প্রবাসে দৈবের বশে ০২৬

হিমু's picture
Submitted by himu on Sun, 13/01/2008 - 7:28am
Categories:

১.
মরাল গ্রীবা যাকে বলে, তা-ই। আস্তে করে ঘাড়ে হাত রেখে ছুঁয়ে দেখলাম। বাদামী গায়ের রং, মসৃণ শরীরের বাঁক, এক কথায় অপূর্ব। কোমর জড়িয়ে ধরে কোলে তুলে বসালাম, আলতো করে আঙুল রাখলাম নাইলনের ওপর। আহ, কতদিন পর পাচ্ছি এই স্পর্শ! দেশ ছাড়ার পর এই প্রথম, ঝাড়া চার মাস পর।

কথাগুলি আমার স্প্যানিশ-ইংরেজি পারস্পরিক ভাষা শিক্ষা প্রকল্পের পার্টনার পাওলা সম্পর্কে শতভাগ খাটে, তবে তাকে কোলে নেয়ার সুযোগ হচ্ছে না তার নররূপী দানব বয়ফ্রেন্ডের কারণে।

কোলে যাকে তুলে নিলাম সে আমার নতুন গীটার। চরম আর্থিক দুরবস্থার দিনে দুম করে কিনে ফেলা আমার নতুন ক্রোড়চারিণী।

গীটারের দোকানে যে মিষ্টি বয়স্কা মহিলা বসেন, তিনি প্রথম দিন বেশ যত্ন করে দেখালেন তার গীটারের স্টক। সারা দোকান ভর্তি পিয়ানো, বাঘা বাঘা সব জিনিস, এক একটার নকশা তাকিয়ে দেখার মতো, দামও গগনচুম্বি। গীটারের দাম জেনে নিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে সেদিনের মতো চলে আসলাম, মনে মনে হিসেব কষছি, আগামী কত মাস কী কী তুচ্ছ বিলাসিতা বাদ দিতে হবে।

হপ্তা যেদিন ফুরোবে, সেদিন বিকেলে গিয়ে হানা দিলাম আবার। গীটারের ব্যাগ স্টকে নেই, বাসে করে যাবো শুনে মহিলা রীতিমতো ঘাম ঝরিয়ে গীটার প্যাক করে আমার হাতে তুলে দিলেন, সাথে পাঁচ ইউরো ডিসকাউন্ট। শহীদ কাদরী যেমন নিজের বাবা সৈয়দ খালিদ আহমেদ কাদরীর নামের সাথে দামেশকের ঝনঝনানিময় তলোয়ারের তুলনা করে নিজের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, তিনি ডিঙি নৌকার মতো পলকা, তেমনি পলকা আমি, তারচেয়েও পলকা আমার এই কাগজের কফিনে মোড়া গীটার বগলে করে বেরিয়ে আসি। এক একটা সময় যখন খুব শূন্য লাগে সবকিছু, খুব অর্থহীন মনে হয় আর সব কিছুই, তখন একটা কিছু ধরে বসে থাকতে ইচ্ছা করে, হোক কারো হাত, হোক একটা গীটারের কেঠো ঘাড়। একটা কিছু বাজুক তবু আমার হাতে।

আমার জীবনের প্রথম উপার্জন দিয়ে কেনা আমার গীটারটা এখন ঢাকায় পড়ে আছে আমার ঘরে। এগারো বছর আগে কেনা সেই গীটারটার কথা মনে পড়ছে এই পোস্ট লিখতে গিয়ে। আমার অনেক আমি-ঘন্টা ধীরে ধীরে বিষন্নতার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েছে ঐ গীটারটা ধরে থেকে। এই পোস্ট উৎসর্গ করছি আমার রংচটা গীটারকেই।

২.
ক্লাস নাইনে আমি যে শিক্ষকের কাছে বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে তাঁর বাড়িতে গিয়ে আলাদা করে গণিত শেখা শুরু করেছিলাম, তিনি সে বছরই বিয়ে করেছিলেন। ক্লাসে যে তিনি কোন অযত্ন নিয়ে গণিত শেখাতেন, এমনটা বলা ঠিক হবে না, তবে বাড়িতে আমাদের চাপের ওপর রেখে অঙ্ক করাতেন। তাঁর স্ত্রী, যতদূর স্মরণ করতে পারি, যথেষ্ঠ রূপবতী এবং আকর্ষণীয়া ছিলেন। একদিন পড়তে গিয়ে আমরা দেখি, স্যার বারান্দার গ্রিলে গাল ঠেকিয়ে উদাস হয়ে আকাশ দেখছেন। এক বন্ধু ফিসফিস করে জানালো, বিরহ। ভাবি নাকি বাপের বাড়ি গেছেন দু'দিন আগে।

