কাৎলাসেন

অতিথি লেখক's picture
Submitted by guest_writer on Tue, 30/01/2018 - 6:52pm
Categories:

এক।।

বিয়ের পর এই প্রথম অরণিদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। গ্রামের নাম কাৎলাসেন। সেখানে থাকেন অরণির বড়মামা, তিনি অকৃতদার। কাৎলাসেন ঢাকা থেকে খুব বেশি দূরে নয় অথচ যাই যাই করেও যাওয়া হয়নি এতদিন। এবারে ঈদ, বড়দিন, আর অনিন্দ্যর স্কুলের ছুটি, সব একসাথে পড়ে যাওয়ায় বেশ লম্বা একটা সময় মিলে গিয়েছে হাতে। বছর জোড়া ট্রাফিকজ্যাম-অফিস-বাজার আর ড্রইংরুমের বৃত্তে আটকে থেকে আমিও হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। অরণির মামার চিঠি পেয়ে ভাবলাম, যাই তিনটা দিন কাটিয়ে আসি।

অনিন্দ্য কখনো গ্রাম দেখেনি। আমি ঢাকায় বড় হওয়া মানুষ, গ্রামের সাথে যেটুকু যোগাযোগ ছিল বাবার মৃত্যুর পরে তার সবটুকুই ঘুচে গিয়েছে। আমার আগ্রহ অনিন্দ্যের চেয়ে কম নয় কোন অংশেই। অরণি অবশ্য চেয়েছিল দেশের বাইরে বেড়াতে যাই, নেপাল, শিলং কিংবা ভুটান।

জামান মামা পেশায় কৃষক, যেমনটা আমাদের কল্পনায় ভেসে উঠে তেমন কৃষক তিনি নন। অনেকগুলো বছর অ্যামেরিকায় কাটিয়ে পাকাপাকিভাবে দেশে ফেরার পর সবাই যখন এটা সেটা নানান পরামর্শে তাঁকে অস্থির করে তুলছিলো, তখন একদিন ‘দুত্তোর' বলে ট্রেন ধরে চলে যান পূর্বপুরুষের ভিটায়। এটা আজ থেকে তিরিশ বছর আগের কথা। অরণির নানা তখনো বেঁচে, তবে বয়সের ভারে ন্যুব্জপ্রায়। জামান মামার সেই খামার এখন ছোটখাটো একটা রাজ্যের রূপ নিয়েছে। দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের ক্ষেত, পুকুর, দীঘি, ফলের বাগান, একেবারে হুলুস্থুল অবস্থা। বছর দুয়েক আগে কী একটা রাষ্ট্রীয় পুরস্কারও যেন পেয়েছেন তিনি। ঢাকায় আসতে হবে বলে আর নেওয়া হয়নি সে পুরস্কার। মামা গ্রাম ছেড়ে খুব একটা বের হন না।

সদর থেকে কাৎলাসেন প্রায় বিশ কিলোমিটার দূরে। প্রথম আট কিলোমিটার দারুণ রাস্তা, বাকিটা যেমন হয়, জায়গায় জায়গায় ছাল উঠে গিয়েছে, গাড়ির একটা চাকা গর্ত থেকে উঠতে না উঠতেই আরেকটা চাকা আছড়ে পড়ে। শেষ আধঘণ্টা অরণির শাপশাপান্ত শুনতে শুনতে এক এক বার ভাবছিলাম ফিরেই যাই। দূর থেকে গ্রামটা দেখেই মনে হলো ভাগ্যিস যাইনি। ধু ধু বিস্তৃত ফসলের মাঠের মাঝখানে মরূদ্যানের মতো এক পশলা সবুজাভ ছোঁয়া। আরেকটু কাছে যেতেই বুঝতে পারলাম বেশ কয়েকটি স্তরে বিভক্ত সবুজের সে বেষ্টনী, বাইরের স্তরে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে উঁচু উঁচু নারকেল-সুপুরি-তাল খেজুরের গাছ, ভেতরের দিকটায় ফলবতী বৃক্ষ, তারও পেছনে বাঁশের ঘন জংগল। হলদে সোনালি শস্য ক্ষেত আর সবুজ পৃথিবীর মাঝখানে রামসাগরের মতো টলটলে একটি দীঘি। আমাদের খবর পেয়ে মামা এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন দীঘির ঘাটে। তাঁর সাথে মুশকো মুশকো দুজন লোক, একজনের কাঁধে বন্দুক, আরেকজনের হাতে গাঁটে গাঁটে পাকানো তেল চকচকে একটি বাঁশের লাঠি। এই মধ্যদুপুরে শুনশান দীঘির ঘাটে ধবধবে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী আর ভারি কাশ্মীরি শালে মোড়া জামান মামাকে দেখে মনে হচ্ছিলো যেন পুরনো দিনের গল্প থেকে উঠে আসা কোন সামন্ত প্রভু।

গ্রামের বাইরেটা যতখানি শুনশান, ভেতর ততখানি গমগমে। চারিদিকে গিজগিজ করছে মানুষ। অনিন্দ্য যে কখন হাত ছাড়া হয়ে গিয়েছে খেয়াল করিনি। মামা আমার শঙ্কা টের পেয়ে আশ্বস্ত করলেন, চেয়ে দেখি আমার পাঁচ বছরের ছেলে তিনটি ছাগল ছানার পেছন পেছন ছুটে বেড়াচ্ছে, অরণি অসম্ভব বিরক্তি নিয়ে নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে।

“সাত বছর লাগলো আমার কাছে আসতে হাসান!”

মামার প্রশ্নে কাঁচুমাচু হয়ে জবাব দিলাম,

“জি মামা, আমি তো আসতে চেয়েছি। আপনার ভাগ্নি…”

“আসতে চায়নি, এই তো! ওর কথা বাদ দাও, বাপের মতো হয়েছে। তোমরা এসেছো সেটাই হচ্ছে আসল কথা। এখন বাড়িতে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি এই আসছি। তোরা সব গেলি কোথায়, ওদেরকে ভেতরে নিয়ে যা…”

মামা চলে যেতেই অরণি আমার কাছে এসে দাঁড়ালো। আমি মুখ খোলার আগেই ফিসফিস করে বলল,

“আমি কিন্তু এখানে আসতে চাইনি হাসান। তুমি জোর করে নিয়ে এসেছ। এনি ওয়ে, একটা কথা তোমাকে বলা হয়নি।”

“কী কথা?”

“এই গ্রামে সমস্যা আছে।”
“কী সমস্যা?”

“সেটা সময় হলেই দেখবে।”

এই তাহলে কাৎলাসেন! ছোট বেলায় দাদা বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে যেমন দেখেছি তার চেয়ে অনেক, অনেক অন্যরকম এ গ্রাম। ছোটো ছোটো কুঁড়ে ঘরগুলো একটা আরেকটার সাথে প্রায় গায়ে গায় লাগানো। কিছুদূর পরপর লম্বা লম্বা টিনের দোচালা, জিগ্যেস করে জানলাম ওগুলো গরুর বাথান। বাথানের পাশে ঢাই করে জমিয়ে রাখা খড় বিচালির স্তূপ, কিছু দূর পর পর হাঁস-মুরগি আর ছাগলের খোঁয়াড়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে লেবু-ডালিম-পেয়ারার গাছ, শিমের মাচা, বেগুনের ঝোপ, সব মিলিয়ে কেমন যেন অস্বাভাবিক রকমের গোছানো গ্রামটা। মনে হচ্ছে বাংলাদেশ নয়, আফ্রিকার কোন এক বিজন জনপদে এসে ঢুকেছি আমরা। যেখানে শ খানেক প্রজা, কয়েক ডজন বউ, আর গণ্ডা গণ্ডা সন্তান সন্ততি নিয়ে বাস করেন একজন নৃপতি।

মামার বাড়িটা গ্রামের একেবারে মাঝখানে, দেয়াল দিয়ে ঘেরা পুরনো আমলের মোটা মোটা থামের শ্যাওলা ধরা একটি দোতলা। দেখেই বোঝা যায় এককালের কোন দাপুটে জমিদারের বাড়ি। ভারি লোহার গেট সরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই নিচের বৈঠক ঘর থেকে মামা ডাক দিলেন,

“গোসল খানায় গরম পানি ঢালা চলছে। তোমরা বরং এখানে বসে একটু জিরিয়ে নাও। আমার নানা ভাই কোথায়?”

অনিন্দ্য পারলে ওর মায়ের আঁচলের সাথে মিশে যায়। শরীরটাকে পেছনে রেখে অরণির আঁচলের ফাঁক দিয়ে মুখটা বের করে মিনমিনে গলায় জানান দিলো সে আছে।

জামান মামা বাজখাই গলায় একটা হাঁক দিলেন,

“রাইসু, এই রাইসু? জিনিসটা নিয়ে আয় হারামজাদা।”

পাশের ঘর থেকে সিড়িঙ্গে মতন একটা লোক লাল কাপড়ে মোড়া কী যেন একটা দুহাতে ধরে টেবিলের উপর রাখলো। মামা অনিন্দ্যকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন,

“এদিকে আয় ব্যাটা।”

ভয় আর কৌতূহলের চিরন্তন দ্বন্দ্বের দোলাচালে থমকে দাঁড়িয়ে আমার ছেলে। আমি ওর কাঁধে হাত রেখে বললাম,

“নানা ডাকছেন অনিন্দ্য, যাও।”

একবার আমার দিকে আরেকবার অরণির দিকে তাকিয়ে জামান মামার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে, বেশ ভয় পেয়েছে।

মামার মুখে প্রশ্রয়ের হাসি,

“ভয় পাচ্ছিস কেন রে! নে, কাপড়টা সরা দেখি?”

কাপড় সরাতেই ঘরটা যেন ঝলমল করে উঠলো, একটি সবুজ টিয়ে। খুশিতে আমার ছেলের দাঁত বেরিয়ে গিয়েছে।

“টিয়া পাখি! এটা আমার?”

“তোর নয়তো কার? ভালো করে খাওয়াবি, যত্ন নিবি, গোসল করাবি, আর কথা শিখাবি, কেমন?”

রাইসু এসে জানালো গোসলখানায় পানি দেওয়া হয়েছে।

গোসল করে ফিরে এসে দেখি অরণি সোফার হাতলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। অনিন্দ্য মেঝেতে উপুড় হয়ে গালে হাত দিয়ে খাঁচার দিকে তাকিয়ে, গোল গোল করে আদুরে গলায় বলছে,

“বল তো পাখি, নানা।”

জামান মামা ঘরে নেই। অরণিকে ডেকে তুললাম, খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে আমার।

দুই।।

অরণির সাথে আমার ঠিক প্রেমের বিয়ে নয়। পাড়ার বকর চাচা প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন, আমার বাবা-মা দেখে এসে জানালেন মেয়ে তাদের পছন্দ হয়েছে, এখন আমি একবার দেখা করে মত দিলেই ব্যাস। আমার তখন নতুন চাকরি, সদ্য জয়েন করা আমাদের চার কলিগকে ডেকে নিয়ে বস বলে দিয়েছেন দু’ বছর পর তাঁর পাশের অফিসটা পাবে একজন, অন্যেরা থেকে যাবে কিউবিকলেই। জগতের সকল চিন্তা শিকেয় তুলে আমরা চার জনে জান প্রাণ দিয়ে খেটে মাল্টিন্যাশনালের প্রফিট বাড়িয়ে চলছি।

নেহাৎ বাবা-মা কথা দিয়ে এসেছেন বলেই একদিন ভ্যাপসা গরমে স্যুট টাই পড়ে গুলশান আড়ং এর ক্যাফেতে গিয়ে বসলাম। তারপর দুই সপ্তা আমার আর ঘুম নেই। বাসার কেউ কিছু বলছেও না, আবার নিজে যে যেচে গিয়ে জিগ্যেস করবো সেটিও পারছি না। সময়ে অসময়ে রান্নাঘরে মার কাছে গিয়ে দাঁড়াই, মা জিগ্যেস করেন, ‘কিছু বলবি?’। আমি এক কাপ চা কিংবা এই জাতীয় কিছু একটার কথা বলে চলে আসি। কিছুই ভালো লাগেনা, জীবন বিষময় হয়ে হয়ে ঝুরঝুরে প্রায়। অবশেষে একদিন বকর চাচা এসে জানালেন, মেয়েরও কোন আপত্তি নেই। বাবা আমাকে তাঁর ঘরে ডেকে বললেন, ‘তোর চাচাদের তাহলে ঢাকায় আসতে বলি, একটু খোঁজখবর নিয়ে দেখুক, বিয়ে তো আর ছেলেখেলা নয়!’

