকিস্তান সরকারের কথা ছিল তাদের বিচার করার দাবি উত্থাপন করেন না বা এটি এখনো না করার জন্য পাকিস্তান সরকারের সমালোচনা করেন না।

১৩. তারা বাঙালীদের দ্বারা কথিত বিহারী গণহত্যার ব্যাপারে নানা প্রকার গল্পকাহিনী বলে মায়াকান্না কাঁদেন কিন্তু বাংলাদেশে ফেলে রেখে যাওয়া কয়েক লাখ পাকিস্তানীকে ফেরত নেবার ব্যাপারে কোন কথা বলেন না।

১৪. বাংলাদেশ সরকার যথাযথভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে শাস্তি দিলে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহন করা হয় অথচ পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগী বাহিনী রাজাকার, আল বদর, আল শামস্‌, শান্তিকমিটির সদস্যদেরকে পাকিস্তানে আশ্রয় নেবার ব্যবস্থা না করে তাদেরকে বাংলাদেশে ফেলে রেখে যাবার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের সমালোচনা করেন না।

১৫. বঙ্গবন্ধুকে তাঁর আনুষ্ঠানিক নাম ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ নামে সম্বোধন না করে ‘মুজিব উর রেহমান’ বলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যাকে তাঁর আনুষ্ঠানিক নাম ‘শেখ হাসিনা’ নামে সম্বোধন না করে ‘হাসিনা ওয়াজিদ’ বলেন; কিন্তু পাকিস্তানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীকে ‘বেনজীর ভুট্টো’ বলেন কখনোই ‘বেনজীর জারদারী’ বলেন না।

উপরোক্ত বিষয়গুলোতে পাকিস্তানী লেখক-বক্তা এবং মন্তব্যকারী পাকিস্তানী পাঠক-শ্রোতাদের প্রায় সবার সম্মিলিত নিরবতা প্রমাণ করে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের জনগণ, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি বিষয়ে শুধু পাকিস্তান সরকার নয় অতি নগন্য ব্যতিক্রম ছাড়া পাকিস্তানের সাধারণ জনগণও আসলে একই প্রকার মনোভাব বা মোটামুটি ঐক্যমত পোষণ করেন। সততা, মানবতা, ন্যায়বিচার, সভ্য আচরণ, নৈতিকতা ইত্যাদি সদ্‌গুণাবলীকে জীবন থেকে বহু দূরে নির্বাসন দিতে পারলে এমন জান্তব জাতীয়তাবাদীতে রূপান্তরিত হওয়া যায়।

পাকিস্তানের মিডিয়াতে এইপ্রকার আলোচনা ‘গরম’ ইস্যু কেন? কারণ, ইদানীংকালে পাকিস্তানীদের ধারণায় থাকা ‘বাঙালীরা গরিব’, ‘বাঙালীরা আলাদা হয়ে ভুল করেছে’, ‘পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে সব দিক বিবেচনায় উন্নত দেশ’ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো বাস্তবের দুনিয়ায় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে মার খেতে শুরু করেছে। পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতি, অর্থনৈতিক উন্নতি, জননিরাপত্তা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-মানবসম্পদ খাতে উন্নয়ন, ধণাত্বক আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ইত্যাদি পাকিস্তানীদের মধ্যে এক প্রকার হতাশা ও বাংলাদেশের সাথে তুলনা করার চিন্তা এনেছে। তারা ভেবেছিল ভৌগলিক আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট, সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের দেশ বাংলাদেশের মানুষ বন্যা, সাইক্লোন, মহামারী, দুর্ভিক্ষতে মার খেতে খেতে একসময় তাদের কাছে নতজানু হয়ে পুনরেকত্রীকরণের কথা বলবে। এক কালে প্রায়ই তাদের মুখে অমন কথা শোনা যেতো। বাস্তবে তাতো ঘটেইনি উলটো বর্তমানে উন্নয়নের অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গিয়ে নিজেদেরকে বিশ্বদরবারে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছে। ফলে কোন কোন ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ব্যর্থতার প্রশ্নে অবধারিতভাবে বাংলাদেশের সাথে তুলনার প্রসঙ্গ এসে যাচ্ছে।

পাকিস্তানী মিডিয়ায় এই প্রকার আলোচনায় অবধারিতভাবে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পার্টি পাকিস্তান পিপলস পার্টি’র (পিপিপি) কেউ না কেউ থাকেন। সেখানে অন্য সব আলোচকেরা সাধারণত পিপিপি’র সদস্যকে তুলোধুনো করার এবং ভুট্টোর দোষে পাকিস্তান ভেঙেছে এমনটা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। এর উত্তরে ইদানীংকালে কিছু পাকিস্তানী এক প্রকার নতুন বক্তব্য দিচ্ছেন। ঐ প্রকার বক্তব্যের নির্যাস হচ্ছে — “যেহেতু এলএফও ১৯৭০-এর আওতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচন শেষে নির্বাচিত পরিষদ বসার দিন থেকে ১২০ দিনের মধ্যে নতুন সংবিধান রচনার বাধ্যবাধকতা ছিল তাই জুলফিকার আলী ভুট্টো চাইছিলেন পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনের আগে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে বসে সংবিধান রচনার ব্যাপারটি মীমাংসা করে ফেলতে। কারণ, পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনের ১২০ দিনের মধ্যে নতুন সংবিধান রচিত না হলে প্রেসিডেন্ট পরিষদ ভেঙে দিয়ে আবার সামরিক শাসন জারী করতে পারেন। শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে এই বিষয়টিতে মতৈক্য হচ্ছিল না। এই ফাঁকে সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালীদের দ্বারা বিহারী নিধণ বন্ধ করার চেষ্টা করলে ভারতের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ ও সশস্ত্র বাঙালীরা যুদ্ধ শুরু করে”। ('লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার ১৯৭০’ বা এলএফও ১৯৭০ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরে দেয়া আছে)

বলাবাহুল্য এই বক্তব্যটি মিথ্যাচারে পরিপূর্ণ। সাধারণত ইতিহাস আমাদের মনে থাকতে চায় না, তাই যে কেউ ইতিহাস নিয়ে কিছু একটা বলে দিলে আমাদের অনেকেই সেটা বিশ্বাস করে ফেলি। কষ্ট করে ইতিহাসের বই-পত্রিকা ঘেঁটে তথ্য যাচাইয়ের কাজ কেউ খুব একটা করতে চান না। তাছাড়া লোকজন বই-পত্রিকা পড়ার চেয়ে টিভি-ভিডিও দেখতে আগ্রহী তাই দুর্বৃত্তদের দলগুলো এমনসব আলোচনায় একটি মিথ্যা কথাকে বিভিন্ন জনে বিভিন্ন ভাবে বার বার বলে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে। আমাদের দায়িত্ব সবার সামনে সত্যটিকে তুলে ধরা যাতে, বার বার বলা অসত্য প্রচারণাকে মোকাবেলা করা যায়। পাকিস্তান ভাঙার দায় কার বা কাদের ওপর বর্তায় সেটা নিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকদের কোন মাথাব্যথা নেই, কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে মিথ্যাচার ও বাংলাদেশের জনগণের ওপর মিথ্যা দায়ভার চাপানোর চেষ্টা রুখে দাঁড়ানো আমাদের কর্তব্য।

১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের ইতিহাসের প্রথম সাধারণ নির্বাচন পরবর্তী সময়ের ঘটনাবলী ও সেসময়ে ঘটনাবলীর প্রধান কুশীলবদের ভূমিকা নিয়ে কথা বলার আগে পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর ইতিহাস নিয়ে কিছু জেনে রাখা ভালো।

১৯৫৪-৫৫ সালের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা শেষ করে পাকিস্তানে ফিরে আসার পর জুলফিকার আলী ভুট্টো দ্রুত পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর কাছাকাছি চলে যেতে সক্ষম হন। ১৯৫৭ সালে তাকে জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসাবে মনোনীত করা হয়। ১৯৫৮ সালে তাকে সমুদ্র আইন বিষয়ে জাতিসংঘের প্রথম সম্মেলনে পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের প্রধান করা হয়। একই বছর তিনি পাকিস্তানের সর্বকনিষ্ঠ কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী হিসাবে নিযুক্ত হন। ইতিমধ্যে দেশে সামরিক শাসন জারী হলেও ভুট্টোর গদি অক্ষুণ্ন থাকে। সামরিক শাসকদের সাথে তার সখ্যতা গভীর থেকে গভীরতর হয় এবং ১৯৬০ সালে তিনি কেন্দ্রীয় পানি, শক্তি, যোগাযোগ ও শিল্পমন্ত্রী হিসাবে নিযুক্ত হন। ভুট্টো ক্রমেই সামরিক শাসক আইউবের কাছের মানুষে পরিণত হন এবং ১৯৬৩ সালে তাকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৬৫ সালের অগাস্টে তার পরামর্শে আইউব সরকার ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ‘অপারেশন জিব্রালটার’ চালায় যা করুণভাবে ব্যর্থ হয়। এই অপারেশনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ বেঁধে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপে ১৯৬৬ সালের ১০ই জানুয়ারী ‘তাশখন্দ চুক্তি’র মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান হলেও যুদ্ধে পাকিস্তানকে বিরাট ক্ষয়ক্ষতির সন্মুখীন হতে হয়। চার সহস্রাধিক সৈন্য ও সাধারণ পাকিস্তানীর প্রাণ যাওয়া ছাড়াও সিন্ধু, পাকিস্তান পাঞ্জাব ও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের সর্বমোট ৩,৯০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভারতের দখলে চলে যায়। দীর্ঘ সামরিক দুঃশাসনে পাকিস্তানের জনগণ আইউব সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তুষ্ট ছিল; অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে দেশকে জড়িয়ে ফেলে পরাজয়ের দরুন জনগণের বিদ্যমান অসন্তোষ আরও বৃদ্ধি পায়। আইউব সরকার যুদ্ধে জয়ের দাবী করে প্রচারণা চালালেও তা বিশ্বাসযোগ্যতা পায় না। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারীতে আইউব সরকারের ডাকা জাতীয় সম্মেলনে বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আইউবের ব্যর্থতা ও তাশখন্দ চুক্তি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। দূরদর্শী ভুট্টো আইউব সরকারের পতন আসন্ন চিন্তা করে ১৯৬৬ সালের ৩১শে অগাস্ট মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

চট্টগ্রামের জালাল আবদুর রহীম ১৯৫৫ সালের শুরু পর্যন্ত পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন। কমিউনিস্টদের সাথে গভীর যোগাযোগ রাখা, নীৎসেপন্থী এই আমলা সরকারী চাকুরী ছাড়ার পর রাজনীতিতে সক্রিয় হন। জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে আগে থেকে তার যোগাযোগ ছিল।