বিরহকাতরতায় আরো অনেককেই ভুগতে দেখেছি। একটা সময় আমিও ভুগেছিলাম, যখন আরো কচি আর কাঁচা ছিলাম।

কিন্তু তিনদিন আগে ফট করে ইন্টারনেটছিন্ন হয়ে পড়ার পর নিজের শারীরিক ও মানসিক অস্থিরতা লক্ষ করে বুঝলাম, আমি গভীরভাবে এই তথ্যবিনিময়ব্যবস্থার প্রেমে নিমজ্জিত। ইন্টারনেটের সাথে আমি আসলে বিবাহিত। পবিত্রগ্রন্থ হাতে কেউ এসে শুধু "টিল ডেথ ইউ ডু পার্ট" আর "ইউ মে কিস দ্য নেট" বলা বাকি।

সমস্যা হচ্ছিলো কিছুদিন ধরেই, লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক গায়েব। টোটকা প্রয়োগ করলে আবার ফেরত আসে। পাশের ফ্ল্যাটের ডাঁসা জার্মান এক ছুকরি এক দুপুরে এসে হাজির, আমার নেট কাজ করে কি না জানতে। তার সাথে আলাপ করে জানলাম, আমার সমস্যার চেয়ে তার সমস্যা আরো গুরুতর, সে গত কয়েকদিন যাবৎ নেটহারা হয়ে ঘুরছে। সেদিন সন্ধ্যেবেলা আবার ঘরে ফিরে এসে পিসি ছেড়ে দেখি আমারও একই হাল। স্যামুয়েলকে পাকড়াও করলাম, সে জানালো, তার মাঝে মাঝে সমস্যা হয়, তবে এখন সে পরিজালিত অবস্থায় আছে, আমার কোন জরুরি মেইল করার দরকার হলে তার পিসি ব্যবহার করতে পারি।

স্যামুয়েলকে কিভাবে বোঝাই যে নিজের বউ বাপের বাড়ি গেলে পরের বউকে ব্যবহারের সংস্কৃতিটা ভালো নয়? কাষ্ঠ হাসি হেসে বললাম, এস নের্ফট (মেজাজ খারাপ লাগছে)। স্যামুয়েল বুদ্ধি দিলো হখশুলরেশেনৎসেন্ট্রুমে অভিযোগ করতে।

পরদিন ভোরে বেরিয়ে আমার শ্রীলঙ্কান প্রতিবেশিনী সরসীর সাথে দেখা। তাকে পাকড়াও করে জিজ্ঞেস করলাম নেটের কথা, সে মুখ কালো করে জানালো, ইতিমধ্যে দুইবার অভিযোগ করা হয়েছে, কিন্তু হাউসটিউটররা কোন সমাধান দিতে পারেনি।

ক্লাসের পর গেলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণনাকেন্দ্রে। সেখানে হোঁৎকা এক হার্ডি আর শুঁটকো এক লরেল বসা। আমার সমস্যার কথা বুঝিয়ে বলার পর হার্ডি জানালো, আমার আগেও অনেকে এসে এই অভিযোগ করে গেছে। অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আমি বললাম, দ্যাখো আমি খুব কষ্টে আছি। কবে নাগাদ আবার ঘরে বসে নেট ব্যবহার করতে পারবো? লরেল জানালো, আসলে কোন সময়ের প্রতিশ্রুতি দেয়া সম্ভব নয়। আমি যেন মেওয়া চাষে মনোযোগ দিই।

এর মধ্যে আবার এক ফ্যাকড়া, সিস্টেমটেখনিকের সিম্যুলেশন করা হয়নি। উপস্থাপনার খসড়া ডক্টর প্রিসের পছন্দ হয়নি। মেইলে সে এক নিষ্করুণ ঝাড়ি। গ্রুপের পক্ষ থেকে আমি যোগাযোগ করি সাধারণত, প্রিস সরাসরি জানতে চেয়েছেন, "আপনার বাকি দুই সঙ্গী আসলে কী করে?" বুধবার ক্লাসের পর কাফেটেরিয়াতে বসে বসে বাকি দুইজনের সাথে বসে সিম্যুলেশন শেষ করা গেলো। পরদিন আমাদের উপস্থাপনার কথা ছিলো, আগেভাগে পিছিয়ে দেবার অনুরোধ করায় চামড়া কিছুটা বাঁচলো, তবে ক্লাসে প্রিস কড়া গলায় জানিয়ে দিলেন, এমনটা আর বরদাশত করা হবে না। বাকি দুই গ্রুপের উপস্থাপনা শেষ হবার পর তাকে কিছুটা ভজিয়ে নরম করা গেলো।