যে আমি জীবনে কোনোদিন বাবার কথার পিঠে কথা বলিনি, সে আমি মেঝের দিকে চোখ রেখে মিনমিন করে বললাম, ‘চাচাদের অনুষ্ঠানের আগে দিয়ে জানালেই চলবে’।

অরণির নানার তিন ছেলের দুজন অল্পবয়সে মারা গিয়েছেন, বড় জন একসময় অ্যামেরিকায় থাকতেন, এখন গ্রামে চলে গিয়ে মস্ত বড় একটা খামার চালান। ওর বাবার দিকের লোকজন পুরনো ঢাকার আদি বাসিন্দা। আমার শ্বশুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিতের অধ্যাপক, অল্পবয়সে অরণি মাতৃহারা হবার পর তিনি আর বিয়ে করেন নি। এর বাইরে আর কিছু জানা হয়নি আমার। কাৎলাসেন আমাকে চমকে দিয়েছে।

কত বয়স হবে এই বাড়িটার? দেড়শ, দু’শ, নাকি তারও বেশি? হাঁটতে হাঁটতে পেছনের বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। এতো গুলো ঘর নিচেরতলায় অথচ বৈঠক ঘরটা ছাড়া আর দুটো মাত্র ঘরের দরজা খোলা, বাকি সবগুলোতে আদ্যিকালের ভারি ভারি তালা ঝুলছে, জং ধরে কেমন কালচে হয়ে আসা খয়েরি রং। এককালে নিশ্চয়ই গমগম করতো বাড়িটা। বারান্দার সাথে প্রায় লাগোয়া একটি কুঠুরি, দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ, ঘুলঘুলি দিয়ে দমকে দমকে বেরিয়ে আসছে সাদা সাদা ধোঁয়ার কুন্ডুলি, সম্ভবত রান্নাঘর। কমবয়সী একটি মেয়ে দরজা খুলে বাড়ির দিকে আসতে গিয়ে আমাকে দেখেই এক হাত লম্বা ঘোমটা টেনে ত্রস্ত পায়ে হেঁটে চলে গেলো উল্টো দিকে। আমি তার আলতা পড়া পায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, কখন যে অরণি এসে পাশে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। আমার কাঁধে একটা খোঁচা দিয়ে বললো,

“ছিঃ হাসান! সময় মতো বিয়ে করলে ওই বয়সি একটা মেয়ে থাকতো তোমার।”

“কী যে বল অরণি! আচ্ছা, তুমি কখনো পায়ে আলতা দিয়েছো?”

“তোমার কি মাথা খারাপ?”

“কেন, জমিদার বাড়ির মেয়েদের বুঝি আলতা দিতে নেই?”

অরণি কোন উত্তর দিলো না। আমার কাঁধে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে রইলো গা ঘেঁষে। এই পড়ন্ত দুপুরে এভাবে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে খুব ভালো লাগছে আমার। হঠাৎ শব্দ করে কেশে উঠলো কেউ। অরণি ধরা পড়ে যাওয়া কিশোরির চপলতা নিয়ে চকিতে সরে গেলো একদিকে, মামা এসেছেন, তার হাত ধরে আমাদের অনিন্দ্য।

“এই যে, তোমরা এখানে! উপরে খাবার দেওয়া হয়েছে, খাবে চলো।”

আগে লক্ষ্য করিনি, বৈঠক ঘরের ভেতর দিয়ে প্যাঁচানো একটা সিঁড়ি চলে গিয়েছে উপরতলায়। সিঁড়িতে পা পড়তেই যেন প্রাণ ফিরে এলো বাড়িতে। যে ভাবে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ হচ্ছে, ভেঙে না পড়ে!

জামান মামা অভয় দিয়ে বললেন,

“ভয় নেই, ভাঙবে না। খাঁটি মেহগিনি কাঠের সিঁড়ি, খোদ বর্মি মুল্লুক থেকে কাঠ এনে বানানো।”

দোতলার মেঝেটাও পুরোপুরি কাঠের। অনিন্দ্য মহা আনন্দে থপ থপ করে হাঁটছে, ওর পেছন পেছন পাখির খাঁচা হাতে রাইসু নামের লোকটা। খাবার ঘরের মেঝেতে খাঁচাটা নামিয়ে রেখে দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়ালো সে।

এইধরনের ঘর পুরনো দিনের হলিউডের সিনেমায় দেখেছি। একপাশে অন্তত কুড়ি জন একসাথে বসতে পারে এমন একটি টেবিল, তার উপর রেশমি ঝালর দেওয়া পুরু টেবিল ক্লথ। দেয়াল জোড়া মসজিদের মিম্বরের মতো দেখতে ছোটো ছোটো জানালা, জানালায় ভারি পর্দা। দুই দিকের দেয়ালে হেলান দিয়ে এক, দুই, তিন,…… সাতটি সেগুণ কাঠের আলমারি, কাঁচের আড়ালে রাজ্যের জিনিস। কোনটায় তৈজসপত্র, কোনটিতে বই, একটায় থরে থরে সাজিয়ে রাখা প্রাচীন কালের বিচিত্র সব অস্ত্রশস্ত্র। গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের কথা এতদিন গল্পের বইতেই পড়ে এসেছি, চাক্ষুষ দেখলাম এই প্রথম, অস্ত্রের আলমারিটার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সমান উচ্চতায়।

ঘরের অন্যপাশে তুলনামূলক ভাবে ছোটো আরেকটি টেবিল, বড়টার মতোই জমকালো। খাবার দেওয়া হয়েছে সেখানেই। কতগুলো পদ আছে তা গুণতে হলে এক এক হাতে কুড়িটির বেশি কড় থাকা প্রয়োজন। শাশুড়ি জীবিত না থাকায় জামাই আদর বলতে যা বোঝায় তা পাবার সৌভাগ্য আমার হয়নি। সে খেদ ঘুচে গেলো আজ।

আমরা খেতে বসেছি বড় টেবিলটায়। চার জন লোক ঘুরে ঘুরে খাবার পরিবেশন করে চলেছে। রাইসু তখন থেকেই ঠায় দাঁড়িয়ে দরজার বাইরে।

মামা একটা বাটির ঢাকনা সরিয়ে আমাকে দেখিয়ে বললেন,

“হান্টার বিফ, এটা কিন্তু আমি নিজে রেঁধেছি। অ্যামেরিকায় থাকতে রেসিপিটা শিখেছিলাম। খেয়ে বলো কেমন হয়েছে।”

বাঙালি মধ্যবিত্তের ছেলে আমি। একটা সময় পর্যন্ত গরুর মাংস বলতে ঝোল, ভুনা আর কাবাবই জানতাম। আজকাল রেস্তোরা রেস্তোরায় এটা সেটা পাওয়া যায় বটে, তবে হান্টার বিফ! নামটাই প্রথম শুনলাম জীবনে।

পরোটা ছিঁড়ে একফালি মাংস জড়াতে জড়াতে বললাম,

“মামা, অরণি কিন্তু কখনো বলেনি সে জমিদার পরিবারের মেয়ে।”

মামা হাসতে হাসতে বললেন,

“যা নয় তা বলতে যাবে কেন! জমিদারি কি আর আছে এখন?”

“তা নেই, কিন্তু এই বাড়িটা আছে, আপনি আছেন।”

“আমি জমিদার নই। আমাদের বংশে কস্মিনকালেও জমিদার জাতীয় কেউ ছিলেন না। বাড়িটা আমার নয় হাসান।”

“আপনার নয়! তাহলে, ইয়ে মানে, আছেন কী করে?”

“বাড়িটা আমার বাবার। আসলে তারও নয়। সে অনেক কথা, অন্য সময় বলা যাবে। হান্টার বিফ কেমন লাগছে বলো। ওকি, অমন মুখ শুকনো করে বসে আছো কেন? মাংস ঠাণ্ডা ঠেকছে বুঝি! হান্টার বিফ ঠাণ্ডাই খেতে হয়।”

ঠাণ্ডা টাণ্ডা নয়, মামার কথা শুনে থতমত খেয়ে না চিবিয়েই বড় একটা টুকরো ভুল করে গিলে ফেলেছি, গলায় আটকে গিয়েছে। ঢক ঢক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে কোন মতে বললাম,

“মাংসটা খুব মজা হয়েছে।”

খেতে খেতে বিকেল গড়িয়ে গেলো। গ্রামের চারদিক জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু উঁচু গাছগুলোর জন্যই বোধ করি অন্ধকার হয়ে এসেছে চারি দিক। মামা তার সেই বাজখাই গলায় হাঁক দিলেন,

“রাইসু, এই রাইসু? কোথায় গেলি হারামজাদা? আলো জ্বালিয়ে দিয়ে যা।”

রাইসু একটা মশাল হাতে ঘরে এসে দাঁড়ালো। দেয়াল জোড়া তেলের বৈয়ম গুলো আগেই চোখে পড়েছিলো, ভেবেছিলাম ঘর সাজানোর আরও একটা জমিদারি তরিকা বোধ হয়। এখন চোখে পড়লো বৈয়মের মুখে পাকানো দড়ির সলতে মতো বেড়িয়ে আছে। কী ভয়ংকর! এ বাড়িতে ইলেক্ট্রিসিটি নেই নাকি?

অরণি আমার মনের কথা বুঝে উত্তর দিলো,

“নানাজানের চোখের সমস্যা ছিলো, ইলেকট্রিকের আলো সহ্য করতে পারতেন না। গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি আসতে দেননি কখনো।”

আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বেকুবের মতো প্রশ্ন করলাম,

“মামা আপনারও কি চোখের সমস্যা?”

মামা ঠা ঠা করে ঘর ফাটিয়ে হেসে বললেন,

“সত্যি বলতে কি, একটা বয়স পর্যন্ত চোখ আমার ভালোই ছিলো। অ্যামেরিকায় থাকতে একদিন টের পেলাম বাবার অসুখটা আমাকেও ধরেছে। সে জন্যেই তো চলে এলাম।”

“ডাক্তার দেখান নি?”

“ডাক্তার কিছু করতে পারবে না হাসান। এটা আমাদের বংশগত।”

“কই অরণির তো এমন কিছু নেই!”