পাঞ্জাবের (বর্তমানে ভারতের হরিয়ানা) পানিপথে জন্মানো মুবাশির হাসান পঞ্চাশের দশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পিএইচডি সম্পন্ন করে পাকিস্তানে ফিরে লাহোরের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। তার দাবী অনুযায়ী ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ তার মধ্যে রাজনীতি বিষয়ক চিন্তাভাবনা জাগ্রত করে। ১৯৬৭ সালে তিনি তার ছয়জন বন্ধুর সহায়তায় ‘আ ডিক্লারেশন অভ ইউনিটি অভ পিপল্‌’ নামে একটি গণতান্ত্রিক-সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো প্রণয়ন করেন। তারও আগে থেকে ভুট্টোর সাথে তার যোগাযোগ ছিল।

বাসিত জাহাঙ্গীর শেখ লাহোরের বিখ্যাত ফোরম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজের স্নাতক। ভুট্টোর সাথে তার পরিচয়ের শুরুটা জানা যায় না। বাসিতের অন্য কোন গুণপনা না থাকলেও তিনি আজীবন ভুট্টোর একান্ত বিশ্বস্ত জন ছিলেন।

১৯৬৭ সালের ৩০শে নভেম্বর মুবাশির হাসানের বাড়িতে উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে ভুট্টো পাকিস্তান পিপলস পার্টি গঠন করেন। এই ব্যক্তিবর্গ ভুট্টোর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রথম সাধারণ সম্পাদক জালাল আবদুর রহীম শুধু পার্টির গঠনতন্ত্রই রচনা করেননি, গণচীনের সাথে গভীর সংযোগ রক্ষার কাজটাও তিনি করতেন। তিনি বিশ্বব্যাপী ব্রিটিশ-মার্কিন আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য গঠিত SEATO ও CENTO জোটের অন্যতম সমর্থক ভুট্টোকে একজন সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাট হিসাবে দেখানোর পরিকল্পক এবং রাজনৈতিকশিল্পীও বটে। ১৯৭৪ সাল নাগাদ পিপিপি থেকে বামদের হঠানো ও রহীমের বিদায় ভুট্টোকে শক্তিশালী মিত্রদের কাছ থেকে দূরে ঠেলে অনিরাপদ করে তোলে। মুবাশির হাসান ছিলেন ভুট্টোর রাজনৈতিক ট্রাম্পকার্ড ‘আণবিক বোমা’ বানানোর প্রজেক্টের প্রধান এবং ভুট্টো সরকারের অর্থ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন মন্ত্রী।

একটা বিষয় স্মর্তব্য যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবী মার্কিন-ব্রিটিশ অক্ষ ও সোভিয়েত অক্ষে বিভক্ত ছিল। স্তালিনোত্তর যুগে গণচীনও আস্তে আস্তে একটি ভিন্ন অক্ষ গড়ে তুলতে থাকে। ভূরাজনৈতিক মাস্তানীতে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার লক্ষ্যে এই অক্ষগুলোর মোড়লেরা প্রতিনিয়ত দুর্বল দেশগুলোতে তাদের এজেন্টদেরকে রাষ্ট্রক্ষমতাতে তুলে আনতো। তাছাড়া রাষ্ট্রক্ষমতাতে অধিষ্ঠিত হতে পারুক বা না পারুক ঐ দেশগুলোর রাজনীতি বা রাষ্ট্রপরিচালনার বিভিন্ন স্তরে তাদের এজেন্টদের ব্যাপক ভূমিকা থাকতো। সামরিক অভ্যুত্থান, একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র নির্বাসন, নাগরিক অধিকার হরণ, ত্রাসের রাজত্ব কায়েম, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম ইত্যাদি বিষয়গুলোতে এইসব এজেন্টরা গভীরভাবে জড়িত থাকতো। ভুট্টো-রহীম-মুবাসিরদের ব্যাকগ্রাউন্ড এবং পরবর্তীতে তাদের কার্যক্রম বিবেচনায় নিলে এতদিন পরে তাদের অক্ষসংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা করা যায়।

১৯৬৬ সালের ৩১শে অগাস্ট অজনপ্রিয় সামরিক সরকার থেকে পদত্যাগ করে ভুট্টো তার শরীর থেকে সামরিক শাসকের সহযোগী পরিচয়টা সাময়িকভাবে মুছে ফেলতে সমর্থ হন। এইসময়ে নিয়মিতভাবে তরুণদের মধ্যে গরম গরম বিপ্লবী বক্তৃতা দেয়া, বাম ঘরাণার বুদ্ধিজীবিদের নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন, “ইসলাম আমাদের বিশ্বাস, গণতন্ত্র আমাদের নীতি, সমাজতন্ত্র আমাদের অর্থনীতি, সকল ক্ষমতা জনতার’ – ধরনের জনপ্রিয় শ্লোগান দিয়ে ভুট্টো আইউববিরোধী বিক্ষুব্ধ পশ্চিম পাকিস্তানীদের মধ্যে রাতারাতি আলোড়ন তুলতে সক্ষম হন। বহুজাতিক পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানীয় দলগুলো শক্তিশালী হলেও জনপ্রিয় ধারণাগুলোকে জাতীয় পর্যায়ে ধারণ করার মতো সমর্থ ছিল না। ফলে, আইউবের শাসনে বিরক্ত পশ্চিম পাকিস্তানীদের মধ্যে নতুন দল পাকিস্তান পিপলস্‌ পার্টি একপ্রকার জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

বাংলাদেশে এক শ্রেণীর মানুষ দেখা যায় যারা কথায় কথায় ‘আইউব খানের আমলই ভালো ছিল’ এমনটা বলে থাকেন। তাদের এই কথায় যে প্রচ্ছন্ন ক্ষোভটা থাকে সেটা হচ্ছে, ‘বাঙালীরা খামাখা আন্দোলন করে এই ভালো শাসকটাকে সরিয়েছিল’। মনে চেপে না রেখে কেউ কেউ সেকথাটা বলেও ফেলেন। সত্যটা হচ্ছে এই যে, আইউবের দীর্ঘ দুঃশাসনে অতিষ্ঠ পাকিস্তানের উভয় অংশের জনসাধারণের ক্রমাগত আন্দোলনের চাপে সামরিক শাসক আইউব খান ১৯৬৯ সালের ২৫শে মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।

১৯৬৯ সালের ২৬শে মার্চ ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারী করেন। এর এক বছর পর, ১৯৭০ সালের ৩০শে মার্চ তিনি নির্বাচনের লক্ষ্যে ‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার ১৯৭০’ (এলএফও ১৯৭০) জারী করেন। এই আদেশের মাধ্যমে —

১. প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ৩১৩ আসনবিশিষ্ট এক কক্ষ জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া হয়, যার ১৩টি সংরক্ষিত নারী আসন।
২. জনসংখ্যার সংখ্যানুপাতে পাকিস্তানের পূর্ব অংশে ১৬৯টি ও পশ্চিম অংশে ১৪৪টি আসন বরাদ্দ করা হয়।
৩. নির্বাচিত পরিষদের প্রথম অধিবেশনের শুরু থেকে ১২০ দিনের মধ্যে পরিষদকে পাকিস্তানের নতুন সংবিধান প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা দেয়া হয় এবং সংবিধান অনুমোদনের ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট কর্তৃক সংরক্ষিত রাখার বিধান রাখা হয়।
৪. নির্বাচিত পরিষদের প্রথম অধিবেশনের শুরু থেকে ১২০ দিনের মধ্যে পরিষদ পাকিস্তানের নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে ব্যর্থ হলে বিদ্যমান পরিষদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন ঘোষণা করার বিধান করা হয়।
৫. রাজনৈতিক দলসমূহের প্রস্তাবিত বিধি ও সম্মতিসমূহ প্রেসিডেন্ট কর্তৃক প্রত্যায়িত হবার বিধান করা হয়।
৬. সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫-তে গঠিত পশ্চিম পাকিস্তানকে ভেঙে পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নামে চারটি প্রদেশ গঠন করা হয়।

এই আদেশের মাধ্যমে পাকিস্তানের ভবিষ্যত সংবিধানের ৫টি মূলনীতি ঘোষণা করা হয় —

১. পাকিস্তান রাষ্ট্র হবে ইসলামী আদর্শভিত্তিক এবং শুধুমাত্র একজন মুসলিম নাগরিক রাষ্ট্রের প্রধান হতে পারবেন।
২. প্রদেশসমূহের জনসংখ্যানুপাতের ভিত্তিতে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় পরিষদের অবাধ ও নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন হবে সার্বজনীন ও প্রাপ্তবয়স্ক ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে।
৩. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সকল নাগরিকের জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করা হবে।
৪. প্রদেশসমূহের জন্য সর্বোচ্চ স্বায়ত্ত্বশাসন নিশ্চিত করা হবে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ত্ব রক্ষার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর ন্যস্ত থাকবে, এবং এই লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কর্মসম্পাদনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা নিশ্চিত করা হবে।
৫. সকল আঞ্চলিক ও প্রাদেশিক বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে সকল নাগরিকের অংশগ্রহন নিশ্চিত করা হবে।

এলএফও ১৯৭০-এর এই বিবরণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, নির্বাচিত পরিষদ কোন কারণে ১২০ দিনের মধ্যে নতুন সংবিধান প্রণয়নে ব্যর্থ হলে বিদ্যমান পরিষদ ভেঙে নতুন সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। কতিপয় পাকিস্তানীর দাবীকৃত সামরিক আইন জারীর শঙ্কাটি তখনই সত্য হতো যদি এলএফও ১৯৭০-এ নতুন নির্বাচনের বিধি না থাকতো। তাছাড়া সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী খোদ প্রেসিডেন্ট যেখানে সামরিক বাহিনী থেকে আগত এবং যেখানে দেশে সামরিক শাসন বিদ্যমান, সেখানে নতুন করে সামরিক আইন জারীর শঙ্কার অজুহাত ভিত্তিহীন। পিপিপি কর্তৃক এই অজুহাতে পরিষদ অধিবেশনে যোগ না দেবার দোহাই একটি নির্জলা মিথ্যাচার।

১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বরে জাতীয় পরিষদের ৩০০টি আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসন লাভ করে। আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোট প্রাদেশিক হিসাবে ৭৪.৯% এবং জাতীয় হিসাবে ৩৯.২% ভোট। অন্য প্রদেশগুলোতে আওয়ামী লীগ ৮টি আসনে নির্বাচন করলেও কোন আসন পায়নি এবং প্রাপ্ত ভোটের হারও খুব কম — পাঞ্জাব – ০.০৭%, সিন্ধু – ০.০৭%, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ – ০.২% বেলুচিস্তান – ১%। পক্ষান্তরে পিপিপি পশ্চিমের চারটি প্রদেশের ১৩৮টি আসনের মধ্যে ১২০টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যার মধ্যে ১০৩টি ছিল পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে। পিপিপি পূর্ব পাকিস্তানের কোন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। পিপিপি জাতীয় হিসাবে ১৮.৬% ভোট পেয়ে ৮১টি আসন লাভ করে (পাঞ্জাব – ৬২/৮২, সিন্ধু – ১৮/২৭, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ – ১/২৫, বেলুচিস্তান – ০/৪)। অর্থাৎ জাতীয় পরিষদের আসন হিসাবে পিপিপি শুধুমাত্র পাঞ্জাব ও সিন্ধুর ভোটারদের সমর্থন পেয়েছিল, গোটা পশ্চিমের নয়।