ইন্টারনেটের অভাবে নিশ্চয়ই আমার চেহারা স্কুলে আমার গণিতশিক্ষকের মতোই হয়েছিলো। ওলাফ আর ক্রিস্তফ জানতে চাইলো, কোন সমস্যা হচ্ছে কি না। আমি বললাম, হ রে ভাই, ইন্টারনেট নাই বাসায়, রাতে ঘুম আসে না! ওলাফ বিবাহিত মানুষ, সপ্তাহান্তে ড্যুসেলডর্ফে বউয়ের কাছে চলে যায় ছুটতে ছুটতে, সে বোধহয় আমার মর্মযাতনা বুঝলো কিছুটা। বর্বর ক্রিস্তফ খালি এক প্লেট ফ্রেঞ্চফ্রাই এনে সাধলো, "খেতে চাইলে জলদি হাত চালাও।"


Comments

সংসারে এক সন্ন্যাসী's picture

Quote:
... আমার নতুন ক্রোড়চারিণী...

... কাগজের কফিনে মোড়া গীটার...

... নেটহারা হয়ে ঘুরছে...

... সে পরিজালিত অবস্থায় আছে...

চলুক

Quote:
একটা কিছু ধরে বসে থাকতে ইচ্ছা করে...

হো হো হো হো হো হো হো হো হো হো হো হো

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
টাকা দিয়ে যা কেনা যায় না, তার পেছনেই সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয় কেনু, কেনু, কেনু? চিন্তিত

ফারুক হাসান's picture

নতুন সঙ্গীর সাথে সংসার শুভ হোক!
----------------------------------------------
আমাকে নিঃশব্দে অনুসরণ করে একটা নদী-
সাথে নিয়ে একটা পাহাড় আর একটা নিঃসঙ্গ মেঘ।

মুহম্মদ জুবায়ের's picture

আজই ভাবছিলাম নিখোঁজ হিমুর সন্ধানে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা যায় কি না। এখন বোঝা গেলো নেট-বিরহ ও গীটার-মিলনে এরকম ঘটতে পারে বটে।

-----------------------------------------------
ছি ছি এত্তা জঞ্জাল!

সুমন চৌধুরী's picture

যাক লাইন পাইছো তাইলে....



ঋণম্ কৃত্বাহ ঘৃতম্ পীবেৎ যাবৎ জীবেৎ সুখম্ জীবেৎ

মুজিব মেহদী's picture

লেখাটা পড়ে চিন্তা করলাম যে নতুন গিটার কেনা এবং নেটচ্যূত হওয়া বিষয়ে যদি আমি লিখতাম, তাহলে লেখাটির কয়েক লাইনই মাত্র সরস হতো। এরপরই নিরস থেকে নিরসতর হবার দিকে যাত্রা করত লেখাটি এবং একসময় নিকৃষ্টতায় পর্যবসিত হতো। কিন্তু হিমু বলে কথা। এত বড়ো লেখা তিনি অফিসে বসিয়ে পড়িয়ে নিলেন। আর পড়া শেষে মনে হলো, কাজে ফাঁকি দিয়েও ঠকি নি। এ বেলায় চমৎকার একটা সরস রচনা পড়া গেল।

শুধু হাত নয়, হিমুর সারা শরীর সচল থাকুক।
..................................................................................
শোনো, বীণা আমি বাজাইনি প্রতিবারই নিজে, এমনও হয়েছে
বীণায় রেখেছি হাত, নিজেই উঠেছে বীণা বেজে!

... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
কচুরিপানার নিচে জেগে থাকে ক্রন্দনশীলা সব নদী

বিপ্লব রহমান's picture

অন্তর্জাল বিচ্ছিন্নতাই ভালো। নইলে কখন না জানি গিটারের অত্যাচার শুনতে হয়! মন খারাপ


আমাদের চিন্তাই আমাদের আগামী: গৌতম বুদ্ধ


একটা ঘাড় ভাঙা ঘোড়া, উঠে দাঁড়ালো
একটা পাখ ভাঙা পাখি, উড়াল দিলো...

রানা মেহের's picture

"একটা কিছু বাজুক তবু আমার হাতে।"
কী সুন্দর কথা হিমু।

-----------------------------------
আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস

হিমু's picture

সবাইকে ধন্যবাদ। আমি আবারওসংযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে রবিনসন ক্রুসোর জীবনযাপন করছি। নেট, নেট, মাই কিংডম ফর দ্য নেট ...!


হাঁটুপানির জলদস্যু

Post new comment

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.