“বললাম না তখন, ও হয়েছে ওর বাপের মতো? আমাদের কিছুই পায়নি।”

ইলেকট্রিকের বাতি আর তেলের বাতিতে আকাশ পাতাল ফারাক। ঘরময় দপদপ করে জ্বলছে একটার পর একটা বাতি কিন্তু তারপরও যেন থোক থোক অন্ধকারে ডুবে রয়েছে চারিদিক। কেমন গা ছমছমে একটা পরিবেশ। এ বাড়িতে টর্চ লাইট আছে তো!

অনিন্দ্য একটা আরাম কেদারায় বসে ঘুমিয়ে পড়েছে। সে দিকে চোখ পড়তেই মামা বললেন,

“তোমরাও আর জেগে থেকে কী করবে? এই রাইসু, ওদের কে শোবার ঘরটা দেখিয়ে দে। আমি নানা ভাই কে নিয়ে আসছি পেছন পেছন।”

অন্ধকারে বর্মি মুল্লুকের মেহগিনি কাঠের মেঝে মাড়িয়ে চলছি রাইসুর পেছন পেছন। মনে হচ্ছে, যেন পায়ের তলায় মড় মড় করে ভাঙছে লাল কমল আল নীলকমলের হাড়ের পাহাড়। অরণি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই হাঁটছে, আমার এক একবার মনে হচ্ছে ওর হাতটা চেপে ধরি। পেছনে মামা না থাকলে তাইই করতাম। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম অনিন্দ্য তার নানার বুকের সাথে লেপ্টে রয়েছে, অনেক লম্বা একটা দিন কাটলো আমার ছেলের।

তিন।।

ঘুম ভাঙলো কা কা শব্দে, কাকডাকা ভোরে। অনেক দিন এমন ঝরঝরে অনুভব করিনি। পাশ ফিরে দেখি মা ছেলে এখনো গভীর ঘুমে তলিয়ে। ওদেরকে বিরক্ত না করে পা টিপে টিপে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। রাতের অন্ধকারে উপরতলাটা ভালো করে দেখা হয়নি। পাশের ঘরের ভেজানো দরজাটা হালকা একটা ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো।

ভেতরে ঢুকে একরকম বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। যেন একটা আর্ট গ্যালারিতে চলে এসেছি। সার বেঁধে টাঙ্গিয়ে রাখা ছবিগুলো দেখতে দেখতে চোখ চলে গেলো প্রমাণ সাইজের একটি পোর্ট্রেটের দিকে। জামান মামাকে যেমন দেখেছিলাম দীঘির পাড়ে, অনেকটা ওইরকমেরই একটা শাল গায়ে দিয়ে আমার দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন একজন প্রৌঢ়। পাশেই শরীরের জায়গায় জায়গায় রোম উঠে যাওয়া ভয়ংকরদর্শন একটি কুকুর।

“অনেক দিন পর কালীনাথ রায়ের সাথে নতুন কারও দেখা হলো। অবশ্য খুব যে খুশি হয়েছেন তিনি তা বলবো না। দেখছ না কেমন কটমট করে চেয়ে আছেন!”

চমকে উঠে পেছন ফিরে দেখি জামান মামা।

কালীনাথ রায়ের চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। আর কুকুরটাও যেন সাক্ষাৎ নরক থেকে উঠে আসা। মামাকে জিগ্যেস করলাম,

“কে ইনি?”

“জমিদার কালীনাথ রায়, এই বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা। লোকে বলে তিনি ছিলেন ত্রিপুরার রাজা রাজধার মাণিক্যের প্রধান পুরোহিত। ভাগ্যদোষে রাজার আনুকূল্য হারিয়েছিলেন, প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসেন এই অঞ্চলে, সংগে ছিলো প্রচুর ধনরত্ন। কর্নওয়ালিসের বেপরোয়া নীতির কারণে স্থানীয় জমিদারের তখন নেই নেই দশা। একে তো খাজনার আকাশ চুম্বী হার, তার উপর পর পর তিন বছরের টানা অজন্মা, জমিদারি তার নিলামে উঠেছে। কালীনাথ রায়েরও কপাল!”

“অন্য ছবিগুলো বুঝি এঁর বংশধরদের?”

“দুশ বছর টিকেছে এমন জমিদারি ক’টা আছে বাংলাদেশে? কালীনাথ রায়ের জমিদারি নিলামে বিক্রি হয়ে যায় এক পুরুষ পরেই। তারপর বেশ কয়েকবার হাত বদল হয়ে শেষমেশ জমিদারি পান নারায়ণ মঙ্গল। উল্টোদিকের দেয়ালের ছবিটা তাঁর। বাকি ছবিগুলো বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের জমিদারদের, আমি শখ করে সংগ্রহ করেছি।”

“আপনার বাবা…”

“তিনি ছিলেন নারায়ন মঙ্গলের দেওয়ান। নারায়ণ মঙ্গল আর দশজন জমিদারের মতো অত্যাচারী নন, প্রাজারা খেয়ে পড়ে মোটামুটি ভালোই ছিলো। সাতচল্লিশের দাঙ্গায় পুরো দেশ যখন ছারখার হয়ে যাচ্ছে, তখনো এই অঞ্চলের হিন্দু মুসলমানদের সৌহার্দে কোন ভাটা পড়েনি। দেশভাগের উত্তেজনা থিতিয়ে আসার কিছুদিন পর মঙ্গল নারায়ণ সপরিবারে কাশীযাত্রা করেন। তারপর তাঁদের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।”

“খোঁজ পাওয়া যায়নি মানে!”

“তাঁরা স্রেফ উধাও হয়ে গিয়েছেন। এই নিয়ে পত্রপত্রিকায় বিস্তর লেখালিখি হয়েছিলো। মন্দ লোকে অবশ্য বলে নারায়ণ মঙ্গল টাকা পয়সা নিয়ে পালিয়ে গিয়েছেন। এতো বড় একটা দেশ ভারত, নাম পরিচয় ভাঁড়িয়ে কোন একটা জায়গায় থিতু হয়ে গেলে দেখবে কে! বাবা অবশ্য সেসব কোথায় কান দেননি। বছরের পর বছর সয় সম্পত্তি আগলে রেখে অপেক্ষা করেছেন, যদি কেউ ফিরে আসে। এতো গুলো বছর হয়ে গেলো, কেউ আসেনি। আসবেও না।”
আমার মাথা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। বাইরে অনিন্দ্যর গলার শব্দ শুনে মামা বললেন,

“ওই ওরা উঠেছে বোধ হয়। রাইসু, এই রাইসু! কোথায় গেলি হারামজাদা? নাস্তার ব্যাবস্থা কর।”

নাস্তার পর অরণিকে বললাম গ্রামটা একটু ঘুরে দেখতে চাই, সে যাবে নাকি? রাজি হয়নি, বলল মাথা ধরেছে। অনিন্দ্য বেশ আছে তাঁর টিয়া পাখি নিয়ে, এখন চকলেটের লোভ দেখিয়েও ওকে এখান থেকে বের করা যাবে না। মামা বৈঠকখানায় লোক জন নিয়ে কী কী সব কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছেন। একা একাই বেরিয়ে যাচ্ছিলাম, জামান মামা খস খস করে কাগজে লিখতে লিখতে চোখ না তুলেই বললেন,

“কোথাও যেতে হলে রাইসুকে সাথে নিয়ে যাও।”

কাৎলাসেনকে গ্রাম বলার চেয়ে বসতি বলাই ভালো। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই দেখার মতো আর কিছু খুঁজে পেলাম না। রাইসুকে বললাম ফলের বাগান গুলো দেখে আসি একবার। সে প্রবল বেগে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,

“ওইখানে যাওন ঠিক অইতো না, সাফের আস্তানা।”

বাড়ি ফিরে যেতে পারি, কিন্তু অরণির বাঁকা হাসিটার কথা মনে হতেই মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। অনেক সাধ্য সাধনা করে ছেলে বউকে নিয়ে এসেছি গ্রাম দেখবো বলে। একঘণ্টা ঘুরেই ফিরে যাই কী করে? রাইসুকেই জিগ্যেস করলাম,

“আর কোথায় যাওয়া যায় বলতো?”

রাইসু খানিকক্ষণ ভেবে বললো,

“নারান দীগিত মাছ মারবেন?“

দীঘিটা তাহলে মঙ্গল নারায়ণের করা! জীবনে কখনো মাছ ধরিনি, রাইসুর প্রস্তাবটা খারাপ না।

দীঘির পারে বসে বেশ লাগছে, সুন্দর ঝিরি ঝিরি একটা বাতাস চারিদিকে, দূরের মাঠে কিষানেরা দল বেঁধে নিড়ানি দিচ্ছে, মাঝে মাঝে একদুটো পাখি উড়ে যাছে মাথার উপর দিয়ে, এই না হলে সহজ সরল গ্রামীণ জীবন!

নারান দীঘি কত গভীর কে জানে! রাইসু হেঁইয়ো হেঁইয়ো করে অনেকগুলো চার ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে দীঘির পানিতে, তলার মাছ উপরে উঠে এলে হয়। আমাকে শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়ে সে ব্যাটা একটা কাঁঠাল গাছের গায়ে হেলান দিয়ে ঝিমুচ্ছে এখন। আহারে বেচারা, এই রকম অলস সময় বোধ হয় খুব একটা জোটে না তার।

ফাতনার দিকে চেয়ে থাকতে থাকে চোখ ব্যাথা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু মাছের কোন দেখা নেই। এক দুবার ফাতনা নড়ে উঠেছে মনে হলেও সে নিশ্চয়ই আমার চোখের ভুল। রাইসুকে ডাক দিতে গিয়ে দেখি সে ঘুমিয়ে পড়েছে। হাত থেকে ছিপ নামিয়ে রেখে আড়মোড়া ভাঙতে যাবো, এমন সময় দীঘির পাশের নিচু জমি থেকে মাথা উঁচু করে একটা সাত আট বছরের বাচ্চা ছেলে বেরিয়ে এলো, আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

হাত ছানি দিয়ে ডাক দিতেই সে আমার কাছে এসে বসলো, মুখে হাসিটা লেগেই আছে। আমি জিগ্যেস করলাম,

“কী রে হাসিস কেন?”

ছেলেটা হাসি থামিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“এইতায় কাম অইতো না। নারান দীগির মাছ বহুত সিয়ানা।”

“তাহলে কী করতে হবে শুনি?”

“মুহর বোগলে আত লইয়া শব্দ করন লাগবো, এই যে এমবায়।”

বলেই হাতদুটো শাঁখের মতো মুখের সামনে ধরে অদ্ভুত একটা শব্দ করলো ছেলেটি। আমি শহুরে মানুষ, ডাহুকের ডাক শোনা তো দূরের কথা, ডাহুক দেখতে কেমন তাই জানিনা। কিন্তু কেন যেন মনে হলো এটা ডাহুকের ডাক, চেপে চেপে বেরিয়ে আসছে গহীন কোন একটা জায়গা থেকে। কী আশ্চর্য! দীঘির ঠিক মাঝখানটায়, পানির তলা থেকে শূন্যে দুই ফুট উপরে লাফিয়ে উঠলো বিশাল একটা মাছ। তার রুপোলী রুপোলী আঁশে রোদের সোনালি ঝলক।

“কমলেশ”

ছেলেটা অদ্ভুত শান্ত গলায় ফিসফিস করে বলল।

“কমলেশ কী?”

“ওই যে ফাল দা উঠলো!”

