চক্রধামাঃ মায়ারাগ পর্ব-৫

শিশিরকণা's picture
Submitted by himika64 on Sat, 05/08/2017 - 5:29am
Categories:

আগের পর্বের লিংক
চাকতি জগতঃ জাদুর রঙ
চক্রাধামঃ জাদুর রঙ -পর্ব২
চক্রধামঃ মায়ারাগ - পর্ব ৩
চক্রধামাঃ মায়ারাগ (চলছে...) পর্ব-৪
এই ঘটনার কিছুদিন আগে কোন এক ভোরে আখ নদী বেয়ে একটা জাহাজ এসে মরপর্ক বন্দরের ঘোরপ্যাচওয়ালা অসংখ্য ঘাটের কোন একটায় নোঙর ফেলে। জাহাজের খোলে করে এসেছিলো গোলাপী মুক্তো, দুধবাদাম, ঝামা, এর নগরপিতার জন্য কিছু দাপ্তরিক চিঠিপত্র আঁখ এবং একজন মানুষ। এই মানুষটিই কানা হারুন এর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

কানা হারুন মুক্তাঘাট এ সকাল সকাল ভিক্ষা করতে হাজির হয়েছিলো। সে ল্যাংড়া ওয়াসিমের পাঁজরে গুতো দিয়ে নীরবে নির্দেশ করলো মানুষটির দিকে।

নবাগত বিদেশী ঘাটপারে দাঁড়িয়ে ঘর্মাক্ত খালাসীদের বিশাল পিতল মোড়া একটা সিন্দুক নামিয়ে আনা লক্ষ্য করছিলো। অপর একজন মানুষ, নিঃসন্দেহে কাপ্তান, তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। হারুন কানা হলে কি হবে, পঞ্চাশ পা এর মাঝে এক চিমটে সোনা থাকলেও তার অতীন্দ্রিয়তে ধরা পরে, তাই খালাসীদের ঘিরে হঠাৎ বড়লোক বনে যাবার তিরতিরে হাওয়াটা ঠিকই টের পাচ্ছিলো। তার ধারণা এক্কেবারে সঠিক ছিলো, কারণ সিন্দুকখানি রাজপথে নামানো মাত্রই নবাগত তার থলে খুললে ভেতর থেকে ধাতব মুদ্রার ঝিলিক দেখা গেল। অনেকগুলো মুদ্রা। স্বর্ণের। কানা হারুন এর শরীর জালি বেতের মত শপাং করে সোজা হয়ে গেলো, একটা শিষও বের হয়ে এলো ঠোঁট থেকে। ল্যাংড়া ওয়াসিমকে আরেকখানা ঠ্যালা দিলে, সে উঠে সুড়সুড় করে পাশের এক গলি ধরে শহরের প্রানকেন্দ্রের উদ্দেশ্য রওনা দিলো।

কাপ্তান জাহাজে উঠে বিদায় নিলে পরে ভিক্ষার পাত্র হাতে নিয়ে রাস্তার ঐপারে ঘাটের পাশে দাঁড়ানো দাঁড়ানো বিমূঢ় আগন্তকের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো কানা হারুন, মুখে লোভী দৃষ্টি। তাকে দেখা মাত্র নবাগত তাড়াহুড়ো করে তার টাকার থলিতে হাত ঢোকালো।

"আপনের দিনটা ভালো যাইবো, স্যার।" বলতে বলতে কানা হারুন ভালো করে আগন্তকের দিকে তাকালো। চার চোখ ওয়ালা একটা মুখ দেখে উলটো দৌড় দেবে এমন সময় আগন্তক তার হাত চেপে ধরলো, এবং বললো, "!" হারুন টের পেলো খালাসীরা জাহাজের রেলিং এ দাঁড়িয়ে তাকে দেখে হাসছে, কিন্তু একই সাথে তার অতীন্দ্রিয় টেকাটুকার যে আভাস দিচ্ছে তাও অস্বীকার করতে পারলো না। সে জমে গেলো সেখানে ছিলো সেখানেই। আগন্তক তার হাত ছেড়ে দিয়ে কোমরবন্ধনী থেকে বের করে আনা ছোট একটা কালো বই এর পাতা দ্রুত গতিতে উলটে এক পাতায় এসে থামলো। তারপর বললো, "হ্যালো।"

"কি?" জিজ্ঞেস করে শূণ্য দৃষ্টি উত্তর পেলো হারুন।
"হ্যালো?" নবাগত পুনরায় বলো, আগের চেয়ে উচ্চস্বরে এবং এতটাই সাবধানতা সহকারে, যে হারুন যেন আ-কার ও-কার গুলো ঝুলে থাকার টিং টিং শব্দ শুনতে পেলো।

"আপনারেও হ্যালো", হারুন কোনমক্রমে উত্তর দিলো। এবার নবাগত চওড়া হাসি দিয়ে আবার তার থলে হাতড়াতে লাগলো এবং অবশেষে একটা বিশালাকৃতি স্বর্ণমুদ্রা বের করে আনলো। মুদ্রাখানি আকৃতিতে আঁখ এর ৮০০০ আনা এর মুদ্রার চেয়ে একটু বড়, নকশা দেখে এর তুল্য মান ধারণা করতে না পারলেও মুদ্রার ভাষাখানি বুঝতে হারুনের কোনই অসুবিধা হলো না। মুদ্রাটি বলছে, আমার বর্তমান মালিকের একটু সাহায্য সহযোগিতা দরকার, তুমি যদি তা দিতে পারো, তাহলে তুমি আর আমি মিলে কোথাও গিয়ে একটু ফুর্তি টুর্তি করতে পারি।