১৯৭০ সালের ১৭ই ডিসেম্বরে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়লাভ করে। অন্য চারটি প্রদেশে আওয়ামী লীগ কোন আসন পায়নি। পিপিপি পূর্ব পাকিস্তান ও বেলুচিস্তানে কোন আসন পায়নি, তবে তারা পাঞ্জাবে ১১৩টি (মোট ১৮০টি আসন), সিন্ধুতে ২৮টি (মোট ৬০টি আসন) ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে ৩টি (মোট ৪০টি আসন) আসন লাভ করে। অর্থাৎ প্রাদেশিক পরিষদের আসন হিসাবে পাঞ্জাব ছাড়া আর কোন প্রদেশে পিপিপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। সুতরাং পাঞ্জাবের প্রাদেশিক পরিষদের চাবি ভুট্টোর এক পকেটে আর সিন্ধুর প্রাদেশিক পরিষদের চাবি তার আরেক পকেটে এমন কথিত দাবি সঠিক নয়।

নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হবার পর পিপিপি তথা জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কেন্দ্রীয় সরকার আওয়ামী লিগের হাতে তো যাচ্ছেই সেই সাথে পাঞ্জাব ছাড়া অন্য প্রদেশগুলোতে পিপিপি প্রাদেশিক সরকার গঠন করতে পারছে না। খোদ ভুট্টোর নিজের প্রদেশ সিন্ধুতে তারা ২৮টি আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ওপর নির্ভর করতে হবে। নির্বাচনের এই প্রকার ফলাফল ভুট্টো তো বটেই খোদ সামরিক সরকারেরও হিসাবের বাইরে ছিল। তাদের ধারণা ছিল আওয়ামী লীগ পশ্চিমের চারটি প্রদেশে কোন আসন পাবে না এবং পূর্ব পাকিস্তানে ন্যাপ, মুসলিম লীগ, পিডিপি, জামায়াতে ইসলামীর সাথে আসন ভাগাভাগি করার দরুন কেন্দ্রে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৫১টি আসন পাবে না। কিন্তু ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক বন্যা ও ১২ই নভেম্বরের ভয়াল সাইক্লোন এবং এই দুর্যোগগুলোতে কেন্দ্রীয় সরকারের ন্যক্কারজনক ভূমিকা পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচনের ফলাফল কীরূপ হবে তা মোটামুটি নির্ধারণ করে দেয়। একই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল ন্যাপ (ভাসানী) নির্বাচন বর্জন করলে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে বাকি দলগুলো মিলে মাত্র ২টি আসন (আসলে ১টি, অন্যটি পায় স্বতন্ত্র প্রার্থী) লাভ করবে এটি তাদের ধারণার বাইরে ছিল।

১লা জুলাই, ১৯৭০ থেকে ‘এলএফও ১৯৭০’ কার্যকর হবার পর থেকে ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ বলে কোন কিছু ছিল না। সুতরাং অস্তিত্ত্বহীন পশ্চিম পাকিস্তানে ভুট্টো বা পিপিপি’র সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবী অর্থহীন। তাছাড়া পশ্চিমের চারটি প্রদেশের মধ্যে পিপিপি শুধুমাত্র পাঞ্জাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল। সিন্ধুতে সবার মধ্যে বেশি ভোট/আসন পেলেও সেটা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানে তারা ছিল মোটামুটি অস্তিত্ত্বহীন। সুতরাং ভুট্টো বা পিপিপি’র পশ্চিমে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবী সবৈর্ব মিথ্যা।

কোন কারণে ১৯৭০ সালের অক্টোবরে প্রস্তাবিত নির্বাচনে সুবিধাজনক ফলাফল না হলে অথবা পূর্ব পাকিস্তানের নবনির্বাচিত সরকার সামরিক বাহিনীর বিপক্ষে গেলে অথবা নির্বাচনের ফলাফলে অসন্তুষ্ট হয়ে পূর্ব পাকিস্তানীরা আন্দোলন শুরু করলে তাদের দমানোর উদ্দেশ্যে পূর্ব পাকিস্তানে নভেম্বর, ১৯৭০ থেকে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন ব্লিৎজ’ চালানোর পরিকল্পনা করে রাখা হয়েছিল। এই ব্যাপারে পরে আরও আলোচনা করা হবে। বন্যা ও সাইক্লোনের কারণে নির্বাচন পিছিয়ে ডিসেম্বরে চলে গেলে এই পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে পিপিপি, বিশেষত জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকারের ভূমিকা লক্ষ করলে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় আসলে ইয়াহিয়া-ভুট্টো চক্রের লক্ষ্য ছিল নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের অনুগত একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সেটি না হওয়ায় তারা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে অনির্দিষ্ট কালের জন্য ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রয়াস পায়। এই বলপ্রয়োগ প্রক্রিয়ায় তারা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে এমন অবস্থা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল যাতে তাদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে পূর্ব পাকিস্তান যেন কোন প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায়।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের কিছুদিন পরে লাহোর প্রাদেশিক পরিষদ ভবনের বাইরে এক জনসমাবেশে জুলফিকার আলী ভুট্টো তার সমর্থকদের ধন্যবাদ ও শেখ মুজিবকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে সম্মান করি, কিন্তু পাঞ্জাব এবং সিন্ধু উভয়ে হচ্ছে ক্ষমতার কেন্দ্র। কেন্দ্র হয়তো আমরা সরকার গঠন করতে পারবো অথবা পারবো না, কিন্তু পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদের চাবি আমার এক পকেটে এবং আরেক পকেটে সিন্ধু প্রাদেশিক পরিষদের চাবি; সুতরাং আমাদের সহযোগিতা ছাড়া কেন্দ্রে কেউ সরকার চালাতে পারবে না। যদি পিপলস্‌ পার্টি সমর্থন না করে তাহলে কেন্দ্রে কোন সরকার কাজ করতে পারবে না, কোন সংবিধান রচিত হতে পারবে না। কেন্দ্রের আমাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। যখন আমি বলি আমাদের প্রাপ্য দিতে হবে তখন আমি এটাই বোঝাই”। এটি স্পষ্টতই ইয়াহিয়া খান ও শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি ভুট্টোর প্রকাশ্য হুমকি এবং সাধারণ নির্বাচনে জনসাধারণের রায়ের প্রতি স্পষ্ট অবজ্ঞা। এখান থেকে ধারণা করা যায় নিজের উদ্দেশ্য সাধনে ভুট্টো যা খুশি তাই করতে যাচ্ছিলেন। বাকি প্রয়োজন ছিল সামরিক বাহিনীর উদ্দেশ্যের সাথে তার নিজের উদ্দেশ্যের একটা মেলবন্ধন ঘটানো।

ভুট্টোর আমন্ত্রণে ১৯৭১ সালের ১৭ই জানুয়ারী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান লারকানায় যান। রাওয়ালপিন্ডি থেকে বিমানে ইয়াহিয়া সিন্ধুর ময়েঞ্জোদারো বিমানবন্দরে পৌঁছালে ভুট্টো তাকে স্বাগত জানান। সেখান থেকে তারা লারকানায় অবস্থিত ভুট্টো পরিবারের জমিদারী ‘আল মুর্তজা’ যান। নিকটস্থ দ্রিগ হ্রদে হাঁস শিকারের নামে দুই দিনের এই আয়োজনে ইয়াহিয়া খানের সাথে লেফটেন্যান্ট জেনারেল শরীফুদ্দিন পীরজাদা (প্রেসিডেন্টের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার) ও জেনারেল আবদুল হামিদ (কমান্ডার-ইন-চিফ, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক) ছিলেন। নির্বাচনের পর জাতীয় পরিষদ গঠিত হবার আগে একটি রাজনৈতিক দলের প্রধানের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে খোদ প্রেসিডেন্টর এমন আমন্ত্রণে যাওয়া অভিপ্রেত ছিল না। এখানে স্মর্তব্য যে, এর ৫ দিন আগে ১২ই জানুয়ারী, ১৯৭১-এ ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠকের সময় জেনারেল হামিদ উপস্থিত ছিলেন না। অনির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠকে ইয়াহিয়া কর্তৃক শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করার ব্যাপারে লারকানার বৈঠকে ভুট্টো নিজের অসন্তোষ ব্যক্ত করেন এবং বলেন, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন না বসা পর্যন্ত বলা যাবে না আসলে কে প্রধানমন্ত্রী। তিনি ইয়াহিয়াকে এই বলেও সতর্ক করেন যে, শেখ মুজিব তাকে যা কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকুন না কেন ক্ষমতায় গেলে শেখ মুজিব ইয়াহিয়াকে প্রেসিডেন্ট পদে না রাখতে পারেন অথবা রাখলেও তার অবস্থা বৃটিশ রাণীর মতো ক্ষমতাহীন, আলঙ্কারিক করে ফেলতে পারে। ভুট্টো দ্রুত আলোচনা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন, উপস্থিত জেনারেলরাও আলোচনায় সক্রিয় হয়ে ইয়াহিয়াকে চুপ করিয়ে দেন, এবং রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে তারা পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।

লারকানা বৈঠকে আসলে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে সেটা বৈঠকে উপস্থিত কেউ কখনো কোন সাংবাদিকদের কাছে অথবা নিজের বক্তব্যে অথবা নিজের লেখায় প্রকাশ করেননি তাই অনির্ভরযোগ্য সূত্রদের ভাষ্য কতটুকু সত্যি তা বোঝার উপায় নেই। তবে এই আলোচনার পর ভুট্টো এবং ইয়াহিয়া সরকারের আচরণে যে ব্যাপক পরিবর্তন আসে তা থেকে বোঝা যায় ঐ বৈঠকে তারা আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার এবং পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। এই বৈঠকের পর থেকে ভুট্টোর আচরণ আরও উগ্ররূপ ধারণ করে এবং ইয়াহিয়া সরকার পূর্ব পাকিস্তানে একটু একটু করে সৈন্য, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়ে ব্যাপক সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে থাকে।