আমি হেসে ফেললাম।

“বাহ মাছের নাম ধাম সব জানিস দেখছি তুই? তোর নাম কী?”

“হারান”

“সুন্দর নাম। থাকিস কই?”

“এইনো।”

“এখানে? এই গ্রামে?”

ছেলেটি মাথা নাড়লো, সে এখানে থাকে না। তারপর শান্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে নেমে গেলো দীঘির পানিতে।

হারান ডুব দিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেলো, এখনো উঠার নাম নেই। ছেলেটা তলিয়ে গেলো নাকি? আমি ছিপ টিপ ছুঁড়ে ফেলে একটা ধাক্কা দিয়ে রাইসুকে উঠালাম। সে চোখ ডলতে ডলতে বললো,

“মাছ পাইছেন?”

“রাখো তোমার মাছ, হারান ডুবে গিয়েছে তুমি একটু নেমে দেখো।”

“কে ডুবছে?”

“হারান, সাত আট বছরের একটা বাচ্চা ছেলে। মুখের কাছে হাত রেখে ডাহুকের মতো ডাকতে পারে, সেই হারান। বলল এখানেই নাকি থাকে।”

রাইসু দীঘির পানির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো, কী ভীষণ শান্ত সে পানি, যেন কিছুই হয়নি। তারপর বললো,

“এই গেরামে কুনু পুলাপান নাই হাছন বাই। আপনে ভুল দেখছেন। রইদের মাইদ্দে ঠাডা মাইরা বইয়া থাকলে মাথা গরম হয়, মাইনসে কী দেহে না দেহে! লন বাইত যাই।”

আমার শরীর থরথর করে কাঁপছে। বাচ্চা ছেলেটাকে পানিতে রেখে চলে যাবে রাইসু! ধাক্কা দিয়ে ওকে সামনে থেকে সরিয়ে একহাঁটু পানির মধ্যে নেমে গেলাম আমি। আর অমনি দীঘির মাঝখানে লাফিয়ে উঠলো অপূর্ব একটি মাছ। মাছটার মাথার জায়গায় হারানের মাথা। আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো!

চার।।

অনেকক্ষণ ধরেই একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছি। শব্দটা কেমন যেন অচেনা, আবার ঠিক অচেনাও নয়। চোখ মেলে দেখি মাথার কাছে খটাস খটাস করে ঘুরে চলেছে একটা হাতপাখা, যে হাত ওই পাখাটিকে ধরে রেখেছে সে হাতে গোছা গোছা কাঁচের চুড়ি, ঝমঝম করে বাজছে। সেই ঘোমটা দেওয়া মেয়েটি। বাতাস করতে করতে কখন যে নিজেই ঘুমিয়ে পড়েছে জানেনা, অভ্যস্ত হাতে নকশী পাখাটা ঘুরে চলেছে ক্লান্তিহীন।

মেয়েটির বয়স খুব বেশি হলে সতেরো কি আঠারো, এই বয়সেই মুখের ছাঁচে গভীর একটা বিষণ্ণতা। মেয়েটি সম্ভবত স্বপ্ন দেখছে, ঘুমের মধ্যে তিরতির করে কাঁপছে ওর চোখের পাতা।

একটু পানি খেতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু মেয়েটার ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে করলো না। আবার ঘুমিয়ে গেলাম। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি কে জানে? হঠাৎ শুনতে পেলাম অরণির গলা। কাকে যেন চাপা গলায় ধমক দিয়ে বলছে,

“তুমি হয় এসব বন্ধ করো, নইলে মরে যাও অন্যদের মতো। মরে যাও।”

“বন্ধ করার তো কোন উপায় নেই! বছরে চারবার, এটাই নিয়ম। চাইলেই সে নিয়ম আমি ভাঙতে পারি না। তোর মা’র কষ্টের কথা ভুলে গিয়েছিস?”

“কেমন করে ভুলি! সারা শরীর ফেটে ফেটে রক্ত ঝরতো। বাবা আমাকে ওই ঘরে যেতে দিতেন না। প্রতি রাতে মা’র গোঙানির শব্দে ঘুম ভেঙে যেতো আমার। তখন বালিশ দিয়ে কান চেপে বিছানায় পড়ে থাকতাম।”

“তুই কি চাস, তেমন কষ্ট তোরও হোক?”

“হলে হবে, মরে যাও তুমি।”

“আমি মরে গেলেই কি আর রক্তের লেখন পাল্টে যাবে?”

“কেন পাল্টাবে না?”

“অনিন্দ্য? ওর কী হবে?”

“ওকে নিয়ে আমি দেশের বাইরে চলে যাবো। কোন না কোন একটা উপায় হবেই।”

“দেশের বাইরে আমিও ছিলাম, অনেক অনেক বছর ছিলাম। কিন্তু কী হয়েছে তাতে?”

“অন্তত এইবার মামা, এইবার। হাসান একটু সুস্থ হয়ে উঠুক, যা করার আমরা চলে যাবার পর করো।”

“তা হয়না। দিনক্ষণ সব নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। আজ রাতেই।”

কীসের কথা বলছে ওরা? কী হবে আজ রাতে! আমি মটকা মেরে পড়ে আছি, যদি আরও কিছু শোনা যায়। কিন্তু রিনরিনে গলায় চিৎকার করতে করতে অনিন্দ্য ঢুকে পড়েছে ঘরে। অরণি ওকে থামিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“আস্তে অনিন্দ্য। বাবার ঘুম ভেঙে যাবে।”

“বাবা তো তিনদিন ধরেই ঘুমাচ্ছে মা। ওকে উঠতে বলো।”

তিনদিন ধরে ঘুমাচ্ছি! আমার হয়েছে কী? অরণিই বলে দিলো,

“তোমার বাবার জ্বর হয়েছে মানিক, সেরে গেলেই ঘুম থেকে উঠে পড়বে।”

জামান মামার গলা শুনতে পেলাম আবার, অনিন্দ্যকে জিগ্যেস করলেন,

“কী হয়েছে নানাভাই? এমন চেঁচাচ্ছিলি কেন?”

“টিয়া পাখিটা কথা বলেছে একটু আগে।”

“তাই নাকি! কী বলেছে?”

“আমি যেটা শিখাচ্ছিলাম।”

“তাই নাকি! চল চল গিয়ে শুনি একবার।”

পায়ের শব্দে টের পেলাম ওরা চলে গিয়েছে। অরণি যায় নি। অরণির গায়ে বেলি ফুলের মতো একটা গন্ধ আছে, কাছে থাকলে আমি টের পাই। আমার মাথার পাশে বসে কপালে ওর হাতটা রাখলো, কী যে অদ্ভুত মায়া ওই হাতে!

আমার খুব ইচ্ছে করছে চোখ মেলে ওকে জড়িয়ে ধরি। কিন্তু তার আগেই অরণি চীৎকার করে উঠলো,

“হাসানের জ্বর সেরে গিয়েছে মামা!”

আমি এইবার চোখ মেলে ওর দিকে তাকালাম। অরণির চোখে পানি।

মামা অনিন্দ্যকে নিয়ে ছুটে এসেছেন। টিয়া পাখির খাঁচা হাতে পেছন পেছন রাইসু। আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো অনিন্দ্য। ওর রেশম রেশম চুলে নাক ডুবিয়ে গন্ধ নিলাম, বেলি ফুলের গন্ধ, অরণির মতোই।

“বাবা জানো! আমার টিয়াটা কথা বলেছে। রাইসু মামা খাঁচাটা এদিকে আনবে?”

টিয়া পাখি সত্যি সত্যি কথা শিখে গিয়েছে দেখি! অনিন্দ্য পকেট থেকে একটা বিস্কুট বের করে সামনে ধরতেই পরিষ্কার গলায় বলে উঠলো, ‘বাবা’।

আমি অবাক হয়ে বললাম,

“তুই না নানা শেখাচ্ছিলি?”

“হু, কিন্তু কিছুতেই বলছিলো না।”

জামান মামা আমার কাছে এসে বললেন,

“কেমন বোধ করছ হাসান? যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে!”

“ভালোই আছি মনে হয়, কেবল মাথাটা একটু হালকা লাগছে।”

“তা তো লাগবেই, এই তিনদিন পানি আর ফলের রস ছাড়া কিছু তো যায়নি পেটে। এই রাইসু, দাঁড়িয়ে আছিস কেন হারামজাদা? টেবিলে খাবার লাগাতে বল”

রাইসুর কপাল! বেচারা মন্দ দিনেও গালি খায়, ভালো দিনেও।

“একদম বদমাইশ একটা। আরে বাবা, শহরের ছেলে গ্রামে বেড়াতে এসেছে। তুই কিনা তাকে নিয়ে ঠা ঠা রোঁদের মধ্যে মাছ ধরতে বসিয়ে দিলি? আর তোমারও আক্কেল হাসান, সাঁতার না জেনে নারান দীঘিতে নামতে গেলে কেন?”

নারান দীঘি নামটা শুনেই ঝাঁ করে মনে পড়ে গেলো সব কিছু। ভয়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো আমার শরীর, বিছানায় শুয়েই থরথর করে কেঁপে উঠলাম। অরণি দৌড়ে এসে আমার মাথায় হাত রাখলো।

আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,

“ও কিছু না। ভীষণ খিদে পেয়েছে বলেই মাথাটা ঘুরে উঠলো।

অনিন্দ্যর সামনে হারানের প্রসঙ্গটা আনতে চাই না। বাচ্চা মানুষ, ভয় পাবে। রাতে খাবার পর ও ঘুমিয়ে গেলে মামাকে জিগ্যেস করবো।

হারানের ব্যাপারটা কিছুতেই মাথা থেকে তাড়াতে পারছি না। এক একবার মনে হচ্ছে হারান টারান সব মনের ভুল, রোদের মধ্যে ঠায় বসে থেকে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম দীঘিতে। কিন্তু মামা যে বললেন আমি নিজে থেকেই পানিতে নেমেছি! আমারও স্পষ্ট মনে আছে রাইসুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নারান দীঘিতে নেমে যাওয়ার কথা। নাকি জ্বরের ঘোরে দুঃস্বপ্ন দেখেছি কোন? স্বপ্নই হোক আর যাই হোক একটা বিষয় সত্যিই অদ্ভুত, এই গ্রামে আসলেই কোন বাচ্চাকাচ্চা দেখিনি আমি। কম করে হলেও শ’তিনেক লোকের বাস এখানে- মসজিদ আছে, মন্দির আছে, দুটো মনিহারি দোকানও দেখেছি, কিন্তু কোন স্কুল চোখে পড়েনি। অবশ্য মামার মুখে শুনেছি তিনি নাকি চার মাইল হেঁটে স্কুলে যেতেন। সেটা প্রায় ষাট বছর আগের কথা। যুগ বদলালেও কাৎলাসেন বদলায়নি কেন?

দুপুরের খাবারে মাছ দেখে গা গুলিয়ে উঠলো। অরণি মাছের মাথাটা আমার প্লেটে তুলে দিতেই বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ছিটকে সরে গেলাম টেবিল থেকে। মামা টিপে টিপে লেবুর রস মেশাচ্ছিলেন তাঁর গ্লাসে। আমাকে ওভাবে উঠে যেতে দেখে জিগ্যেস করলেন,

“কী হয়েছে হাসান? মাছ খাও না তুমি?”