ভিক্ষুকের ভাবভঙ্গিতে সূক্ষ্ণ পরিবর্তন আগন্তককের মনে আশা জাগালো। সে আবার বই এর পাতা উলটে বললো,
"আমি যেতে চাই একটি হোটেল, সরাইখানা, শুঁড়িখানা, বাসস্থান, পান্থশালা, পানশালা, ধর্মশালা।"
"কীইই! সবগুলাতে যাইতে চান?", হারুন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো।
"??" বললো আগন্তক।
হারুনের খেয়াল হলে তাদের ঘিরে এর মধ্যেই জেলেনী, ঝিনুক কুড়োনী আর অকম্মা মজা দেখা লোকজনের ছোট একটা জটলা তৈরি হতে শুরু করেছে। কাজেই স্বর্ণমুদ্রাখানি তার হাতছাড়া হবার আশংকায় তাড়াতাড়ি বললো, "দেখেন। আমার চেনা একটা ভালো শুঁড়িখানা আছে, চলবে?" সে অন্তত ঐ একখানা স্বর্ণমুদ্রা চায়, বাকিগুলো জমীর ব্যাপারী মেরে দিলে দিক। তাছাড়া ঐ আগন্তকের সাথের ঐ বিশাল সিন্দুকখানাতেও ভালোই সোনাদান আছে, আন্দাজ করলো হারুন।

চার-চোখো আবার তার বই এর দিকে তাকিয়ে বললো, "আমি যেতে চাই একটি সরাইখানা, বিশ্রামের জায়গা, শুঁড়িখানা..."
"হ্যা হ্যা, বুঝেছি। চলেন আমার সাথে", হারুন তাড়াতাড়ি একটা বোঁচকা তুলে রওনা দিলো। এক মূহুর্ত ইতস্তত করে আগন্তকও তার পিছে রওনা হলো। হারুনের মাথার ভিতরে দ্রুত অনেকগুলো চিন্তা খেলে গেলো। তার কপাল নির্ঘাত আজকে ভালো, নবাগতকে এত সহজে ঢোলভাঙা তে যেতে রাজি করানো গেলো। জমীর ব্যাপারীর থেকে কিছু বখশিশ তো মিলবে। তার নতুন শিকারটি নরম সরম মনে হলেও কেন যে তার মনের ভিতর খুতখুত করছে, কিছুতেই বের করতে পারলো। মুখের সামনে চ্যাপ্টা স্বচ্ছ দুটো বাড়তি চোখ দেখতে অদ্ভুত লাগলেও অস্বস্তিটা সেজন্য নয়। সে আবার পিছে তাকালো।

ছোটখাট মানুষটা আশেপাশের সবকিছু অতি আগ্রহ নিয়ে দেখতে দেখতে রাস্তার মাঝ বরাবর দুলকি চালে হাঁটছে। কিন্তু তার পিছেই যা দেখলো তাতে হারুনের খাবি খাবার উপক্রম হলো। একটু আগেও ঘাটপারে পড়ে থাকা বিশাল কাঠের সিন্দুকখানা তার মনিবের সাথে তাল মিলিয়ে হেলেদুলে এগোচ্ছে। খুব ধীরে, নিজের হাটুর কাঁপুনি সামলে হারুন আস্তে করে উবু হয়ে সিন্দুকের নিচে উঁকি দিলো।

অনেক, অনেকগুলো ছোট ছোট পা সিন্দুক থেকে বেরিয়ে ছন্দে ছন্দে পা মিলিয়ে চলেছে।

ঝট করে সোজা হয়ে উলটো ঘুরে হারুন ঢোলভাঙা-র দিকে হাঁটা দিলো।


Comments

মন মাঝি's picture

৩য় পর্বে আমার একটু রসিকতা করে করা মন্তব্যটা সিরিয়াসলি নিয়ে আপনি আকার নিয়ে যে মিউজিকাল চেয়ার খেলা চালাচ্ছেন, তাতে আমার মনে হয় "চক্রধামা"-র শেষ আকারটা পরের পর্বে প্রথম অক্ষরের গায়ে ঝুলিয়ে দিয়ে দেখতে পারেন কেমন লাগে।
জাস্ট কিডিং! গড়াগড়ি দিয়া হাসি
আসলে "চক্রধাম"-টাই ঠিক ছিল মনে হয়। তবে সত্যি মজা করতে চাইলে "চাক্রধাম" লিখেই দেখতে পারেন। হো হো হো

****************************************

শিশিরকণা's picture

এখন ভাবছি ডিস্ক এর বদলে ধামা আর ওয়ার্ল্ড এর বদলে ধরা ব্জুড়ে দিয়ে ধামাধরা বানিয়ে ফেলবো কি না।

~!~ আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল ~!~

হিমু's picture

তারপর রাখেন চিকনদুনিয়া।

সোহেল ইমাম's picture

পপকর্ন লইয়া গ্যালারীতে বইলাম

---------------------------------------------------
মিথ্যা ধুয়ে যাক মুখে, গান হোক বৃষ্টি হোক খুব।

মেঘলা মানুষ's picture

কঠিন গল্প, তার উপর সময় রেখা এখন আবার অতীতে চলে গেছে

শিশিরকণা's picture

মাথায় গিট্টু লাগিয়ে দেবে একেবারে।

~!~ আমি তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল ~!~

মেঘলা মানুষ's picture

জিজ্ঞস করতে ভুলে গিয়েছিলাম, আগন্তুকের নাম কি ফরিদ?

Post new comment

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.