পাকিস্তানের ক্ষমতাবলয় নিয়ে ঐতিহাসিক আলোচনায় পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী, পাঞ্জাবী জনগোষ্ঠী, সামরিক বাহিনীতে পাঞ্জাবীদের শতকরা হার, পাকিস্তানী আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিতে পাঞ্জাবীদের আধিপত্যকে বিবেচনায় না নিলে অনেক কিছুই স্পষ্ট হবে না। জুলফিকার আলী ভুট্টো এই সত্যটা জানতেন যে, পাঞ্জাবী সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী দেশের শাসনক্ষমতায় অপাঞ্জাবীদের, বিশেষত বাঙালীদের দেখতে ইচ্ছুক নয়। তিনি নিজে পাঞ্জাবী না হলেও পাঞ্জাবীদের মধ্যে ব্যাপক জনতুষ্টিমূলক প্রচারণা চালিয়ে একমাত্র পাঞ্জাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে নির্বাচন জেতেন। ফলে ঐটুকুকে পুঁজি করেই তিনি পাঞ্জাবীদের আকাঙ্খার অনুকূলে বাঙালীবিরোধী সংগ্রামে নামেন এবং নির্বাচনে জাতীয়ভাবে প্রদত্ত জনরায়কে উপেক্ষা ও কটাক্ষ করার ধৃষ্টতা দেখান। লারকানা ষড়যন্ত্রে সিন্ধী ভুট্টো পাঞ্জাবী জেনারেলদেরকে এমনটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে পিপিপি ক্ষমতায় আসা মানে পাঞ্জাবীদের ক্ষমতা টিকে থাকা। জেনারেলরা যে তার ধারণাটি সমর্থন করেছিলেন সেটা বোঝা যায় যখন যুদ্ধে হেরে ১৯৭১ সালের ২০শে ডিসেম্বরে ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। অসামরিক ব্যক্তি ভুট্টো একইসাথে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইনপ্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহন করলেও জেনারেলরা তা সমর্থন করেন।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুরু করে তার প্রতিরোধ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের শুরু থেকে ২৬শে মার্চের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য ঘটনাবহুল। এই সময় দ্রুত নানা ঘটনা ঘটতে থাকে।

২৬শে মার্চের পূর্বে ১৯৭১ সালের সংক্ষিপ্ত কালপঞ্জিঃ

০৩-জানুয়ারীঃ ঢাকার রেসকোর্সে এক জনসভায় আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের ৬-দফা ও ১১-দফা বাস্তবায়নের শপথ গ্রহন। বঙ্গবন্ধু জানান, ৬-দফা১১-দফার ভিত্তিতে প্রস্তাবিত সংবিধান রচিত হবে।

১১-জানুয়ারীঃ বঙ্গবন্ধু বলেন, আওয়ামী লীগ একাই কেন্দ্র ও পূর্ব পাকিস্তানে সরকার গঠনে সমর্থ; এবং কেবল ৬-দফার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণীত হলে জনতার দাবী প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

১২-জানুয়ারীঃ ঢাকায় ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক অনুষ্ঠিত। বৈঠকে বঙ্গবন্ধু ১৫ই ফেব্রুয়ারীর মধ্যে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দাবী করেন। পরে ভুট্টোর দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে ইয়াহিয়া জানান মার্চের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে।

১৭-জানুয়ারীঃ সিন্ধুর লারকানায় ভুট্টো পরিবারের জমিদারীতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল শরীফুদ্দিন পীরজাদা ও জেনারেল আবদুল হামিদের সাথে ভুট্টোর বৈঠক।

২৭-২৯-জানুয়ারীঃ পিপিপি’র একটি উচ্চপদস্থ দল নিয়ে ঢাকায় ভুট্টোর আগমন। বঙ্গবন্ধুর সাথে বৈঠকে ভুট্টো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, জাতীয় পরিষদে তিনি বিরোধী দলের নেতার আসনে বসতে আগ্রহী নন্‌। তিনি বঙ্গবন্ধুকে ৬-দফাতে পরিবর্তন আনতে বলেন এবং পশ্চিম জার্মানীর কুর্ট গিওর্গ কিসিঙ্গার (Kurt Georg Kiesinger – ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন) ও উইলি ব্রান্ডটের (Willy Brandt - সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট) মতো পাকিস্তানে একটা কোয়ালিশন সরকার গঠন করে পিপিপি’র সাথে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে বলেন। বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের নেতৃবৃব্দ এই প্রকার প্রস্তাব নাকচ করে দেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে জানান, পশ্চিমের জনগণ ৬-দফার বিরুদ্ধে। তাদের সাধারণ ধারণা হচ্ছে ৬-দফার ফলে পাকিস্তান ভেঙে যাবে। ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার ব্যাপারে ‘যৌক্তিক বিলম্ব’ করার জন্য চাপ দিতে থাকেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু ১৫ই ফেব্রুয়ারীতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের ব্যাপারে অনড় ছিলেন। ভুট্টোর ভয় ছিল, যদি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসে যায় তাহলে একজন পূর্ব পাকিস্তানী জাতীয় পরিষদের স্পীকার নির্বাচিত হয়ে যাবেন এবং ৬-দফার ভিত্তিতে সংবিধান রচিত হয়ে যাবে। সুতরাং ভুট্টো জাতীয় পরিষদের অনতিবিলম্ব অধিবেশন বয়কটের সিদ্ধান্ত নেন।

২-ফেব্রুয়ারীঃ লাহোরে ভুট্টো পিপিপি’র নেতৃবৃন্দের সাথে এক বৈঠকে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেন এবং তাদেরকে যে কোন মূল্যে ঢাকা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেন।

৪-ফেব্রুয়ারীঃ পেশওয়ারের এক জনসভায় ভুট্টো জানান যে, পিপিপি’র নির্বাচিত পরিষদ সদস্যগণ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকা যাচ্ছেন না। কারণ, তারা পরিষদে গেলে তাদেরকে হত্যা করা হতে পারে এবং পরিষদ একটি কসাইখানায় পরিণত হবে।

১১-ফেব্রুয়ারীঃ ভুট্টো ইয়াহিয়া খানের সাথে সাক্ষাত করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন কমপক্ষে ৬ সপ্তাহ পেছানোর অনুরোধ জানান।

১৩-ফেব্রুয়ারীঃ ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন, পাকিস্তানের নতুন সংবিধান রচনার লক্ষ্যে আগামী ৩রা মার্চ ঢাকাতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে। এই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ভুট্টো জানান, তার পার্টি অধিবেশনে যোগ দেবে না। যেখানে একটা পার্টি ইতিমধ্যে সংবিধানের রচনা করে বসে আছে সেখানে ঐ সংবিধানকে বৈধতা দেবার দিয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে আসার জন্য আমরা সেখানে যেতে পারি না।

১৭-ফেব্রুয়ারীঃ বঙ্গবন্ধু বলেন, বিশ্বের কোন শক্তিই আর বাঙালীদের দাসত্ব-শৃঙ্খলে আটকে রাখতে পারবে না। শহীদদের রক্ত আমরা বৃথা যেতে দেব না। (এই বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, তার আগেই বিচ্ছিন্নভাবে বাঙালী নিধণ শুরু হয়ে গেছে)

২৮-ফেব্রুয়ারীঃ লাহোরের ইকবাল পার্কের জনসভায় ভুট্টো জানান, কেউ যদি ঢাকাতে পরিষদ অধিবেশনে যোগ দিতে যাবার চেষ্টা করে তাহলে তিনি তার পা ভেঙে দেবেন।

০১-মার্চঃ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কর্তৃক জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু ৩রা মার্চ সারা দেশে হরতাল আহ্বান করেন। ভাইস অ্যাডমিরাল সৈয়দ মোহাম্মদ আহসানকে সরিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদে নিয়োগ প্রদান।

০২-মার্চঃ ৩রা মার্চ থেকে ৬ই মার্চ পর্যন্ত হরতাল এবং ৭ই মার্চ রেসকোর্সে গণজমায়েতের ঘোষণা। তেজগাঁ বিমানবন্দরে সামরিক বাহিনীর গুলিতে ২ জন নিহত। সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধি জারী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে আ স ম আবদুর রব কর্তৃক স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন।

০৩-মার্চঃ হরতাল পালিত। চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ওয়্যারলেস কলোনীতে সেনাবাহিনী ও উর্দ্দুভাষীদের (বিহারী) সম্মিলিত আক্রমণে দুইশতাধিক ব্যক্তি নিহত। সান্ধ্য আইন জারী। ইয়াহিয়া কর্তৃক ১০ই মার্চ জাতীয় পরিষদের নেতাদের বৈঠক আহ্বান, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রত্যাখ্যান। পল্টন ময়দানের সমাবেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ কর্তৃক স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ।

০৪-মার্চঃ চট্টগ্রামের হালিশহরে আর্মি ক্যাম্পের সামনে উর্দ্দুভাষীদের (বিহারী) হাতে কয়েকজন বাঙালী নিহত। দেশের বিভিন্ন স্থানে জনসাধারণের সাথে সেনাবাহিনীর সংঘর্ষে অজ্ঞাতসংখ্যক ব্যক্তি নিহত। আবারও সান্ধ্য আইন জারী। করাচীর নিশ্‌তার পার্কের জনসভায় ভুট্টো ঘোষণা করেন, তোমরা পূর্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ, আমরা পশ্চিমে সংখ্যাগরিষ্ঠ। সুতরাং দুই জায়গাতে পৃথকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

০৫-মার্চঃ ইয়াহিয়া-ভুট্টো আলোচনা অনুষ্ঠিত। ঢাকা ও টঙ্গীতে বিক্ষুদ্ধ জনতার ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণের ঘটনায় অজ্ঞাতসংখ্যক লোক নিহত।

০৬-মার্চঃ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কর্তৃক বেতার ভাষণে ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান। ভুট্টো কর্তৃক অধিবেশনে যোগদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিদ্রোহ, পুলিশের গুলিতে ৭ জন কয়েদী নিহত।

০৭-মার্চঃ ঢাকার রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঐতিহাসিক ‘৭ই মার্চের ভাষণ’ প্রদান। এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানী সেনাদের গুলিতে বাঙালীদের হত্যা, পাকিস্তানীদের ষড়যন্ত্র এবং বাঙালীদের ওপর মিথ্যা দোষারোপের ব্যাপারে স্পষ্ট ভাষায় বলেন —

জনাব ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার গরীবের উপরে, আমার বাংলার মানুষের উপরে গুলী করা হয়েছে, কি করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে। আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন। তিনি বললেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ১০ই তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স ডাকব। আমি বলেছি, কিসের বৈঠক বসবে, কার সঙ্গে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে তাদের সঙ্গে বসবো? হঠাৎ আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে পাঁচ ঘণ্টা গোপনে বৈঠক করে যে বক্তৃতা তিনি করেছেন, সমস্ত দোষ তিনি আমার উপরে দিয়েছেন, বাংলার মানুষের উপর দিয়েছেন। ভাইয়েরা আমার,২৫ তারিখে এসেম্বলী কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি ১০ তারিখে বলে দিয়েছি যে, ওই শহীদের রক্তের উপর পা দিয়ে কিছুতেই মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না”।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে সরিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদে নিয়োগ প্রদান। (টিক্কা খানের নিয়োগের সঠিক তারিখ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া গেছে, তবে সকল পক্ষ একটা বিষয় নিশ্চিত করেন যে, মার্চের শুরুর দিকেই টিক্কাকে নিয়োগ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছিল।)

০৮-মার্চঃ পূর্ব পাকিস্তানের সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে পাকিস্তানের বাকি অংশের লেনদেন বন্ধ।