আমি একদৃষ্টিতে মাথাটাকে দেখছি, সম্ভবত কাতলা, রান্নার ভাপে চোখ দুটো গলে মনি বেরিয়ে এসেছে। মুখটা একটু খোলা, একটা ফুলকপির টুকরো ঢুকে আছে সেখানে। মামা আবার বললেন,

“হাসান, শরীর খারাপ লাগছে?”

আমি টেবিল থেকে চোখ সরিয়ে মামার দিকে তাকিয়ে বললাম,

“এটা কি নারান দীঘির মাছ?”

“নারান দীঘিতে জাল ফেলবার কায়দা আছ নাকি? সেখানে রাজ্যের গাছপালা আর বাঁশ ফেলে রাখা। মঙ্গল নারায়ণ নিরুদ্দেশ হবার পর গুজব ছড়িয়ে পড়েছিলো তিনি ঘড়া ঘড়া মোহর লুকিয়ে রেখেছেন এখানে। গুপ্তধন শিকারিদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য বাবা ভেবেছিলেন দীঘিটা বুজিয়ে ফেলবেন। কিন্তু এতো বড় দীঘি বুজিয়ে ফেলা কি চাট্টিখানি কথা! ওইরকম আরেকটা দীঘি কাটতে হবে। শেষমেশ বুদ্ধি করে পুব দিকের জঙ্গলটা সাফ করে সব গাছপালা এনে ফেললেন পানিতে। রাইসু হারামজাদা যে কোন আক্কেলে তোমাকে নারান দীঘিতে মাছ ধরতে নিয়ে গেলো! এই কাতলাটা সোনাদীঘির। দক্ষিণের মাঠটা পেরিয়ে এই ধর মাইল খানেকের হাঁটা পথ।”

“জ্বর মুখে মাছ দেখে বমি পাচ্ছে মামা। আমি বরং একটু শুয়ে থাকি গিয়ে।”

ঘরে ফেরার পথে দেখি রাইসু ঠায় দাঁড়িয়ে দরজার পেছনে, মন দিয়ে এক গোছা পাট পাকিয়ে পাকিয়ে দড়ি বানাচ্ছে। আমি ওকে একপাশে ডেকে নিয়ে জিগ্যেস করলাম,

“আমি পানিতে পড়ে গিয়েছিলাম কীভাবে রাইসু?”

রাইসু কি একটু দ্বিধা করলো! নাকি আমার মনের ভুল? আঙুল দিয়ে পাটের গোছাটা খুঁটতে খুঁটতে বললো,

“বঁড়শি সন্দ করি জংলায় গিয়া বিনছিলো, আফনে ভাবছিলেন মাছে আদার গিলছে। ফালদা বসাত্থন খাড়াইয়া টান দিতে গেছিলেন হাছন বাই। রইদে কাহিল আছিলেন মনে অয়, মাতা গুইরা খাড়াত্থন দুপ্পুস কইরা দিগিত গিয়া পড়লেন।”

“কিন্তু মামা যে বললেন আমি সাঁতার কাটতে নেমেছিলাম?”

“আমিই উনারে কইছি। উনার অনেক রাগ।”

“বুঝলাম। তারপর কী হয়েছিলো?”

“জংলায় ঠ্যাং আটকাইয়া গেছিলো। আমি টাইনা তুলতে তুলতে পানি গিল্লা ফেলছিলেন বেশুমার।”

“আমার ঘরে বাতাস করছিলো একটা মেয়ে। কে সে?”

“উনি আমার পরিবার।”

“তোমাদের ছেলে পুলে নাই?”

“উনি বাঁজা।”

“এই গ্রামের অন্য বৌরাও কি তাই?”

“হ হাছন বাই। কাৎলাসেনের বাতাসে দুষ আছে।”

“বলো কী? তাহলে এরা এখানে থাকছে কেন?’

“এরা সব বিদেশি মানুষ, থাহনের জায়গা নাই। আফনের মামায় নিয়া আসে, জমি দেয়, কাম দেয়। কেউ থাহে, কেউ আবার বাউ চক্কর বুইজ্জা সুমায় সুমায় চইলা যায়। গেলে কী! দ্যাশে মাইনসের অভাব আছে?”

“তুমি কতদিন ধরে আছো?”

“মেলা দিন।”

“চলে যাওনা কেন?”

“কই যাইবাম?”

“হুম।”

কী অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার! গ্রামের বাতাসে নাকি দোষ আছে। এই যুগেও এমন কুসংস্কার! কিন্তু বছরের পর বছর ধরে যা ঘটে চলেছে তাকে কুসংস্কার বলেই বা উড়িয়ে দিই কী করে?
ঘরে ঢুকে বালিশে মাথা রেখে চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অরণির ডাকে ঘুম ভাঙলো। একবাটি স্যুপ নিয়ে এসেছে। টেবিলের উপরে বাটিটা রেখে বললো,

“গ্রাম দেখার সাধ মিটেছে তোমার হাসান? কী ভয়ই না পাইয়ে দিয়েছিলে। ছুটিটা পুরো মাঠে মারা গেলো। আমি বলি কী, আর থেকে কাজ নেই। কাল সকালে চল বেরিয়ে পড়ি।”
“আচ্ছা অরণি, তুমি তো ছোটো বেলায় এ বাড়িতে এসেছো। ভূত টুত চোখে পড়েছে কখনো?”
“কী চোখে পড়েছে!”

“ভূত, তুমিই তো সেদিন বলছিলে এই গ্রামে সমস্যা আছে।”

“সমস্যা বলতে আমি ভূত বুঝিয়েছি কে বললো?”

“ভূত বোঝাওনি!”

“না। এই গ্রামে বাচ্চা জন্মায় না সেই কথা বুঝিয়েছিলাম। এখন জানতে চেওনা কেন জন্মায় না। আমি বিজ্ঞানী নই, ওঝাও নই।”

“ও, আচ্ছা।”

“কেন, তুমি কি ভূত টুত কিছু দেখেছো?”

“না দেখিনি। তবে বাড়িটা কেমন ভুতুড়ে, তাই না?”

আমি নিশ্চিত অরণি সত্যি বলেনি। রাইসুও একটা কিছু গোপন করে যাচ্ছে। সকালে মামা ভাগ্নিতে কী নিয়ে এতো বাদানুবাদ হচ্ছিলো? কী হতে চলেছে আজ রাতে!

খেতে বসতে বসতে রাত হয়ে গেলো অনেক। অনিন্দ্য আগেই খেয়ে নিয়ে আরাম কেদারায় গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছে। বিশাল টেবিলের এক প্রান্তে জামান মামা, দুপাশে আমি আর অরণি। দেয়াল দেয়ালে তির তির করে কাঁপছে তেলের বাতি। এদিক ওদিক ছায়ার মতো হেঁটে বেড়াচ্ছে দুতিনজন খানসামা। দরজার পর্দায় শীর্ণ আরেকটি ছায়া, রাইসু, বরাবরের মতো দাঁড়িয়ে বাইরে। টেবিলে মাছের কোন পদ নেই দেখে শান্তি পেলাম। মামা খেতে খেতেই আমাদের ফিরে যাবার প্রসঙ্গটা তুললেন,

“হাসান, অরণি বলছিলো তুমি নাকি কাল সকালেই চলে যেতে চাও? আরও কটা দিন থেকে গেলে এই বুড়ো মানুষটার বড় ভালো লাগতো। অবশ্য চলে যেতে চাওয়াটাই স্বাভাবিক, এখানে থাকা তোমার জন্য সুখকর হয়নি।”

অরণি আমার মতামতের জন্য অপেক্ষা না করেই বলে দিয়েছে আমরা চলে যাচ্ছি। আমি পানির গ্লাসটা হাত থেকে নামিয়ে বললাম,

“যেতে তো চাইছি মামা, কিন্তু পারবো বলে মনে হয় না। মাথাটা এখনো কেমন ঝিম ঝিম করছে। এই শরীরে এতোটা পথ ড্রাইভ করা কি ঠিক হবে? আমরা বরং পরশু যাই। ততক্ষণে ঠিক হয়ে যাবো নিশ্চয়ই।”

অরণির নার্ভের প্রশংসা না করে পারছি না। এক মনে খেয়ে চলেছে যেন কিছুই হয়নি। মামাকে দেখে মনে হচ্ছে তাঁর গলায় পানি আটকে গিয়েছে। আমতা আমতা করে বললেন,

“কাল যেতে চাইছো না! সে কি করে হয়, আমি তো…”

“কোন সমস্যা মামা?”

“না না, সমস্যা কিসের? সমস্যা আবার কী?”

ঘুমুতে যাবার আগে মশারি গুঝতে গুঁজতে অরণিকে বললাম,

“আমাকে জিগ্যেস না করেই যে মামাকে বলে দিলে আমরা কাল চলে যাচ্ছি?”

অরণি অনিন্দ্যর গায়ে লেপ টেনে দিতে দিতে বললো,

“তোমাকে তো জানিয়েছিলাম!”

“কিন্তু আমি তো তোমাকে হ্যাঁ কিম্বা না কিছু বলিনি।”

“যেতে চাচ্ছো না, যেওনা। এই নিয়ে রাত দুপুরে ঝগড়া করে এখন?”

“না না, ঝগড়া করবো কেন? তোমাদের কাৎলাসেনে ঝগড়া বলে কিছু হয় আবার!”

অরণি পাল্টা জবাব না দিয়ে পিঠ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়েছে।

সারাদিনের ক্লান্তিতে চোখ ঢুলে আসছে আমারও।

গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটা বেজে উঠলো, ঢং ঢং করে বেজেই চলেছে। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ,………………। আমি কি ঘুমিয়ে যাচ্ছি?

পাঁচ।।

খুট করে একটা শব্দ হলো কোথাও। শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে আমার। চেয়ে দেখি অনিন্দ্য ওর একটা পা আমার বুকের উপরে তুলে ঘুমাচ্ছে। ঘরের কোনের দেয়ালে তেলের বাতির তেল ফুরিয়ে এসে অর্ধেক প্রায়। কটা বাজে এখন! অরণিকে দেখছিনা কেন?

আলগোছে ছেলের পা সরিয়ে দিয়ে খাট থেকে নামলাম। ঘরের সাথেই লাগোয়া বাথরুম, অরণি সেখানে নেই। তবে কি ঘরের বাইরে! অনিন্দ্যকে একলা রেখে বারান্দায় যাবো নাকি একবার?

দরজার হাতল ধরে টান দিতেই বুঝলাম বাইরে থেকে তালা লাগানো।

কী করব বুঝতে পারছি না, মাথা পুরো এলোমেলো হয়ে গিয়েছে আমার। অরণির দিকের মশারিটা পরিপাটি করে গুঁজে রাখা। যেখানেই যাক নিজের ইচ্ছেতেই গিয়েছে সে। কিন্তু ঘরের দরজায় তালা কেন! একটা সিগারেট ধরাতে পারলে ভালো হতো, অনিন্দ্যকে ঘরে রেখে সেটা সম্ভব নয়। বাথরুমে একটা ছোট্ট জানালা আছে, তার পাশে দাঁড়িয়ে ধরালে কেমন হয়! অনিন্দ্যর মুখের দিকে তাকালাম একবার, নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে আমার ছেলে। সকালে ওর কথা কী যেন বলছিলেন জামান মামা।

বাথরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে বেনসনের প্যাকেটটা বের করতেই একটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ ভেসে এলো কানে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বাড়ির গেটটা খুলে গিয়েছে, তিনটে ছায়ামূর্তি প্রবেশ করেছে আঙিনায়। অন্ধকারে তাদের মুখ দেখতে পাচ্ছিনা, অস্পষ্ট তিনটে অবয়ব কেবল, একজনের পদক্ষেপ কিছুটা অসংলগ্ন, তাকে ধরে ধরে নিয়ে আসছে অন্য দুজন। কারা এরা! কী করছে এতো রাতে?