০৯-মার্চঃ বিচারপতি বদরুদ্দীন আহমদ সিদ্দিকী কর্তৃক লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসাবে শপথ গ্রহন করাতে অস্বীকৃতি। অবাঙালী সামরিক অফিসারদের পরিবারবর্গকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিমে পাঠানো শুরু। পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার করে নেবার জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি মওলানা ভাসানীর আহ্বান।

১০-মার্চঃ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রতিক সংঘর্ষে শতাধিক ব্যক্তি নিহত হবার কথা পাকিস্তান সরকার কর্তৃক স্বীকার। পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করে তাদের সব বিমানে করে পশ্চিম থেকে সাদা পোশাকে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পূর্ব পাকিস্তানে প্রেরণ শুরু যা ১৩ই মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

১১-মার্চঃ সাড়ে সাত কোটি মানুষের মানবিক অধিকারকে সমর্থন দেবার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্টের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আহ্বান।

১২-মার্চঃ ঢাকায় তেহরিক-ই-ইশতেকলাল পার্টির প্রধান অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল আসগর খানের সাথে বঙ্গবন্ধুর বৈঠক।

১৩-মার্চঃ ইয়াহিয়া খান কর্তৃক লাহোরে সর্বদলীয় বৈঠক আহ্বান। বঙ্গবন্ধু জানান, বৈঠকটি ঢাকায় হলে তিনি তাতে যোগ দেবেন। কর্মস্থলে অনুপস্থিত সকল সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ১৫ই মার্চের মধ্যে কাজে যোগদানের নির্দেশ, অন্যথায় চাকুরিচ্যুতিসহ ১০ বছরের কারাদণ্ড প্রদানের বিধান জারী।

১৪-মার্চঃ সামরিক আইন অমান্য করে পূর্ব পাকিস্তানে মিছিল ও সমাবেশ আয়োজন এবং কর্মবিরতি পালন। দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ইয়াহিয়ার প্রতি ভুট্টোর আহ্বান।

১৫-মার্চঃ অসহযোগ চলাকালে পূর্ব পাকিস্তানে কাজকর্ম কীভাবে চলবে সেই ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ৩৫টি বিধি জারী। ইয়াহিয়া খানের ঢাকা আগমন এবং ২৩শে মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবার ঘোষণা। করাচীতে এক সংবাদ সম্মেলনে অচলাবস্থা নিরসনে ভুট্টো তার চূড়ান্ত প্রস্তাব ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, “আমরা দুই অর্থনীতিভিত্তিক সংবিধান দাবী করিনি যা কার্যত দুইটা দেশে পরিণত করবে। আমরা বলেছি, পাকিস্তানের সংবিধান রচনায় এতে সন্নিবিষ্ট বৈধ স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য পশ্চিমের কথা শুনতে হবে। আমরা বলিছি, উভয় অংশে জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। কেন্দ্রে উভয় অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্টিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে এবং প্রদেশগুলোতে সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্টির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। শুধুমাত্র এমন ব্যবস্থা পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে টিকিয়ে রাখতে পারবে”।

১৬-মার্চঃ ঢাকায় আড়াই ঘন্টাব্যাপী ইয়াহিয়া-মুজিব প্রথম বৈঠক। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের জানান, আলোচনা অব্যাহত থাকবে, আগামীকাল প্রেসিডেন্টের সাথে পুনরায় বৈঠক হবে। গণচীন থেকে আমদানীকৃত সমরাস্ত্রবাহী জাহাজের মাল খালাসে চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের অস্বীকৃতি। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের দাবী।

১৭-মার্চঃ ইয়াহিয়া-মুজিব দ্বিতীয় বৈঠক। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের জানান, আলোচনা এখানেই শেষ নয়, তবে পরবর্তী আলোচনার সময় এখনো ঠিক হয়নি। এই দিন ছিল বঙ্গবন্ধুর ৫১-তম জন্মদিন। এই উপলক্ষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার জন্মদিনই কি আর মৃত্যুদিনই কি, জনগণই আমার জন্য জন্ম-মৃত্যু। ২রা মার্চ থেকে ৯ই মার্চ পর্যন্ত বেসামরিক প্রশাসনকে সাহায্য করার জন্য কেন সেনাবাহিনী তলব করা হয়েছিল সেই ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য সামরিক কমিশন গঠন।

১৮-মার্চঃ সেনাবাহিনী তলব ও সেনাদের গুলিতে সাধারণ নাগরিক হতাহতের তদন্তের ব্যাপারে সামরিক শাসক টিক্কা খান কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি্কে বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাখ্যান। এই প্রকার তদন্ত কমিশনকে তিনি জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপকৌশল হিসাবে বর্ণনা করেন। প্রতিনিধি দলসহ ন্যাপ নেতা ওয়ালী খানের ঢাকা আগমন ও বঙ্গবন্ধুর সাথে বৈঠক। করাচীতে ভুট্টো জানান, আলোচনার জন্য তিনি ঢাকা গেলেও কোন কাজ হবে না।

১৯-মার্চঃ ইয়াহিয়া-মুজিব তৃতীয় বৈঠক। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের জানান, আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে। ঢাকা ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার থেকে আগত ব্রিগেডিয়ার জাহানযেব আরবাব কর্তৃক জয়দেবপুরে ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ব্যাটালিয়নকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা ব্যাটালিয়নের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর কে এম শফিউল্লাহ্‌র নেতৃত্বে বাঙালী সৈনিকদের দ্বারা নস্যাত।

২০-মার্চঃ ইয়াহিয়া-মুজিব চতুর্থ বৈঠক। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের জানান, আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। আগামীকাল পুনরায় প্রেসিডেন্টের সাথে আলোচনায় বসবো। তিনি আরও জানান, আলোচনা অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে না।

২১-মার্চঃ ইয়াহিয়ার সাথে বৈঠকের উদ্দেশ্যে ভুট্টোর ঢাকা আগমন।

২২-মার্চঃ ইয়াহিয়া কর্তৃক ২৫শে আহুত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা।

২৩-মার্চঃ পাকিস্তান দিবস। পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন। সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সৈয়দপুরে উর্দ্দুভাষীদের (বিহারী) দ্বারা স্থানীয় বাঙালীদের ওপর হামলা চালিয়ে অজ্ঞাতসংখ্যক বাঙালীকে হত্যা।

২৪-মার্চঃ চট্টগ্রাম বন্দরের ১৭ নং জেটিতে অবস্থানরত যুদ্ধাস্ত্র বোঝাই জাহাজ এমভি সোয়াত থেকে অস্ত্র খালাস করতে বাঙালীদের প্রতিরোধ। পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক প্রতিরোধকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ, শতাধিক বাঙালী নিহত। চট্টগ্রামে সান্ধ্য আইন জারী করে সেনাবাহিনী কর্তৃক সাধারণ নাগরিকদের ওপর হামলা ও অগ্নিসংযোগ। ঢাকায় ইয়াহিয়া-মুজিব ও ইয়াহিয়া-ভুট্টো পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত।

২৫-মার্চঃ গোপনে ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগ। ঢাকাসহ সারা দেশে পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক বাঙালী নিধণ কর্মসূচী শুরু। বাঙালী সাধারণ নাগরিক, পুলিশ, ইপিআর ও সামরিক বাহিনী কর্তৃক প্রতিরোধ শুরু।

২৬-মার্চঃ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা। পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার ও পাকিস্তানে প্রেরণ। বাংলাদেশ স্বাধীন করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু। ভুট্টোর ঢাকা ত্যাগ, এবং পাকিস্তানে পৌঁছে ঘোষণা, “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে”।

(মার্চ ২৫, ১৯৭১ ব্যতীত উপরে উল্লেখিত বাকি যেসব দিনে ‘অজ্ঞাতসংখ্যক লোক নিহত’ হবার কথা বলা হয়েছে তার প্রত্যেকটিতে নিহতের সংখ্যা বিভিন্ন সূত্রে ‘কয়েক শত’ বলে দাবী করা হলেও তথ্য যাচাই করতে না পারায় সঠিক সংখ্যা উল্লেখ করা যায়নি। তবে মার্চের শুরু থেকে যত দিন গেছে এই প্রকার ঘটনাগুলোতে নিহতের সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে।)

১৯৪৭ সালে স্বাধীন হলে পাকিস্তান ব্রিটিশ ভারত থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ৬টি পদাতিক ডিভিশন ও ১টি আর্মার্ড ব্রিগেড লাভ করে। ১৯৪৮ সালে সেখান থেকে ১টি পদাতিক ব্রিগেডকে (২টি ব্যাটালিয়ন) তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার আইউব খানের নেতৃত্বে পূর্ববঙ্গে নিয়োগ করা হয়। অবশিষ্ট সকল সামরিক শক্তি পশ্চিমে নিয়োগ করা হয়। পূর্ববঙ্গে বিমান ও নৌ বাহিনীর উপস্থিতি ছিল নগণ্য। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী ও সামরিক আয়োজন উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। যুদ্ধ পরবর্তীকালে ১৯৬৭ সালে ভারতীয় আক্রমণ ঠেকানোর কৌশল হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানে ‘অপারেশন এক্স-সুন্দরবন-১’ আয়োজন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের জানুয়ারীতে ‘অপারেশন তীতু মীর’ আয়োজন করা হয়। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে পরিকল্পিত ‘অপারেশন ব্লিৎজ’ যে একই ধারাবাহিকতায় নয় সেটা ধারণা করা যায় প্রথমত এর নামকরণ থেকে; দ্বিতীয়ত, নির্বাচন পেছানোর সাথে সাথে অপারেশন স্থগিত করা থেকে। পরবর্তীতে এই অপারেশনের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সেটা স্পষ্ট জানা যায় না। কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে ইয়াহিয়া খানের তিন মাসের অধিক সময় ধরে নানা টালবাহানা, ১৯৭১-এর শুরু থেকে পূর্ব পাকিস্তানে একটু একটু করে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ করা, জাহাজভর্তি করে যুদ্ধাস্ত্র আনয়ণ, স্থানীয় উর্দ্দুভাষীদের (বিহারী) মধ্যে অস্ত্র বিতরণ, দেশের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় উর্দ্দুভাষীদের (বিহারী) দিয়ে বাঙালীদের ওপর আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞ চালানো ইত্যাদি থেকে ধারণা করা যায় ‘অপারেশন ব্লিৎজ’ চলে থাকুক আর নাই থাকুক, ভিন্ন কোন নামে বা বেনামে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালনা করে স্বাধীনতাকামীদের নির্মূল করা, উর্দ্দুভাষীদের (বিহারী) অস্ত্রে সজ্জিত করে বাঙালীদের নিধণ, দেশে অরাজক ও দাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সামরিক শাসন অনির্দিষ্টকাল দীর্ঘায়িত করার কাজটি সুচারুভাবে চলছিল। যার তীব্র প্রকাশ দেখা যায় মার্চের শুরু থেকে দেশব্যাপী নানা ঘটনায় সেনাবাহিনী ও উর্দ্দুভাষীদের (বিহারী) দ্বারা ব্যাপক হারে সাধারণ বাঙালীদের হত্যা। এর চূড়ান্ত প্রকাশ হচ্ছে ২৫শে মার্চের ‘অপারেশন সার্চলাইট’।