হাতের প্যাকেটেটা পকেটে রেখে দিলাম। অন্ধকারে চোখ সয়ে এসেছে বেশ। আগে খেয়াল করিনি, এখন চোখে পড়লো আরেকটা দরজা রয়েছে বাথরুমে। হালকা করে চাপ দিতেই খুলে গেলো। একটা গন্ধ টের পাচ্ছি, মিষ্টি মিষ্টি, তবে ঝাঁঝালো নয়। গন্ধটা এ বাড়িতে আগেও পেয়েছি, কিন্তু কোথায়! হোঁচট খেয়ে সামলে নিতে নিতেই মনে পড়ে গেলো এটা সেই ছবির ঘর, গন্ধটা তুঁতের। আর্দ্রতা কমানোর প্রাচীন পদ্ধতি, ছবি যাতে নষ্ট না হয়।

এই ঘরে কোন জানালা নেই, মেঝের দিকে চোখ রেখে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে চলছি, হঠাৎ দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পিছিয়ে এসে মাথা তুলে দেখি চোখের সামনে কালীনাথ রায় দাঁড়িয়ে। আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে তিনি, চোখদুটো দপদপ করছে যেন জ্বলন্ত কয়লা। কেমন করে যে নাভির নিচ থেকে উঠে আসা আর্তনাদটাকে সামাল দিলাম বলতে পারবো না। কোন ক্ষণজন্মা শিল্পী এঁকেছিলেন এই ছবি! তেলরঙের সাথে ফ্লুরোসেন্ট মিশিয়ে কোন সে জাদুকর দুই শতাব্দী আগে পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাওয়া দাপুটে জমিদার কালীনাথ রায়কে এমন জীবন্ত করে হাজির করে দিয়েছেন আমার সামনে?

এই ঘরের দরজাতেও তালা দেয়া। কিছু একটা হচ্ছে কালীনাথ রায়ের বাড়িতে। কিছু একটা যার সাথে আমার ছেলের ভবিষ্যৎ জড়িত। আমাকে বের হতেই হবে। পুরনো বাড়িতে শুনেছি অনেক গোপন দরজা থাকে, জানালাহীন এই ঘরে তেমন কিছু কি নেই! একটা আলো থাকলে খুব ভালো হতো। আমার পকেটে একটা লাইটার আছে, কিন্তু জ্বালালে বাইরে বোঝা যাবে। গায়ের চাদরটা খুলে ভালো করে দরজার নিছে ঠেসে দিলাম, এইবার কোন চিন্তা নেই আর।

কতক্ষণ ধরে হাতড়ে বেরিয়েছি বলতে পারবো না। কোথাও কিছু না পেয়ে হাল ছেড়ে দেবো কিনা ভাবছি, এমন সময় চোখে পড়লো নারায়ণ মঙ্গলের ছবির পায়ের কাছে একটা জং ধরা ছোট্ট একটি আংটা। টান দিতেই মেঝেটা থরথর করে কেঁপে উঠলো। পেছন ফিরে দেখি কালীনাথ রায়ের ছবিটা একপাশে সরে গিয়েছে, কুকুরটা যেখানে ছিলো সেখানে একটা সুড়ঙ্গ। কে জানে কতকাল বন্ধ ছিল এই পথ, ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস জমে থাকা বিচিত্র নয়। উবু হয়ে ভেতরটা দেখতে গিয়ে টাল হারিয়ে পড়ে গেলাম ভেতরে।

বাচ্চাদের খেলার পার্কে যেমন স্লাইড থাকে তেমনি করে বানানো জমিদারদের পালিয়ে যাবার গোপন এই রাস্তা। এক ধাক্কায় সাঁই সাঁই করে নেমে গেলাম অনেক খানিক, পড়তে পড়তেই খেয়াল করলাম একটা জায়গায় এসে বাঁক নিয়েছে স্লাইড। আর তখনই টের পেলাম পায়ের নিচ ঘেঁষে নরম নরম কী যেন একটা ছুটে গেলো কিলবিল করে। ইঁদুর!!

আতংকে লাফিয়ে উঠতে গিয়েই সুড়ঙ্গের দেয়ালে ঠোকর খেলাম, তালুটা বুঝিবা ফেটেই গেলো। ওদিকে পিছলে পড়া যেন আর শেষ হচ্ছে না। কয়েক মুহূর্ত পরেই আলোর তীব্র ছটায় চোখ ধাধিয়ে গেলো আমার, উপর থেকে আছড়ে পড়েছি একটা পাথুরে মেঝেতে।

একটা ঘর। ঘরের ভেতরে পাঁচজন মানুষ। লম্বা একটা টেবিলের দুপাশে দাঁড়িয়ে দুজন। কেউ একজন নিশ্চল হয়ে পড়ে আছে টেবিলের উপর। কাফনের কাপড়ের মতো ধবধবে সাদা চাঁদরে ঢাকা সেই দেহটির মাথার কাছে চেয়ারে বসে জামান মামা, পায়ের কাছে অরণি। মামার হাতে একটি কাঁসার গ্লাস। সদ্য পান করা কোন পানীয়ের লালচে একটি ধারা মামার ঠোট গড়িয়ে চিবুকে এসে স্তব্দ হয়ে আছে।

আমি টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়ে চীৎকার করে বললাম,

“কী হচ্ছে এখানে?”

বন্ধ ঘরের পাথুরে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হলো আমার প্রশ্ন।

দাঁড়িয়ে থাকা দুজনের একজন দৌড়ে এসে ঘাড় ধরে আমাকে শূন্যে তুলে ধরলো। পাটকাঠির মতো টিংটিঙে রাইসুর গায়ে এতো জোর!

হঠাৎ ঘরের কোন থেকে কে যেন বলে উঠলো,

“বাবা”।

অনিন্দ্যর সেই টিয়া পাখি। পাখিটাকে দেখে কোত্থেকে যেন দারুণ একটা শক্তি চলে এলো আমার শরীরে। ধাক্কা দিয়ে রাইসুকে সরিয়ে খামচে ধরলাম অরণির কাঁধ।

মামা গ্লাসটা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে মুখ তুলে বললেন,

“বোসো হাসান।”

অরণির পাশের চেয়ারটায় বসলাম। রাইসু আর ওর বউ হেঁটে হেঁটে চলে গেলো দরজার দিকে।

“নতুন কোন গল্প বলবে না মামা। হাসানের অধিকার রয়েছে সব কিছু জানার। ও অনিন্দ্যর বাবা।”

মামা আঙুল দিয়ে ইশারা করে রাইসুকে ডাকলেন। রাইসু এসে শুয়ে থাকা মানুষটার কানের কাছে তুড়ি বাজাতেই টেবিল থেকে আলগোছে নেমে পড়লো সে। চাদর খসে পড়েছে মাটিতে। অল্প বয়সি একটা মেয়ে। পেটের দিকে খানিকটা উঁচু। মেয়েটি সন্তানসম্ভবা।

মামা বলতে শুরু করলেন,

“নারায়ণ মঙ্গলের দুই ছেলে, হারান মঙ্গল আর কমলেশ মঙ্গল। মঙ্গলরা থাকতেন উপর তলায়, নিচতলার একটা পাশে পরিবার পরিজন নিয়ে আমার বাবা, অন্য পাশে বিভিন্ন ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আত্মীয়-অনাত্মীয় সব আশ্রিতের দল। বাড়ির বাইরের লাগোয়া ঘরটায় থাকতো রাইসু আর ওর বউ।”

“রাইসু! ওর তো বয়স…”

“ছিয়ানব্বই হতে চলল, বউয়ের চুরাশি। দাঙ্গার পর আশ্রিতের দল একে একে এদিক ওদিক পাড়ি জমালে বাড়িটা প্রায় খালি হয়ে যায়। জমিদারি প্রথারও ততদিনে অবসান ঘটেছে। অবশ্য জমিদারির আয় নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামানোর প্রয়োজন কখনও পড়েনি নারায়ণ মঙ্গলের। তাঁর ছিল পাটের কারবার। গঞ্জের গুদারাঘাট থেকে বড় বড় নৌকায় করে পাটের চালান যেতো একেবারে কলকাতা পর্যন্ত। আশেপাশের হিন্দু বসতিগুলো উজাড় হয়ে যাওয়ায় মানসিক ভাবে খুব ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। একদিন আমার বাবাকে ডেকে বললেন তীর্থে যাবেন। পালকি সাজলো, নৌকা রাঙলো, তারপর কার্তিক মাসের এক পূর্ণিমার রাতে তিনটে গয়না নৌকায় করে মঙ্গলেরা ভাসলেন ব্রহ্মপুত্রে। গ্রামের লোকেরা তাই জানে। কিন্তু আসল ঘটনা অন্য।

আমার বাবা খুব একটা সুবিধার মানুষ ছিলেন না। জমিদারদের দেওয়ানেরা যেমন হয় আরকি। তবে বিশ্বস্ত যে ছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। কুড়ি বছর ধরে নারায়ণ মঙ্গলের দেওয়ান তিনি। দেখতে আপাদমস্তক ভালো মানুষ, সদালাপী-সজ্জন, লোকে সম্মান করতো। নিজের হাত পরিষ্কার রেখে দুষ্কর্ম সব করাতেন রাইসুকে দিয়ে।

বাড়িটা কী সুন্দর, তাইনা হাসান! কত ঘর, কত খিলান, কত আসবাব! বৈঠকঘরের সামনের খোলা জায়গাটায় আমরা কড়ি খেলতাম জানো! আমি, হারান আর কমলেশ, কমলেশটা ছিলো ছোটো, ভারি ছিঁচকাঁদুনে। হারান ছিলো আমারই বয়সি। এই বাড়ির তালাবন্ধ কোন একটি ঘরের মেঝের তলায় ওরা ঘুমিয়ে আছে। ঘুমিয়ে আছেন নারায়ণ মঙ্গল, গিন্নিমা, ননী পিসি, অমল কাকু, আর নবীন জ্যেঠু।

সে ঘটনার মাস খানেক পরের কথা। আমার বাবা অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলেন। খুব ছোট্ট, কিন্তু কেমন যেন হাড় হিম করে দেওয়া স্বপ্ন সেটি। কালীনাথ রায় তাঁকে বলছেন, ‘বছরে চার বার।’। সকালে রাইসু এসে জানালো একই স্বপ্ন সেও দেখেছে। প্রতি রাতে কালীনাথ রায় তাঁদের স্বপ্নে এসে দেখা দেন, কুকুরটাকে নিয়ে আসেন সাথে, মাথার পেছনে দাঁড়িয়ে একঘেয়ে স্বরে বলে চলেন, ‘বছরে চার বার’। কিছু একটা করার কথা বলছেন তিনি, কিন্তু কী!