এই বিষয়টি পরিষ্কার যে, পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানোর জন্য অনেক আগে থেকে পরিকল্পনা করে রেখেছিল এবং সেই মোতাবেক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ১৯৭১-এর শুরু থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করছিল। ‘লারকানা কাণ্ড’ থেকে পিপিপি এই ষড়যন্ত্রের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয় এবং সামরিক অভিযান চালানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য নানা অযৌক্তিক দাবীদাওয়া নিয়ে হাজির হয়, উস্কানী দিতে থাকে। আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী প্রচারণায় প্রকাশ্যে এবং খুব স্পষ্টভাবে ৬-দফার কথা সাধারণ্যে প্রচার করেছিল। গোটা পাকিস্তান তো বটেই, বাইরের দুনিয়াও একথা জানতো যে, মুজিব ৬-দফার জন্য লড়ছেন এবং তাঁর দল নির্বাচিত হলে তিনি এটা বাস্তবায়ন করবেন। ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার যদি ৬-দফার দাবীকে পাকিস্তানের অস্তিত্ত্বের জন্য ক্ষতিকর মনে করতো তাহলে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশই নিতে পারতো না। সুতরাং ৬-দফার মাধ্যমে দেশ ভাঙার চেষ্টার দোহাই দিয়ে ইয়াহিয়া সরকারের সামরিক অভিযান চালানোর কোন নৈতিক ভিত্তি নাই। আসলে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর আওয়ামী লীগ তথা পূর্ব পাকিস্তানীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কোন ইচ্ছা ছিল না। তারা জানতো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে পশ্চিম কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ যেমন সম্ভব হবে না তেমন জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ এমন একটা পাকিস্তানী বাহিনীর পেছনে ব্যয় করা হবে না যেখানে বাঙালীদের সংখ্যা নগণ্য এবং যারা যুদ্ধকালে পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষায় আগ্রহী না।

আরেকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। পূর্ববঙ্গে ১৯৫৪ সালে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করা হলেও পশ্চিমে তা করা হয়নি। বস্তুত পাকিস্তানে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা আজো বিদ্যমান, যেখানে মাত্র ৫% জমিদার দেশের মোট আবাদযোগ্য ভূমির ৬৪%-এর মালিক। পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাবসম্পন্ন ভুট্টো পরিবার, জারদারী পরিবার, গিলানী পরিবার, কোরেশী পরিবারদের মতো দুইশতাধিক পরিবার বিশাল বিশাল জমিদারীর অধিকারী। সেখানকার প্রাদেশিক ও স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতি জমিদারদের নিয়ন্ত্রণে। এমনকি সামরিকবাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসারদের বড় অংশ জমিদার পরিবার থেকে আসা। তাদের পক্ষে সামন্ততন্ত্রের ঘোরতর বিরোধী, গণতন্ত্রকামী আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে দেশের ক্ষমতা তুলে দেবার কোন ইচ্ছা ছিল না। সমাজতন্ত্রের ভুয়া দাবিদার ভুট্টো, যে নিজেই বিশাল জমিদারীর অধিকারী, এবং সামন্তদের স্বার্থ রক্ষাকারী পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন এইসব রাজা-গজা-জমিদারদের পক্ষ অবলম্বন করবেন এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে প্রয়োজনে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবেন সেটা স্বাভাবিক — এবং তারা তাই করেছিলেন।

১৯৭০-এর নির্বাচন পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ করলে এটা বোঝা যায় যে, নির্বাচনে যদি পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর আশানুরূপ ফলাফল না আসে তাহলে কী করতে হবে সে সম্পর্কে তাদের এক প্রকার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধ্বস বিজয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি সামাল দিতে তাদের পরিকল্পনা যথেষ্ট ছিল না। একারণে তারা ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিকল্পনা করে। সেই পরিকল্পনার প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় সময় বের করতে এবং বাঙালীদেরকে ক্ষমতাবলয়ের বাইরে রাখতে তারা ভুট্টোর সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তদানুসারে ভুট্টো নানা প্রকার রাজনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি করতে থাকেন, ইয়াহিয়া খান জাতীয় সংসদের অধিবেশন পেছাতে থাকেন এবং তারা উভয়ে নানা প্রকার বৈঠকের নামে কালক্ষেপন করতে থাকেন। এই ফাঁকে ব্যাপক মাত্রায় সামরিক অভিযান চালানোর উদ্দেশ্যে পশ্চিম থেকে সৈন্য, অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, যুদ্ধযান আনা অব্যাহত থাকে। বংলাদেশে ১৯৭১ সালের শুরু থেকে বিচ্ছিন্নভাবে হত্যা ও অরাজকতা চালানো এবং ২৫শে মার্চ রাত থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে নৃশংস সামরিক অভিযান চালানো, গণহত্যা ও অন্যান্য যুদ্ধাপরাধ করার দায় সম্পূর্ণরূপে পাকিস্তান সরকার, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীসমূহ ও তাদের সহযোগীদের, পাকিস্তান সরকারের সাথে যুক্ত হওয়া বা সমর্থন দেয়া ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক দলসমূহের। এই সত্যকে অস্বীকার করে অন্য কোন ব্যক্তি বা দল বা সংস্থার ওপর এককভাবে যুদ্ধের দায় চাপানো ইতিহাসকে অস্বীকার করা, সত্যকে অস্বীকার করা।

১৯৭১ নিয়ে ইতিহাস বা সত্যকে অস্বীকার করার পাকিস্তানী প্রবণতা নতুন কিছু নয়। গোটা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তারা নিজ দেশে এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ক্রমাগত মিথ্যাচার করে গেছেন। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম উভয় রণাঙ্গনেই আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। অথচ ঐদিন সন্ধ্যায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বলেন, “যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে”। এই প্রকার ঘোষণা শুধু মিথ্যা আস্ফালন নয় সারা পৃথিবীর সামনে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের মিথ্যাচারও বটে।

১৯৭১ সালের ২০শে ডিসেম্বর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহনের এক দিন পরে এক সংবাদ সম্মেলনে ভুট্টো বলেন, আমার প্রথম কাজ হচ্ছে একটি নতুন সরকার গঠনের ব্যাপারে পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের সাথে চুক্তিতে আসা। তিনি ভারতীয় সামরিক বাহিনী কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের অধিগ্রহনের সমালোচনা করেন এবং বলেন, ভারতের সাথে পাকিস্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা উচিত, তবে তা সমতার ভিত্তিতে যাতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতীয় বাহিনীর প্রত্যাহার অন্তর্ভুক্ত। আমাদেরকে ১৯৪৭ সালের অবস্থায় ফেরত যেতে হবে এবং কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করতে হবে। দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্টের মতো বেসামরিক প্রেসিডেন্টও যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করা, আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ করা, স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতা ইত্যাদি স্বীকার না করে মিথ্যা আস্ফালন ও পরিস্থিতি সম্পর্কে মিথ্যাচার করে গেছেন।

নিজেদের পরাজয়, অপরাধ ও নীচতা স্বীকার করার সাহস ও মানসিকতা সবার থাকে না, তাই বাংলাদেশ প্রসঙ্গে পাকিস্তানী মিথ্যাচার সম্ভবত কখনো বন্ধ হবে না।

তথ্যসূত্রঃ

পুস্তকঃ

1. Bhutto, Zulfikar Ali; The Great Tragedy; Pakistan People’s Party; 1971
2. Ganguly, Sumit; Conflict Unending: India-Pakistan Relations since 1947; Oxford University Press; 2002
3. Hasan, Mubashir; The Mirage of Power: An Enquiry into the Bhutto Years – 1971-1977; Oxford University Press; 2000
4. Khan, Mohammad Asghar; Generals in politics: Pakistan 1958-1982; Vikas; 1983
5. O'Leary, Brendan; Lustick, Ian; Callaghy, Thomas; Right-sizing the State: The Politics of Moving Borders; Oxford University Press; 2001
6. Sengupta, Nitish K. Land of Two Rivers: A History of Bengal from the Mahabharata to Mujib; Penguin Books India; 2011
7. Shekhar, Ravi; Singh, Narain; The Military Factor in Pakistan; Lancer Publishers; 2008
8. Sisson, Richard; Rose, Leo E. War and Secession: Pakistan, India, and the Creation of Bangladesh; University of California Press; Aug 13, 1991
9. Talbot, Ian; Pakistan: A Modern History; Palgrave Macmillan; January 15, 2010
10. Wolpert, Stanley, Roots of Confrontation in South Asia, Oxford University Press, 1982
11. Wolpert, Stanley; Zulfi Bhutto of Pakistan: His Life and Times; Oxford University Press; July 1, 1993
12. Zubair, Abu Bin Mohammed; The Silent and the Lost; Pacific Breeze Publishers LLC; June 27, 2011

অভিসন্দর্ভঃ

1. Zahoor, Muhammad Abrar; Zulfikar Ali Bhutto: Political Behaviour and Ouster from Power; Journal of the Punjab University Historical Society; Volume No. 30, Issue No. 2, July – December, 2017
2. Kokab, Rizwan Ullah; Abid, Masarrat; A Factor in East Pakistan’s Separation: Political Parties or Leadership; Journal of Pakistan Vision, University of the Punjab; Volume No. 14, Issue No. 1
3. Kokab, Rizwan Ullah; Hussain, Mahboob; Pakistani Leaders’ Response to the Challenge of Power Politics by Bengali Separatism; Journal of Political Studies; Volume No. 21, Issue No. 2; 2014

নিবন্ধঃ

1. Ahmer, Dr Moonis; History: Bhutto, Mujib and the Generals; The Dawn; March 04, 2018
2. Browne, Malcolm W. Pakistan Swears Bhutto as Chief, Replacing Yahya; The New York Times; December 21, 1971
3. Lee, Peter; Bangladesh: How the East Was Lost; The Unz Review; October 3, 2016
4. Zaidi, S. Akbar; Elections and Massacre; The Dawn; December 16, 2017

পাঠকের প্রতি আবেদনঃ মুক্তিকামী বাঙালীর জনজোয়ারকে রুখতে পাকিস্তান সরকার যে ব্যাপক ও নৃশংস পরিকল্পনা করেছিল তার অতি সামান্যই আমার পক্ষে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। এই ব্যাপারে কারো কোন তথ্য জানা থাকলে, বা ভিন্ন কোন পর্যবেক্ষণ থাকলে মন্তব্যে তা জানানোর জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি। আমার প্রদত্ত বর্ণনায় কোন তথ্য বিভ্রান্তি থাকলে সেটাও জানানোর জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। আপনাদের সহযোগিতা পেলে বিষয়টি নিয়ে যথাসম্ভব পূর্ণাঙ্গ রচনা সম্ভব হবে।