মঙ্গলনাশের এক বছর পূর্তির দিন সন্ধ্যাবেলা বাবা আর রাইসু এই ঘরটিতে পুরনো দলিল দস্তাবেজ ঘাঁটাঘাঁটি করছিলেন। কাজ শেষ করে চলে যাবেন এমন সময় এই কাগজটা দেখতে পান তাঁরা। এই নাও, পড়ে দেখো।”

জামান মামা কাঁপাকাঁপা হাতে বহুদিনের পুরনো একটা দলিল এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। পার্চমেন্টের উপর লাল কালি দিয়ে লেখা একটি চিঠি-

“খাতক- মিয়া মোহাম্মদ জ্বালাল উদ্দিন এবং তদীয় বংশধরবৃন্দ
সাং- কাৎলাসেন
তাং- আঠারোই কার্তিক, বাঙ্গালা তেরো’শ চুয়ান্ন………………

বড় অদ্ভুত সে চিঠি, ঠিক চিঠি নয়, পাকা মুহুরির হাতে লেখা মহাজনের দাদন পত্র যেন। প্যাঁচানো প্যাঁচানো লেখা, বাংলা হরফেই, কিন্তু ধরনটা আমার অচেনা। জামান মামা কাগজটা আমার হাত থেকে নিয়ে বললেন,

“পড়তে না পারলে থাক। সারমর্মটা আমি বলছি। এটা একটা চুক্তি পত্র। কালীনাথ রায়ের সাথে আমার বাবা জালাল উদ্দিন এবং তাঁর বংশধরদের। চুক্তির শর্ত অক্ষরে পালন না করলে রক্তক্ষয়, লোকক্ষয়। বাবা প্রথমে ভেবেছিলেন কেউ হয়তো ভয় দেখানোর জন্য কোনভাবে এইঘরে চিঠিটি রেখে গিয়েছে, কেননা কালীনাথ রায় গত হয়েছেন মঙ্গলনাশের পৌনে দু’শ বছর আগে। কিন্তু সেটাই বা কী করে সম্ভব! ঘরের চাবি থাকে বাবার কোমরে। আর তাছাড়া, যে ঘটনার সূত্র ধরে এই চুক্তি সেই ঘটনার কথা বাবা আর রাইসু ছাড়া তৃতীয় কেউ জানেনা। রাইসুর অক্ষরজ্ঞান নেই, বাবা চুক্তির কথা গোপন রেখে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

আমার মা মারা যান সে বছরের পৌষ মাসে। চৈত্র সংক্রান্তির তিন সপ্তা আগে যায় আমার দুই ভাই, ওরা ছিল যমজ। সংক্রান্তির দিন সকাল থেকেই অরণির মা’র ভীষণ জ্বর। থেকে থেকে বমি হচ্ছে, ক্ষণে ক্ষণে উল্টে আসছে চোখ, ঘামে ভিজে গিয়েছে সারা শরীর। সে ঘামের রং লাল, রক্তের মতো। একই আসুখ হয়েছিলো আমার মা আর ছোটো দুই ভাইয়ের।

বাড়ি থেকে সবাইকে বের করে দিয়ে বৈঠকখানায় গিয়ে খিল দিলেন বাবা, হাতে সেই চুক্তিপত্র, একশ বছরের চুক্তি, ভয়ংকর তার শর্ত। স্ত্রীকে হারিয়েছেন, ফুলের মতো ফুটফুটে দুই ছেলেকে গোর দিয়েছেন নিজের হাতে, তবুও সই করেননি মিয়া মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন।

কাৎলাসেন গ্রামে তখন রাত নেমে এসেছে। তেলের বাতির কাঁপাকাঁপা আলোয় কাঁপাকাঁপা হাতে সাক্ষর করলেন আমার বাবা। অমনি ঘরের ভেতর একটা বাতাস খেলে গেলো। সে বাতাসে কেমন যেন নোনা ধরা গন্ধ। গন্ধ মিলিয়ে যেতেই ঘরের দরজা ভেঙে মত্ত ষাঁড়ের মতো রাইসু এলো। মিয়া মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আতংকে হিম হয়ে গেলেন। রাইসু নির্মম, কিন্তু সে তাঁর দাসানুদাস। উঠতে বললে ওঠে, বসতে বললে বসে। আজকের রাইসুকে তিনি চেনেন না। চোখে শূন্য দৃষ্টি, ঠোঁট দুটো বেয়ে লালা ঝরছে, রাইসু ডান থেকে বাঁয়ে, বাম থেকে ডানে দুলে চলেছে ওই গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের পেন্ডুলামের মতো। রাইসুর গায়ে লাশের গন্ধ। এক হাত দিয়ে বাবার ঘাড়টা চেপে ধরে শূন্যে তুলে রাইসু ছুটলো, এই ঘরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে বেরিয়ে গেলো আবার। চৈত্রের তীব্র গরমে তালা বন্ধ ঘরের মেঝেতে স্থাণু হয়ে বসে রইলেন বাবা। তাঁর খুব শীত লাগছে। তিনি জানেন কী হতে চলেছে এখন। কালীনাথ রায়ের চুক্তি থেকে মুক্তি নেই তাঁর।

কিছুক্ষণ পর রাইসু ফিরে এলো, একা আসেনি। সাথে করে নিয়ে এসেছে তার বউটিকে। মেয়েটির পেট পূজার ঢাকের মতো উঁচু, কিছুদিন পর বাচ্চা হবে ওর। মেয়েটি কাঁপছিল ফাঁদে আটকে পড়া হরিণ শিশুর মতো। কিন্তু মুখে কোন কথা নেই, চোখে নেই বোধের কোন চিহ্ন।

এই যে আমার হাতে কাঁসার গ্লাসটা দেখছো, ওতে কী ছিলো জানো, রক্ত! সন্তান সম্ভবা মায়ের রক্ত। এটাই চুক্তির বিধান। বছরে চারবার, দিনক্ষণ সব নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। আমাদের রক্তের লেখন, চাইলেও এড়ানোর উপায় নেই। এই একটা দিন রাইসু মানুষ থাকেনা।

বউটির আর মা হওয়া হয়নি। এই গ্রামে কেউ মা হয় না হাসান। মিয়া মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন নির্বংশ করেছিলেন মঙ্গল নারায়ণকে। সেই পাপের দায় চুকিয়ে চলেছে কাৎলাসেন। রাইসু মরে না, মরেনা ওর বউ। বছরে চার বার গ্রাম ঢুঁড়ে নিয়ে আসে সন্তান সম্ভবা কোন মেয়েকে, আবার পৌঁছে দিয়ে আসে, ওরা জানতেও পারেনা পেটের বাচ্চাটি কেন আর বাড়লো না। শুধু মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরে ভয়ংকর সব স্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে, এক সময় গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। জায়গা নিতে আসে নতুন লোক। আরও আঠাশ বছর বাকি। ততদিন বাঁচবো তো! নইলে…”

“নইলে কী?”

“আমার বাবা দীর্ঘজীবী ছিলেন। মারা যাবার সময় তাঁর বয়েস হয়েছিলো একানব্বই। শেষের দিকে চুক্তির শর্ত পালন করার মতো শারীরিক অবস্থা তাঁর আর ছিলো না। আমি তখন অ্যামেরিকায়। একদিন কাজ থেকে বাসায় ফেরার পর মাথাটা কেমন যেন ঘুরে উঠলো। মনে হলো, ঘরের ভেতর একশোটা সূর্য জ্বলছে। সব বাতি বন্ধ করে বসে রইলাম, বসা অবস্থাতেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। ঘুমের মধ্যে কালীনাথ রায় এলেন, সাথে সেই নরকের কীট কুকুরটা। বললেন, ‘বছরে চারবার’। পরেরদিন, তারপরের দিন, দিনের পর দিন স্বপ্নাদেশ চলতে থাকলো। ওদিকে আমার অসুখটা ততদিনে আরও বেড়েছে, কিছুতেই ইলেকট্রিকের আলো নিতে পারি না। কত ডাক্তার দেখালাম, চোখের ডাক্তার, মাথার ডাক্তার, এমনকি পাগলের ডাক্তার। কেউ কিছু করতে পারেনি। শেষমেশ দেশে ফিরে এলাম। কিছুদিন পর বাবা মারা গেলেন। আমার জন্য একটা বাক্স রেখে গিয়েছিলেন। ভেতর তাঁর রোজনামচা, আর এই চুক্তিপত্রটি।

এমন আজগুবি গল্প বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই, আমিও করিনি। একদিন অরণির মার চিঠি পেলাম। বোন আমার মৃত্যু শয্যায়, কী একটা কঠিন অসুখ হয়েছে তার। গিয়ে দেখি সেই অসুখটা, খুব ছোটবেলার কথা, কিন্তু ঠিকঠিক মনে পড়ে গেলো আমার। আমি জানি এর পর কী হবে। প্রথমে যাবে মা, তারপর মেয়ে। অরণির চোখের দিকে আর তাকাতে পারি নি। ওই দুপুরেই কাৎলাসেন ফিরে এসে সই করে দিলাম। এই যে দেখো, বাবার স্বাক্ষরের পরেই আমার স্বাক্ষর। একদিন রাইসু এলো। সেই রাইসু, যার কোলে পিঠে চরে আমি বড় হয়েছি। অ্যামেরিকায় যাবার আগে যেমন দেখেছি ঠিক তেমনি আছে! বউটিও তাই। বছরে চারদিন আমি রাইসুর অধীন। চুক্তি শেষ হওয়া অবধি রাইসু আর ওর বউয়ের মরণ নেই। সে চেষ্টা আমি করে দেখেছি। বাবাও করেছিলেন।

আমাকে আরও আঠাশ বছর বেঁচে থাকতে হবে হাসান। কালীনাথ রায়ের খাতক আমরা। এই বীভৎস চুক্তি থেকে মিয়া মোহাম্মদ জালাল উদ্দিনের উত্তর প্রজন্মের কোন মুক্তি নেই। হাত দিয়ে টেনে দেখো, ছিঁড়তে পারবে না। কতবার চেষ্টা করেছি পুড়িয়ে ফেলতে, কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলতে! ”

জামান মামা তাঁর মাথাটা চেয়ারের হাতলে রেখে অবোধ শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠলেন। কেঁপে কেঁপে জ্বলছে তেলের বাতি। অনিন্দ্যর টিয়া পাখিটা খাঁচার দ্বারে বসে ঝিমুচ্ছে। অরণি মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে মেঝের দিকে। একটা অবাস্তব পৃথিবীতে চলে এসছি আমি। এই পৃথিবীটা সত্য নয়। আমি কখনও কাৎলাসেনে আসিনি। আমি একটা দুঃস্বপ্ন দেখছি। কেউ একজন এসে যদি স্বপ্নটা ভাঙিয়ে দিতো!

আমি অরণির দিকে ফিরলাম। কাটা কাটা গলায় বললাম,

“তুমি জানতে এসব?”

“হু”

“কেমন করে জানলে?”

“আমি তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি। মা’র সাথে কাৎলাসেনে বেড়াতে এসে নারান দীঘিতে নাইতে নেমেছিলাম একবার। তখনই হারানকে দেখি, কমলেশকেও। তারপর তোমার মতো আমারও অমন জ্বর হলো, জ্বরের ঘোরে হাঁটতে হাঁটতে কেমন করে যেন সুড়ঙ্গটা গলে চলে এসেছিলাম এই ঘরে। নানার ডায়েরিটা পেলাম, দেখলাম সেই চুক্তিপত্রটা। ওদিকে আমাকে কোথাও না পেয়ে বাড়িতে তখন তোলপাড়। আর আমিও জ্বর গায়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম এই ঘরটাতে। ঘুম ভেঙে দেখি শোবার ঘরে মামা আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে। মামাকে ডায়েরি আর চুক্তির কথা বলতেই হো হো করে হেসে উড়িয়ে দিলেন, বললেন স্বপ্ন দেখেছি। ছোটবেলার এই ঘটনা ভুলে গিয়েছিলাম, কেবল মনে ছিলো একটা খটকার কথা, এই গ্রামে কারো কোন বাচ্চা কাচ্চা নেই। তুমি জ্বরের ঘোরে হারান আর কমলেশের নাম বিড়বিড় করতেই আমার সব মনে পড়ে গেলো। এবারে মামা আর স্বীকার না করে পারেন নি।”

এরা নিশ্চয়ই মিথ্যে বলছে। তৃতীয় শ্রেণির সিনেমার মতো বস্তাপচা একটা গল্প বলে ফেললেই হলো! আমার ধারণা জামান মামা মানসিক ভাবে অসুস্থ একটা মানুষ। মাঝেমাঝে পাগলামিটা চারা দিয়ে বসে। সেজন্যেই কাৎলাসেন ছেড়ে বাইরে কোথাও যান না। আর যদি এদের কথা সত্যি হয়, যেটা অসম্ভব, তাহলে তাঁকে আমার পুলিশে দেওয়া উচিৎ।

একটু ইতস্তত করে বললাম,

“মামা, এই ব্যাপারে আর কারও সাথে কথা বলেছেন আপনি?”

মামার দৃষ্টিতে গভীর একটা বেদনার ছাপ। বললেন,

“আমি জানি তুমি কী ভাবছ, জানাজানি হয়ে গেলে আমাকে জেলে যেতে হবে। যেতে আমার কোন আপত্তি নেই। এই অভিশপ্ত জীবনের চেয়ে আজীবন বন্দীত্ব অনেক অনেক বেশি কাম্য আমার। সমস্যা একটাই, অনিন্দ্য। আমি মরে গেলে, কিংবা চুক্তির শর্ত পালন করতে শারীরিক ভাবে অক্ষম হলে পরবর্তী পুরুষের ঘাড়ে বর্তাবে চুক্তির বোঝা। এটাই রক্তের লেখন। আমাকে জেলে দিতে চাইলে দিতে পারো, কিন্তু তারপর যা হবে তার জন্যও তৈরী থেকো।”

“কোনই কি পরিত্রাণ নেই!”

“আছে। চুক্তি বাতিল করার ক্ষমতা রাখেন কালীনাথ রায়ের বংশধর। কিন্তু কোথায় পাবো তাঁদের!”

এ প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মামা আবার শুরু করলেন,

“অনেক বছর আগে অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটেছিলো। সুলতান এসেছিলেন আমার বাড়িতে।”

“সুলতান!”

“হ্যাঁ, সুলতান। নড়াইলের সুলতান, বিখ্যাত চিত্রকর। সপ্তাখানেক ছিলেন আমার আতিথ্যে। কালীনাথ রায়ের ছবিটা দেখে চমকে উঠলেন। বললেন, ‘এ ছবি কে এঁকেছে?’ আমি বললাম, শিল্পীর নাম তো জানিনা, দেড়শ বছরের পুরনো ছবি। সুলতান খুব অবাক হয়ে বললেন, ‘এই লোকটা, না ঠিক এই লোকটা নয়। প্রায় এইরকম দেখতেই একজন মানুষ এসেছিলেন আমার কাছে। পোর্ট্রেট আঁকাতে চাইলেন। আমি যদিও পোর্ট্রেট করিনা, কিন্তু সাবজেক্ট হিসেবে লোকটাকে দারুণ ভালো লেগে গিয়েছিলো। জাঁদরেল চেহারা, কী এক জমিদারের বংশধর যেন’। ফিরে গিয়ে লোকটার নামধাম পাঠিয়ে দেবেন বলেছিলেন, কিন্তু তার আগেই তো মরে গেলেন। কত যে ছবি সংগ্রহ করেছি আমি তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু সুলতানের আঁকা সেই ছবি আর পাইনি। ছবিটা পেলে……………।”

মামার কথা ফুরিয়েছে অনেকক্ষণ আগে। রাইসু আর ওর বউ হতভাগ্য মেয়েটিকে নিয়ে চলে গিয়েছে। আমরা তিনজন কেউ কারও দিকে না তাকিয়ে বসে আছি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতন। আমার ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। আমি জানি অরণিরও তাই, হয়তো মামারও। বাইরে কোথাও একটা মোরগ ডাকছে, ভোর হয়েছে। আরও একটি দিনের শুরু। অপেক্ষায় কাৎলাসেন।


Comments

অতিথি লেখক's picture

সম্পাদনার সুযোগ ছিলো, করে নিলাম। ধন্যবাদ মডারেটর।

----মোখলেস হোসেন।

অতিথি লেখক's picture

ওরে বাবা!! রীতিমত আতঙ্ক জাগিয়ে তোলার মত গল্প। অনেক অনেক ধন্যবাদ। তবে পড়তে পড়তে কেন জানি মনে হল গল্পটি হুমায়ুন আহমেদ দ্বারা প্রভাবিত।
সৌমিত্র বিশ্বাস

অতিথি লেখক's picture

কী সর্বনাশ! অপ্রকাশিত লেখা পড়ে ফেলেছেন সৌমিত্র বিশ্বাস! লেখাটা অতিথিদের বাইডাগ ঘরে পড়ে আছে মাসখানেকে হয়। অন্তত একজনের চোখে যে পড়েছে এতে আমি যারপরনাই আনন্দিত।পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

আমি যে সময়ে বেড়ে উঠেছি সেই সময়েই লেখক হিসেবে হুমায়ুন আহমেদের উত্থান এবং বিস্তার। আমাদের প্রজন্মের উপর তাঁর প্রভাব থাকাটা বিচিত্র নয়।

----মোখলেস হোসেন।

অতিথি লেখক's picture

Quote:
আমি যে সময়ে বেড়ে উঠেছি সেই সময়েই লেখক হিসেবে হুমায়ুন আহমেদের উত্থান এবং বিস্তার। আমাদের প্রজন্মের উপর তাঁর প্রভাব থাকাটা বিচিত্র নয়।

এ ব্যপারে আমার দ্বিমত নেই। তবে বড় কথা হল লেখাটা আমার ভাল লেগেছে। আশা করি আরো লিখবেন। ধন্যবাদ।

মন মাঝি's picture

বিশাল লেখা, সময় নিয়ে পড়তে হবে।
ট্যাগে "অপন্যাস" কেন? শব্দটা হুমায়ুন আজাদকে মনে পড়িয়ে দিল। উনিই মনে হয় ৮০-র দশকে এই শব্দটা প্রথম কয়েন করেছিলেন বা অন্তত জনপ্রিয় করেছিলেন। যদ্দুর মনে পড়ে, তাঁর এই "অপন্যাস" ট্যাগিং-এর টার্গেট ছিলেন মূলত হুমায়ুন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন এবং এই জাতীয় সেই সময়ের জনপ্রিয় এবং বাজারি লেখকরা ও তাদের লেখা। দুই হুমায়ুনে একসময় প্রচুর গলাগলি ছিল, পরে যা গালাগালিতে পর্যবসিত হয়। দুইজনের কেউই আজ নেই, কিন্তু দেখা যাচ্ছে "অপন্যাস"-টা রয়ে গেছে। মানুষ চলে যায়, কথা থেকে যায়। হাসি

****************************************

অতিথি লেখক's picture

অনেক কথাই তো বলা যায় এ প্রসঙ্গে মন মাঝি। সময় হলে লেখাটা পড়ে আপনিই বলুন অপন্যাস কেন বললাম।

----মোখলেস হোসেন

এক লহমা's picture

আপনার লেখার আকর্ষণ প্রবল। লম্বা গল্পে অনেক কিছু ধরেছেন।

--------------------------------------------------------

এক লহমা / আস্ত জীবন, / এক আঁচলে / ঢাকল ভুবন।
এক ফোঁটা জল / উথাল-পাতাল, / একটি চুমায় / অনন্ত কাল।।

এক লহমার... টুকিটাকি

অতিথি লেখক's picture

পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ এক লহমা। আমার তো মনে হচ্ছে বিকর্ষণ ক্ষমতাই প্রবল! লোকে পড়েনা।

---মোখলেস হোসেন

দীপ্ত's picture

আপনার লেখার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকি। গল্পটা দারুণ লেগেছে।

অতিথি লেখক's picture

আর আমি অপেক্ষায় থাকি আপনাদের জন্য। প্রতি দিন অন্তত একবার করে হাজিরা দিয়ে দেখে যাই কেউ পড়লেন কিনা। পড়ে কেউ গালি দিলেও ভালো লাগে, হা হা হা। অনেক ধন্যবাদ দীপ্ত, সময় নিয়ে দীর্ঘ এই লেখাটি পড়েছেন।

------মোখলেস হোসেন।

সোহেল ইমাম's picture

বেশ কিছুদিন সচলায়তনে ঢোকা হয়না। আজ ঢুকে দেখি কোন লেখাই মন টানছেনা। তখন আপনার লেখা খোঁজা শুরু করলাম। ভুল করিনি, মন্ত্রমুগ্ধের মত সময় কাটলো। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল চোখে দেখতে পাচ্ছি সব।

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

অতিথি লেখক's picture

অনেকদিন আপনার কোন লেখা নেই, নেই কোন খবর। ব্যাস্ততা কাটিয়ে উঠেছেন আশা করি। পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

---মোখলেস হোসেন

ashequr rahman's picture

সচলায়তনে আমি নতুন। এ গল্পটা আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে। লেখকের মুন্সিয়ানা আছে। কোনো অবাস্তবতা চোখে পড়েনি। অভিনন্দন লেখককে।

অতিথি লেখক's picture

আমিও নতুন। নতুনেরে নতুন না দেখিলে আর কে দেখিবে বলুন! সচলের সচল সময়টা আমি পাইনি। পুরনোরা নতুন লোকেদের লেখা খুব একটা পড়েন না, দীর্ঘ লেখা হলে তো কথাই নেই। কালে ভদ্রে এক দু'জন এসে হয়তো বলে যান, "এতো বড় লেখা!"। কিন্তু লেখাটা পড়েন কিনা তা আর জানা যায় না। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক। নতুনের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হতে সময় লাগে, সব সময় তা হয়ও না। পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

---মোখলেস হোসেন

Shimanta Roy's picture

অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে থাকি আপনার লেখার জন্য। আপনার গল্পের বিষয়বস্তুতে যেমন এক অমোঘ টান আছে, তেমনি ভাষায়ও আছে ঝরঝরে সাবলীলতা। একবার শুরু করলে তাই নিমেষেই সময়টা পার হয়ে যায়। আপনার লেখা ছোট হলে বরং হতাশ হই, যাহ শেষ হয়ে গেল! এই গল্পটা অবশ্য মোটামুটি লেগেছে। গল্পটা কি আরও বাড়বে? আপনার অন্যান্য সিরিজগুলির পরবর্তী কিস্তির জন্য তীর্থের কাক হয়ে আছি। শীঘ্রই ফিরুন।

-সীমান্ত রায়

অতিথি লেখক's picture

ধন্যবাদ সীমান্ত রায়। যতটুকু হবার কথা ছিল তার অর্ধেক লিখেছি। ভেবেছিলাম তিনটা টাইম লাইন ধরে এগুবো, কিন্তু আর ইচ্ছে করলো না। বড় লেখা মানুষ পড়ে না।

---মোখলেস হোসেন

Post new comment

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.