Comments

নৈষাদ's picture

দুর্দান্ত একটা ক্রমপঞ্জি লিখেছেন। দুইবার পড়লাম… আবারও পড়তে হবে।

আলোচনায় উপর দিকে আপনি ‘এলএফও ১৯৭০’ এর রেফারেন্স দিয়েছেন। নীচে এ ব্যাপারে বিস্তারিত দিয়েছেন। অনেকে উপরের এলএফও ১৯৭০ এ এর রেফারেন্সে এসে একটু চিন্তায় পরতে পারে – ব্যাপারটা কি এই ভেবে। ব্র্যাকেটে যদি বলে দেন নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, পাঠকের সুবিধা হয়। এলএফও ১৯৭০ ব্যাপারটা বুঝা গুরুত্বপূর্ন।

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

বইপত্রে জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারীর ঘটনাবলী পাওয়া যায় খুব কম। ইত্তেফাক আর ডন-এর ঐসময়কার কপি পাওয়া গেলে আরও অনেক চাপা পড়া সত্য বের করা সম্ভব হতো। সব কিছু যে একটা পরিকল্পিত গন্তব্যের দিকে ঠেলা হচ্ছিল সেটা তাহলে আরও স্পষ্ট হতো।

ঠিক জায়গায় ধরেছেন। এলএফও ১৯৭০ নিয়ে উপরে ইঙ্গিত দিয়ে রাখলাম। ধন্যবাদ।

লেখাটা ১৬ই ডিসেম্বর-এ পোস্ট করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু রেফারেন্সের গন্ধমাদন ঠেলতে ঠেলতে আর সময়ে কুলিয়ে উঠতে পারিনি। আজকাল পাকিস্তানী নেতারা যথা, নওয়াজ শরীফ, পারভেজ মুশার্‌রফ, ইমরান খান নিয়াজী প্রমুখ এই প্রসঙ্গে নানা গল্পগুজব শুরু করেছেন। কখনো সুযোগ হলে সেসব গল্পের ব্যবচ্ছেদ করে ভিন্ন পোস্ট দেবো।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

Emran 's picture

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ইমরান খান যখনই বাংলাদেশে আসতেন, তখনই "১৯৭১-এর কর্মকাণ্ডের জন্য পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়া উচিত"-ধরনের বক্তব্য দিতেন। তার এসব বক্তব্য কেবল বাংলাদেশের মিডিয়াতেই প্রকাশিত হত; পাকিস্তানী মিডিয়াতে এগুলির কোন হদিস পাওয়া যায় না! আরও লক্ষণীয় যে পাকিস্তানের সুশীল সমাজের অনুরূপ বক্তব্য উর্দু মিডিয়ার চেয়ে ইংরেজি মিডিয়াতে বেশী প্রচার পায়!

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

ইমরান খান নিয়াজী উজিরে আযম বনে যাওয়ায় তার কথাবার্তার গুরুত্ব বেড়েছে। সুতরাং তার কথাবার্তা নিয়ে আগে যৎসামান্য বলে থাকলেও সামনে আরও গুরুত্বসহকারে লিখতে হবে।

পাকিস্তানের ইংলিশ মিডিয়াতে প্রকাশিত/প্রচারিত এই প্রকার বক্তব্যের নিচে পাকিস্তানী আমজনতার মন্তব্যগুলো পড়ুন। তাহলে বুঝে যাবেন ইংলিশ জানা পাকিস্তানীরাও এই ব্যাপারে কী মনোভাব পোষণ করেন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু's picture

গুরু গুরু

পোস্টের উপযোগী মন্তব‍্য করার জন‍্যে সময় চেয়ে নিলাম।

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

তথাস্তু! প্রয়োজনীয় সময় নিয়ে আলোচনা করুন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

এক লহমা's picture

গুরু গুরু

দামী কাজ হয়েছে। এই রকমের কালানুক্রমিক পঞ্জী ষড়যন্ত্রের মুখোশ খুলতে জরুরী দলিল-এর কাজ করে।

আচ্ছা, লেখার শেষে ৬-দফা ও ১১-দফার প্রস্তাবগুলো উল্লেখ করে দেওয়া যায় (ঠ্যাং-নোট হিসেবে)?

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

৬-দফা ও ১১-দফার লিঙ্ক যথাস্থানে জুড়ে দেয়া হলো। সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

এক লহমা's picture

আপনারে অসংখ্য -ধইন্যাপাতা-

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

মন মাঝি's picture

আপনার লেখাটা পড়তে গিয়ে সেই সময়ে (৭১-এ) বাঙালীদের সম্পর্কে পশ্চিমাংশের সাধারণ পাকিস্তানিদের মনোভাবের কিছু ব্যক্তিগত শৈশবস্মৃতি মনে পড়ে গেল। ৭১-৭২-এ আমার পাকিস্তানের দুই অংশেই থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছে। ৭০-এর নির্বাচনের পর থেকেই সম্ভবত পশ্চিম পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে "গাদ্দার" ডাকা শুরু করে। আমাদের করাচির বাসায় থাকাকালীণ সময়ে একবার আমাদের বাঙালী গৃহকর্মীকে পাড়ার কিছু স্থানীয় লোকজন সদলবলে প্রায় ধরে-বেঁধে (হয়তো কিছু উত্তম-মধ্যম সহকারেও) আমাদের বাসায় নিয়ে আসে আমার আব্বার কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে। সে নাকি "গাদ্দার" বঙ্গবন্ধুর ছবি নিজের ঘরে টাঙিয়ে রেখেছিল (নাকি বাইরে কোথাও লাগাতে গিয়েছিল - মনে নেই)। সে এক অতি ভয়ানক অপরাধ তখন!!!

****************************************

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

মন মাঝি, দয়া করে অবরুদ্ধ জীবন নিয়ে আপনার ফার্স্টহ্যান্ড অভিজ্ঞতা লিখে ফেলুন। আপনার বয়োজ্যেষ্ঠ যারা এখনো সজ্ঞানে আছেন তাঁদের কাছ থেকে শুনে আরও তথ্য যোগ করুন। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকা সত্যগুলো জানা, ইতিহাসের চাপা পড়া সত্যগুলো জানা, ইতিহাসের বাঁক সম্পর্কে নতুন অভিজ্ঞান লাভের জন্য এইসব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা খুবই প্রয়োজনীয়। সময় যত পার হয়ে যাবে তত বেশি তথ্য হারিয়ে যাবে। প্লিজ, একটু উদ্যোগ নিন।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মন মাঝি's picture

উদ্যোগ তো একবার নিয়েছিলাম। নিজের স্মৃতিতে মালমশলা খুব কম বলে বয়োজ্যেষ্ঠদের ইন্টারভিউ করতে চেয়েছিলাম। এখানে দেখুন। ঐ লেখা পড়ে বেশ কয়েকজন সহৃদয় পাঠক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আমার ইমেলে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেছিলেন। দু'য়েকজন একাধিক লেখা স্ক্যান করে পর্যন্ত পাঠিয়েছিলেন। আনফর্চুনেটলি হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ায় (যা এখনো কমবেশি চলছে) তখন বিষয়টা এ্যাটেন্ড করতে পারিনি, পরে করবো বলে রেখে দিয়েছিলা্ম। পরে যখন করতে গেলাম তখন দেখি ঐ ইমেইল একাউন্টের পাসওয়ার্ড হারিয়ে ফেলেছি। একাউন্টটা কিছুতেই আর উদ্ধার করতে পারিনি। বেশ ভাল কিছু রিসোর্স ছিল ওখানে। এর বাইরে আমার রিসোর্স খুব কম। আব্বা-আম্মা নেই, বড়ভাই নিরুদ্দেশ। তবে আমার এক বাল্যবন্ধু আছে যারা ঐ সময়ই পাকিস্তানে ছিল এবং বর্ডার ক্রস করে আমাদের মতই প্রায় একই সময় (সম্ভবত মধ্য-৭২-এ, নিশ্চিত না) পালিয়ে এসেছে। আমরা এসেছি কোয়েটা-কান্দাহার রুটে, ওরা খাইবার পাস দিয়ে বোধহয়। এই বন্ধুর মা কথা বলতে রাজি হয়েছেন। এনার সূত্রে হয়তো আরও কয়েকজনের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। এখন বাকিটা আমার শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করছে।

****************************************

মন মাঝি's picture

তাছাড়া লেখাটা তো শুরু করেছিলামই এখানে। আপনি পড়েছেনও। এর পরের পর্বেই পাকিস্তানে যাওয়ার প্ল্যান ছিল। কবে হবে জানি না! হাসি

****************************************

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

যা হয়ে গেছে তা তো আর ফেরানো যাবে না, এখন যা কিছু আছে সেটা ভরসা করে কাজ শুরু করুন। মালমশলা এবং লেখার ড্রাফট একাধিক জায়গায় রাখুন তাহলে অনাকাঙ্খিত বিপর্যয় সামলানো যাবে।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

আব্দুল্লাহ এ.এম.'s picture

দেশে অনেকের কাছে অনেকবার নসিহত শুনেছি- একাত্তরের গণহত্যার দায় পাকিস্তানী মিলিটারি জান্তা আর ভুট্টো গংদের, সাধারন পাকিস্তানীদের এতে কোন দোষ নাই। সেইসব নসিহত প্রদানকারীদের জন্য এ লেখাটিকে একটি শক্তশালি চপোটাঘাত হিসেবেই দেখছি। অনেক যত্নপ্রসুত এই লেখাটি সচেতন সবারই সংগ্রহে রাখা একান্তভাবে উচিৎ বলে মনে করি। আর ষষ্ঠপাণ্ডবকে জানাই অশেষ ধন্যবাদ!

প্রসঙ্গক্রমে সে সময়ের কিছু স্মৃতিচারন আর তথ্য বিনিময় করি-
একাত্তরে আমি ক্লাস সিক্সের ছাত্র। মার্চের ২৪ তারিখে অতি প্রত্যুষে আমরা ঈশ্বরদীগামী ট্রেন ধরার জন্য ষ্টেশনে এসে হাজির হয়েছিলাম, উদ্দেশ্য- ঈশ্বরদী জংশন থেকে রকেট মেল ধরে পার্বতীপুর এবং সেখান থেকে ট্রেন বদল করে বাবার কর্মস্থল কুড়িগ্রামের দিকে যাব। বাবা আমাদের জন্য কুড়িগ্রামে উদ্বিগ্নচিত্তে অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন কিন্তু আমাদের আর সেদিন ঈশ্বরদী যাওয়া হল না। ষ্টেশনে নানা জনের কথায় জানা গেল গত দিনে পার্বতীপুরে বাঙ্গালী বিহারী ব্যাপক দাঙ্গা হয়েছে, পরিস্থিতি খুবই খারাপ, সুতরাং ওদিকে না যাওয়াই ভাল হবে। অল্প বয়সের সেই স্মৃতি হয়ত সহজেই হারিয়ে যেত, কিন্তু তা হয় নি স্বাধীনতা পরবর্তী বছরগুলোতে সেই পার্বতীপুর ম্যাসাকার সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার কারনে। ২৩ তারিখে প্রচুর বিহারী অধ্যুষিত পার্বতীপুরে এক ভয়াবহ বাঙ্গালি-বিহারী দাঙ্গা সংঘটিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৪ ও ২৫ তারিখে পার্বতীপুরে আগত ট্রেনগুলো আউটার সিগন্যালে থামিয়ে ট্রেনের যাত্রীদের গুলি করে, জবাই করে, কয়লার ইঞ্জিনের বয়লারে পুড়িয়ে, ইত্যাদি নানা নৃশংস উপায়ে হত্যা করা হয় এবং আনুষঙ্গিক নানা প্রকার নিগ্রহ করা হয়। যদি দৈবক্রমে আমরা সেদিনের যাত্রা স্থগিত না করতাম, তাহলে আমার মা তাঁর তিন শিশু সন্তানকে নিয়ে কী ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি হতেন, সে কথা ভেবে আমি এখনও শিউড়ে উঠি।

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

আবদুল্লাহ্‌ ভাই, উপরে মন মাঝিকে যে অনুরোধ করেছি আপনাকেও একই অনুরোধ করছি। প্লিজ বস্‌, একটু উদ্যোগ নিয়ে ঘটনাগুলো লিখে ফেলুন। বিশেষত, মুক্তিযুদ্ধপূর্বকালের যে গণহত্যার কথা বললেন সেগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চালানো অপপ্রচার মোকাবেলা করতে এই ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ রাখা জরুরী।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নৈষাদ's picture

নতুন কোন তথ্য পেলে সংযোজন চলুক – রেফারেন্স হিসাবে লিখাটা কাজ দিবে। এই সময়ের ঘটনাক্রম একসাথে পাওয়া যায়না।

পরে যখন বই আকারে প্রকাশের চিন্তা করবেন, ‘মিথ্যাচারের’ ঘটনা হয়ত একটা চ্যাপ্টার হিসাবে আসবে।

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

বই প্রকাশের চিন্তা এখনো করছি না। তবে এই প্রকার বিষয়গুলো আলোচনায় থাকা এবং কোথাও না কোথাও লিপিবদ্ধ থাকাটা দরকার। তাহলে কেউ খুঁজলে যেন পায়।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

আয়নামতি's picture

গুরু গুরু

সন্ধ্যা থেকে বার কয়েক বিরতি নিয়ে পুরো লেখাটা পড়েছি। এরকম একটা দালিলিক লেখার দরকার ছিল। অসংখ্য ধন্যবাদ পাণ্ডবদা! আপনার শ্রমসাধ্য লেখাটা খুবই কাজের জিনিস হয়েছে। এটাকে আপাতত ই-বুক হিসেবে সচলে রাখা যায় কিনা ভেবে দেখবেন। আশা করি, আপনার লেখা-অনুরোধে আরো অনেকেই একাজে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত হবেন।

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

এই লেখার কনটেন্ট একটা ইবুক হবার জন্য যথেষ্ট নয়। পাঠকদের আলোচনা যথেষ্ট পরিমানে হলে সেসবসহ ভেবে দেখা যেতো।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

মুস্তাফিজ's picture

Quote:
লাহোরের ইকবাল পার্কের জনসভায় ভুট্টো জানান, কেউ যদি ঢাকাতে পরিষদ অধিবেশনে যোগ দিতে যাবার চেষ্টা করে তাহলে তিনি তার পা ভেঙে দেবেন।

“tangain tore doon ga”

এটা পড়ে দেখেন, ইন্টারেস্টিং https://www.dawn.com/news/1359141

...........................
Every Picture Tells a Story

Emran 's picture

Quote:
A pretty large number of non-Bengalis, mainly Biharis, were also killed by those who were part of the Mukti Bahini fighting their war of independence,

জাইদী সাহেব এত কথা বললেন, কিন্তু বাঙালী নিধনে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর সহযোগী হিসেবে বিহারীদের ভূমিকার কথা চেপে গেলেন! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পরে মধ্য এবং পূর্ব ইউরোপের এথনিক জার্মানদের যে ওষুধটা দেয়া হয়েছিল, বিহারীদের সৌভাগ্য যে স্বাধীন বাংলাদেশে সেই ওষুধটা তাদেরকে দেয়া হয়নি, যে কোন কারণেই হোক!

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

সব জাইদী সাহেবদের ভূমিকা কম-বেশি একই প্রকার। যুদ্ধ শুরু হবার ঢেড় আগে থেকে বিহারীরা পাকিস্তানী আর্মির কাছ থেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাঙালী নিধণে নেমেছিল সেকথা তাদের একজনেও বলে না। বিহারীদেরকে পাকিস্তান সরকার আজ পর্যন্ত কেন ফেরত নিচ্ছে না সেটা নিয়েও তারা কথা বলে না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

তথ্যসূত্রের ৪ নং নিবন্ধটা দেখুন বস্‌, এটার উল্লেখ আছে। জুলফিকার আলী ভুট্টোর করা 'টাং তোড় দুঙ্গা' বা 'ইধার হাম, উধার তুম' বা 'জাহান্নুমমে যাও' জাতীয় উক্তিগুলো পাকিস্তানীরা বিলক্ষণ জানে; কিন্তু তারা সত্যটা স্বীকার করে না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

নীড় সন্ধানী's picture

সচলের পুরোনো যুগের কথা মনে পড়ে গেল পোস্ট দেখে। আপাতত শুধু চোখ বুলিয়ে গেলাম। পুরোটা পড়িনি এখনো, তবু বলতে পারি সচলে আজকাল এমন গবেষণাধর্মী এবং পরিশ্রমী কাজ দেখা যায় না। এমন ধারার কাজগুলো অনেকগুলো তথ্যকে একজায়গায় নিয়ে পড়ার সুযোগ করে দেয়। আর সবচেয়ে বড় লাভ হলো আপনার একজনের কষ্টের ফসল আমাদের মতো অনেক অলসের ঘরে উঠে। শুধু কৃতজ্ঞতা রেখে গেলাম।

‍‌-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.--.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.-.
সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে
আমি একা হতেছি আলাদা? আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

আমরা সীমাবদ্ধ ক্ষমতা ও সামর্থ্যের মানুষ। আমরা কখনো কখনো যৎসামান্য চেষ্টা করি। তাতে কখনো হয়তো কোন কাজ হয়, কখনো হয় না। বাকি সময়টা আমরা সভ্যতার কাছে কেবল নিয়ে যাই। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের মুক্তিযুদ্ধের কাছে অনিঃশেষ ঋণ আছে। সেটা তো কখনো শোধ হবার নয়, কেবল কখনো সুযোগ হলে আমরা তার পরমাণুর পরমাণু পরিমান হলেও ফেরত দিয়ে যাবো।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

আব্দুল্লাহ এ.এম.'s picture

গুরু গুরু

হিমু's picture

আপনার মনে আছে কি না জানি না, এককালে সচলে বিশালাকার পোস্টের শুরুতে হাতির ছবি দিয়ে পাঠককে আগাম চা-চু গিলে তৈরি হয়ে বসার আভাস দিতাম। এক শিল্পী বন্ধু সে কথা মনে রেখে একটা ছবি পাঠালেন, দেখেন শিরশ্চিত্র হিসেবে কেমন। মডুরা এমন ছবি বরদাশত করলে পোস্টের প্রকারভেদপিছু এক বা একাধিক শিরশ্চিত্রের একটা নিচয় (Collection) তৈরি করে ব‍্যবহার করা যায়, সম্ভব হলে স্বয়ংযোজনের ব‍্যবস্থা করা যায়।

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

হ্যাঁ, বেশ মনে আছে। আপনার এই পোস্টের শুরুতেও মনে হয় একখানা হাতির ছবি ছিল।

যে ছবি এখানে দিয়েছেন সেটা ব্যাপক পছন্দ হয়েছে। একে চেপেচুপে জুতমত সাইজ করতে পারলে এবং এটা ও এই প্রকার লাগসই ছবিগুলো স্বয়ংযোজনের ব্যবস্থা থাকলে বেশ হয়।

বড় পোস্ট লেখার পর একটু ভাবনায় পড়ে যাই। পর্ব আকারে দিলে পাঠকের সাধারণত মনে থাকে না এক মাস আগে কী পড়েছিলেন। প্রদত্ত লিংক ধরে গিয়ে আবার আগের পর্ব পড়ে বর্তমান পর্ব পড়া একটা বিড়ম্বনার ব্যাপার। এই পোস্টটার কথা ধরুন, এটা দুই/তিন ভাগে দিলে খুব কম পাঠক আগের বলা তথ্য, সূত্র ও যুক্তিগুলো মাথায় রাখতেন। বাকিদের কাছে পরের পর্বগুলো কিছুটা অস্পষ্ট বা অসম্পূর্ণ মনে হতো।

নিতান্ত 'দিঙমূঢ়' সাইজের পোস্ট না হলে আমি লেখা এক পর্বে পোস্ট করতে আগ্রহী। পাঠক সাধারণত পোস্ট খুলে ডানদিকে স্ক্রলবারের দৈর্ঘ্য দেখেন। তারপর তিনি নিজের সুবিধা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন - পড়বেন নাকি পড়বেন না। এটা আসলে লেখক বা পাঠক কারো জন্য কোন সমাধান নয়।

আমি উপন্যাস লেখার লোক না, তবে এক-আধটা বড় গল্প লিখতে ইচ্ছে করে। দুয়েকটা অমন জিনিস আধাখেঁচড়া হয়ে আছে। ওসব নিয়ে কাজ করতে গেলে মনে হয় লেখা শেষ হবার পর এগুলো তো নিজের কাছেই রেখে দিতে হবে, ব্লগের পাঠকদের মধ্যে কয়জন অতোটা ধৈর্য্য ধরে পড়বেন! ফলে আর কাজ আগায় না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

হিমু's picture

এতকিছু ভেবে লিখতে গেলে লেখার মজা নষ্ট। রসিয়ে রসিয়ে লিখুন, আমরা রসিয়ে রসিয়ে পড়বো। টি-টুয়েন্টি এসে টেস্টের সান্ডেমান্ডে কোলোজ করে দিলে চলে?

ষষ্ঠ পাণ্ডব's picture

একটা বিষয় আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না, বই হাতে নিলে সবাই অনায়াসে এক বৈঠকে ১০/১৫ পৃষ্ঠা পড়ে ফেলেন। কেউ কেউ এক বৈঠকে এক-দেড়শ' পৃষ্ঠার গোটা বই পড়ে ফেলেন। আর তারাই ব্লগে ৪/৫ পৃষ্ঠার সমান মাপের লেখা পড়তে হাই তোলেন, লাফঝাঁপ দেন।

আমার লেখা কয়জনে পড়বে সেটা নিয়ে আমি বিশেষ ভাবিত না, কারণ আমি উত্তরটা জানি। এই কারণে বই বের করার কথা মাথায়ও আনি না। এসব ভেবে লেখাকে কাটছাঁট করি না। যে লেখা লিখতে কিছুটা কষ্ট করতে হয়, বেশি সময় লাগে সেটা লোকে পড়বে না সেটা ভেবে কখনো কখনো মন খারাপ হয় বৈকি। আর তাতে কাজ আগাতে চায় না।


তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

Post new comment

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.